পোকামাকড়ের ঘরবসতি উপন্যাসে চাটগাঁ ভাষার ব্যবহার

1117

বাংলা সাহিত্যে সেলিনা হোসেন (জন্ম: ১৯৪৭) সফল ঔপন্যাসিক হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করেছেন। উপন্যাসের জন্য অর্জন করেছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮০)। আরও অনেক পুরস্কার-স্বর্ণপদক পেয়েছেন তিনি উপন্যাস রচনার স্বীকৃতি-স্বরূপ। তাঁর রচিত উপন্যাস এখন বাংলাদেশ তো বটেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ-ত্রিপুরা-আসামের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যসূচিভুক্ত। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে অধ্যয়নকারী সেলিনা হোসেনের গবেষণার বিষয় হচ্ছে ভাষাতত্ত¡। তিনি ১৯৯৪ সালে লন্ডন ইউনিভার্সিটির সোয়াস-এ রবীন্দ্র-অনুবাদক উইলিয়াম রাদিচে ও প্রফেসর জে.সি. রাইটের সঙ্গে বাংলা শব্দার্থতত্ত¡ বিষয়ে গবেষণা করেছেন। এ গবেষণা সমাপ্তির বা গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশের তথ্য পাওয়া না গেলেও ভাষাতত্ত¡ বিষয়ে সেলিনা হোসেনের আগ্রহ অনুমান করা যায়। বাংলা ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্র্য তাঁর নজরে এসেছিল আরও আগে। সে বৈচিত্র্যকে সাহিত্যে রূপায়ণে তাঁর প্রথম ও সার্থক প্রয়াস পাওয়া যায় ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’ (১৯৮৬) উপন্যাসে। প্রমিত বাংলা ভাষায় লেখা এ উপন্যাসের সংলাপগুলোতে তিনি ব্যবহার করেন চট্টগামের (আঞ্চলিক) উপভাষা বা চাটগাঁ ভাষা।

উপন্যাসের ভাষার আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে বলে নেওয়া ভালো উপভাষা হল ভাষা-দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সদৃশ। ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কির মতে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মিলে যেমন দেহ, ভাষাও তেমনি কোনো দেশের জনসমষ্টির পূর্ণাঙ্গ দেহের সাথে তুলনীয়। ড.মনিরুজ্জামান বলেন: ‘কোনো ভাষার যে মান্য বা চলিত রূপ দেখা যায়, তার সাথে ধ্বনিগত, রূপগত ও বাগধারাগতভাবে যথেষ্ট স্বাধীন তবে পৃথক নয় এমন পার্থক্যযুক্ত কোনো স্থানিক বা ভূ-আঞ্চলিক রূপভেদই ‘উপভাষা’। রূপভেদের দিক থেকে এগুলি বিভক্ত হলেও পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটা অনবচ্ছেদের মাধ্যমে ঐক্য নিয়ে বিন্যস্ত। …‘বোধগম্যতা’-ই এখানে মূল সংযোগ-ক্ষেত্র। এ বোধগম্যতা প্রসঙ্গে লক্ষণীয়, বাংলাদেশের প্রমিত বাংলা কিংবা বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার সাথে সিলেট, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও চাকমা উপভাষার তফাৎ অনেক সময় এতটাই বেশি হয় যে, একে অপরের কথা সঠিকভাবে বুঝতেও পারে না। একারণে অনেকে এই অঞ্চলগুলোর ভাষাকে বাংলার বিকৃতরূপ বা ‘পিকিউলিয়র’ মনে করেন। এপ্রসঙ্গে স্মরণীয় ড. মুহম্মদ এনামুল হক-এর অভিমত, ‘চট্টগ্রামের ভাষা বাংলার বিকৃতি নয়, এক ধরনের বিকাশ, ইহাও বাংলা বিশেষ।’ বর্তমান বাংলাদেশের বাংলা উপভাষা কে চারটি শ্রেণিতে ভাগকরা হয়ে থাকে। এগুলো হলো: ১. উত্তরবঙ্গীয়: দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া ও পাবনা; ২. রাজবংশী: রংপুর; ৩. পূর্ববঙ্গীয়: (ক) ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, বরিশাল, (খ) ফরিদপুর, যশোহর ও খুলনা; ৪. প্রান্তবঙ্গীয়: (ক) চট্টগ্রাম ও চাকমা, (খ) নোয়াখালি, (গ) সিলেট ( সিলেটের উপভাষা: ব্যাকরণ ও অভিধান, পৃ. ৮৮)। বাংলা উপন্যাসের সূচনালগ্নেই সাধু বাংলার পাশাপাশি চরিত্রের সংলাপে মুখের ভাষা বা কথ্য ভাষা ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে, টেকচাঁদ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রায় প্রত্যেকেই মুখের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন কলকাতা অঞ্চলের কথ্য বুলি। বাংলা উপন্যাসে বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলের ভাষা প্রথম ব্যবহৃত হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি (১৯৩৬) উপন্যাসে। কপিলা যখন বলে, ‘আমারে নিবা মাঝি লগে?’ তখন এ জেলেপাড়ার ভাষা সকল বাংলাভাষীর কছেই বোধগম্য। অর্থাৎ এ ভাষা অতোটা ‘পিকিউলিয়র’ নয়; কেননা, মান বাংলা ভাষার কোনো দূরবর্তী বা প্রান্তীয় উপভাষা তখনও ব্যবহৃত হয়নি।

আলাউদ্দিন আল আজাদ তাঁর কর্ণফুলী (১৯৬২) উপন্যাসে প্রথম প্রয়োগের প্রয়াস পান প্রান্তবঙ্গীয় উপভাষা। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও চাকমা ভাষার দুর্বোধ্যতা সম্পর্কেও ঔপন্যাসিক সচেতন; তাই তিনি লেখকের কথায় লেখেন: ‘সকল পাঠককে এই সংলাপের প্রত্যেকটি কথা বুঝতে হবে এমন কোনো কথা নেই; মোটামুটি আবহটুকুন অধিকাংশের মনে এলেই যথেষ্ট।’ কৈফিয়ৎ দিতে গিয়ে আলাউদ্দিন আল আজাদ আরও বলেন: ‘চরিত্রকে স্বাভাবিক করার চেষ্টায় আমি এ-বইয়ে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করিনি। … কর্ণফুলীর জীবনধারা, সবুজ প্রকৃতি, শ্যামল পাহাড় ও সাগর সঙ্গমে বয়ে চলা প্রবাহের মতোই এই ভাষা অবিভাজ্য। শিল্পসিদ্ধির জন্য এর অবলম্বন আমার কাছে অপরিহার্যরূপে গণ্য হয়েছে।’ এ ধারার সার্থক শিল্পী সেলিনা হোসেন। সাম্প্রতিক কালে এধারার প্রয়োগ দেখাযায়: হরিশংকর জলদাস, আজাদ বুলবুল, মনওয়ার সাগর প্রমুখের উপন্যাসে। তবে সেলিনা হোসেনই প্রথম বোধগম্যতা গুণে পূর্ণ করে চাটগাঁ ভাষার প্রয়োগ ঘটান তাঁর উপন্যাসে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের মানুষদের নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’। নাফ নদীর তীরে (শাহপরি) ছোট্ট এক দ্বীপের বুকে এই সব মানুয়ের বসতি। মানুষের না পোকামাকড়ের ? ওখানকার দৃশ্যমান বাস্তবতা তো পোকামাকড়ের কথাই বলে। বিশেষত বর্তমানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উপচেপড়া ভিড়ে সে অঞ্চলের অবস্থা আরও করুণ-শোচনীয়। কিন্তু ঔপন্যাসিক সেই বসতিতে (বস্তিই বলা যায়) মানুষকেই দেখাতে চান। কর্মময়, সাহসী, লড়াকু, স্বপ্নতাড়িত প্রেমময় মানুষ। পিষ্ট হতে হতে শেষে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাইবে এমন মানুষ। জলদাস নয়, জলের-জলাভ‚মির অধিপতি হয়েই বাঁচবে মানুষ। ঔপন্যাসিকের ভাষায়: ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি সাগরপাড়ের মানুষের গল্প। তারা এতই দরিদ্র যে জীবন কাটে পোকামাকড়ের মতো, কিন্তু তাদের আছে বুকভরা সাহস। তারা সাগরে মাছ ধরে। সে মাছ বিক্রি করে, শুটকি বানিয়ে জীবন চালায়। কখনো প্রাকৃতির দুর্যোগে ছিন্নভিন্ন হয় তাদের জীবন। জলোচ্ছ¡াস ধুয়েমুছে নিয়ে যায় বসতবাটি। তারপরও ওরা পিছিয়ে থাকার মানুষ না। আবার হাঙর ধরার জন্য প্রস্তুত হয়, জাল কাঁধে নিয়ে ট্রলারে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য, আবার ফসল ফলায় মাঠে। এভাবেই জীবনের চক্র জীবনকে বেড় দিয়ে রাখে।’ (উপন্যাস সমগ্র:৩; পৃ. ৯)। সেই জীবনের ছবি আঁকতে গিয়ে ঔপন্যাসিক লোকগুলোর মুখের প্রকৃত ভাষাকে পাল্টাতে পছন্দ করেননি। ফলে সে অঞ্চলের লোকভাষার তথা বাংলাদেশের প্রান্তীয় অঞ্চলের একটি উপভাষার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় চরিত্রগুলোর মুখের কথায়।

উপন্যাসের নায়ক চরিত্র মালেকের মুখে তার মাতৃভাষা ব্যবহার করা হয় প্রথমে তার বৃদ্ধ-অন্ধ মায়ের সাথে কথোপকথনে: ‘দেখিস আঁই ফলাইউম। আঁরে আর খুঁজি ন পাবি।
অ বাবা, আঁরে আর দুখ ন দিস।’ (পৃ. ২২৩)।
এখানে ঔপন্যাসিক ‘দেইস’/ ‘চাইস’ এর বদলে ‘দেখিস’ এবং ‘তুয়াই’ / ‘বিছারি’ ইত্যাদি বিকল্প রূপ ব্যবহার না করে প্রমিত বাংলার কাছাকাছি রূপ ব্যবহার করেছেন। ‘বাজি’ / ‘বাজান’ ব্যবহার না করে ‘বাবা’ ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করলেও যে রূপগুলো প্রমিত বাংলার
> ৪র্থ পৃষ্ঠায় দেখুন
সাথে সহজে ব্যবহৃত হয় সযতনে সেলিনা হোসেন সেগুলোই বাছাই করে ব্যবহার করেছেন। এতে করে আলাউদ্দিন আল আজাদের উপন্যাসের মতো তাঁর উপন্যাস দুর্বোধ্য হয়নি প্রান্তবঙ্গীয় উপভাষা ব্যবহার করেও। উপন্যাসের প্রথম ২৩ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ভালো অর্থে ‘বালা’ রূপটি ৮/৯ বার ব্যবহৃত হলেও ১১৯ পৃষ্ঠার উপন্যাসে শেষ পর্যন্ত ২৫/২৬ বার ‘ভালা’ রূপ ব্যবহৃত হয়েছে। এতে মনে হয় সেলিনা হোসেন এ রূপমূলের মহাপ্রাণতা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছেন। তবে আশার কথা তিনি শেষপর্যন্ত ঠিক সিদ্ধাতে পৌঁছেছেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর আঞ্চলিক ভাষার অভিধানে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন চট্টগ্রামের ভাষায় শব্দের শুরুতে মহাপ্রাণতা বজায় থাকে। তবে এ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন সেলিনা হোসেন বার বার। যেমন ‘কতা ন কঅর ক্যা ? বাসান দিবা কঁত্তে?’ (পৃ.২৬২)। ‘তইলে পরুয়া ভাসিবা?’ (পৃ.২৬৩)। আবার, ‘মা, তুঁই গুমাইবা? না, ঘুম তো ন আইয়ের।’ (পৃ.২৬৮)। এখানে নিম্নরেখ রূপমূলগুলো তার প্রমাণ। সালেক যখন তার মাকে বলে: ‘গোস্যা ন হইয়্যম না? তুঁই মাইজ্যা ভাইরে বেশি ভালোবাস।’ (পৃ.২৬৮)। তখন ‘পছনগর’ বা ‘গমলায়’ বর্জিত হয়। উপন্যাসে কোথাও ভাল অর্থে ‘গম’ ব্যবহৃত পয়নি। অথচ এটি চট্টগ্রামে বহুল ব্যবহৃত শব্দ যদিও প্রমিত বাংলায় ব্যবহার অন্য অর্থে। কথা কওয়া অর্থে কখনো লিখেছেন ‘কঅর’(পৃ.২৬২), ‘কর’(পৃ.২৬৯), আবার কখনো ‘ক-র’ (পৃ.২৭৭)। ২২৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন: ‘তোর মতো দস্যি পোয়া য্যান আর কারো ন অয়।’ এখানে মতো এর পরিবর্তে ‘ন্যান’ বা ‘ডইল্যা’ ব্যবহৃত হতে পারতো; যেখানে উপন্যাসের ২৬৮ পৃষ্ঠা থেকে শেষপর্যন্ত ৭/৮বার ‘নান’ লিখেছেন ‘মতো’ এর পরিবর্তে। এভাবে ‘রাঁধিব’(পৃ.২৭৮), ‘রান্দর’(পৃ.৩১১); আইজ্যা বা লিখে ‘আইজ’ (পৃ.২৭৮), মনত পইড়গে অর্থে ‘মনত হৈল’ কিংবা, ‘সারা রাত মাথাত পানি ঢাললাম’(পৃ.২৪৩)। এগুলো একান্তই প্রমিত প্রয়োগ।

আশার কথা এই যে সেলিনা হোসেন চট্টগ্রামের লোক না হয়েও দক্ষিণ-চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাকে তাঁর উপন্যাসের সংলাপে ধারণ করতে চেয়েছেন। উপন্যাসের বর্ণনা, চরিত্রের কল্পনা এমনকি চরিত্রের স্বপ্ন-ভাবনাও তিনি প্রমিত বাংলা ভাষায় লিখেছেন। কেবল চরিত্রের সংলাপে তিনি চাটগাঁ ভাষাকে বাংলা বর্ণমালায় লিখেছেন। এতে করে চাটগাঁ ভাষা যেমন বিলুপ্তির হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হল তেমনি প্রমিত বাংলা ভাষার তার বৈচিত্র্যময় উপভাষাকে ধারণ করে সমৃদ্ধ হবার সুযোগ পেল। ড. মনিরুজ্জামান ‘চট্টগ্রামের উপভাষা’(২০১৩) গ্রন্থে উত্তর চট্টগ্রামের ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছেন। আলাউদ্দিন আল আজাদও পাহাড়ি অঞ্চল তথা উত্তর চট্টগ্রামের ভাষা ব্যবহার করেছেন তাঁর কর্ণফুলী উপন্যাসে। সেলিনা হোসেন প্রথম ব্যতিক্রম যিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের জেলে-জলদাসদের ভাষাকে সাহিত্যে স্থান দিয়ে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধির সোপানে স্থাপন করেন।