
ফখরুল ইসলাম নোমানী
ভূস্বর্গখ্যাত কাশ্মীর নি:সন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর একটি। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ইসলাম কাশ্মীরের গৌরব-গরিমার অন্যতম দিক। ধারণা করা হয় ইসলামের প্রাথমিক যুগেই কাশ্মীরে মুসলমানদের আগমন ঘটেছিল। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের দাবি-মহানবী (সা.)এর জীবদ্দশায় তাঁর একদল সাহাবি কাশ্মীরে আগমন করেন এবং তাঁরা স্থানীয় শাসক ভিনাদত্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা কিছুদিন কাশ্মীরে অবস্থান করার পর চীনের দিকে যাত্রা করেন। সেখান থেকে সিল্ক রোড হয়ে নিজ দেশে ফিরে যান। কাশ্মীরকে ‘ভূস্বর্গ’ বা ‘স্বর্গ’ বলা হয় কারণ এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মনোরম দৃশ্য এবং শান্ত পরিবেশ যা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। ঐতিহাসিক এবং সাহিত্যিক বিভিন্ন মাধ্যমে কাশ্মীরের সৌন্দর্যের বর্ণনা করা হয়েছে যা এটিকে ‘পৃথিবীর স্বর্গ’ হিসেবে পরিচিত করেছে। নির্জন উপত্যকা, বরফে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গ, ছায়াঘেরা অরণ্য আর স্বচ্ছ জলরাশির অপার সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এক ভূখন্ড কাশ্মীর। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই একে ভূস্বর্গ নামে অভিহিত করা হয়। কিন্তু কাশ্মীর শুধু প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আধার নয় বরং এটি একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যেরও প্রতীক। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ও প্রসারে কাশ্মীরের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই এই ভূখন্ডে মুসলমানদের উপস্থিতির বিষয়টি ইতিহাস থেকে জানা যায়। কখনো সাহাবায়ে কেরামের আগমন, কখনো মুসলিম সৈন্যবাহিনীর পদচারণা, আবার কখনো সুফি সাধকদের পরিশ্রমী ও আত্মত্যাগমূলক কর্মধারায় কাশ্মীর পরিণত হয় এক উজ্জ্বল ইসলামি সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থলে। বিশেষ করে সুফি সাধক বুলবুল শাহ (রহ.) এবং মীর সৈয়দ আলী হামদানি (রহ.) আগমন করেন কাশ্মীরে। সুফি দর্শনের অহিংস, মানবিক ও আধ্যাত্মিক চেতনা কাশ্মীরের জনমানসে গভীর প্রভাব ফেলে। ইসলাম এখানে শক্তি বা জবরদস্তির মাধ্যমে নয় বরং ভালোবাসা নৈতিকতা ও উদারতার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কাশ্মীরি সমাজে ইসলামের যে শেকড় দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়েছে তার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং অসংখ্য অজানা-অচেনা ত্যাগী মানুষের অবদান। সেই ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য প্রয়োজন কাশ্মীরে ইসলামের আগমন ও প্রসারের ইতিহাস পুনর্পাঠের। এখানে সেই গৌরবময় ইতিহাসের পরিক্রমা তুলে ধরা হলো।
কোনো কোনো ঐতিহাসিকের দাবি করেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)এর জীবদ্দশায় তার একদল সাহাবি কাশ্মীরে আগমন করেন এবং তারা স্থানীয় শাসক ভিনাদত্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা কিছুদিন কাশ্মীরে অবস্থান করার পর চীনের দিকে যাত্রা করেন। সেখান থেকে সিল্ক রোড হয়ে নিজ দেশে ফিরে যান। অন্য একদল গবেষকরা দাবি ৭১১ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসেম সিন্ধু জয় করার পর তিনি ভারতবর্ষের নানা দিকে মুসলিম বাহিনী প্রেরণ করেন। সে সময় সেনাপতি হুমাম বিন সুম্মাহকে কাশ্মীর অভিযানে পাঠান। স্থানীয় শাসকরা তাদের আন্তরিক অভ্যর্থনা জানান এবং উপহারস্বরূপ একটি বড় জমিদারি দান করেন। ফলে সেনা অভিযানে অংশ নেওয়া কয়েকটি আরব পরিবার কাশ্মীরে থেকে যায়। তারা সে সময় কাশ্মীরে বেশ কয়েকটি মসজিদও নির্মাণ করেন। কাশ্মীরের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ কলহন তার ‘রাজতরঙ্গিনি’ বইয়ে লিখেছেন খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরের রাজা হর্ষদেব তার দরবারে বহু আরব মুসলিমকে সভাসদ ও সৈন্য হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় কাশ্মীরে ইসলাম ও মুসলমানদের উপস্থিতি বহু আগেই ঘটেছিল। তবে বেশির ভাগ ঐতিহাসিকের মতে কাশ্মীরে ইসলামের প্রসার ঘটেছিল খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকের শুরুর দিকে। তখন মধ্য এশিয়া, পারস্য ও আফগান অঞ্চল থেকে বহু মুসলিম অভিবাসী, আলেম ও সুফি কাশ্মীরে আগমন করেন। তারা কাশ্মীরে দ্বীন প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন এবং তাদের কেউ কেউ কাশ্মীরে স্থায়ীভাবে বসবাসও শুরু করেন। কাশ্মীরে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখেন সুফি আলেম শায়খ শরফুদ্দিন আবদুর রহমান (রহ.)। তিনি বর্তমান তুর্কমিনিস্তানের অধিবাসী ছিলেন। মোঙ্গলীয়দের অত্যাচার থেকে আত্মরক্ষা করতে তিনি কাশ্মীরে আসেন। কাশ্মীরের শ্রীনগরে নিজ আবাস গড়েন। ইংরেজ ঐতিহাসিক লরেন্সের মতে কাশ্মীরে ইসলামের প্রচার শুরু হলে ১৩২৪ খ্রিস্টাব্দে স্থানীয় শাসক রেনজু শাহ রিনচেন সুফি আবদুর রহমান বুলবুল শাহ (রহ.) এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি একজন লাদাখি রাজপুত্র ছিলেন যিনি ১৩২০ খ্রিস্টাব্দে পিতার মৃত্যুর পর কাশ্মীরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। ইসলাম গ্রহণের পর তার নাম হয় সুলতান সদরুদ্দিন।
তার ইসলাম গ্রহণ কাশ্মীরের ধর্মীয় ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক ঘটনাও বটে। কেননা তার ইসলাম গ্রহণের প্রভাবে তার বেশির ভাগ প্রজা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তার পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সদস্যও তখন ইসলাম গ্রহণ করেন। যেমন তার ভগ্নিপতি রাওন চন্দর। এ ছাড়া বৌদ্ধদের একটি বড় অংশ এবং যারা ধর্মীয় জুলুম ও বর্ণ প্রথা থেকে মুক্তি পেতে চাইত তাদের অনেকে ইসলাম গ্রহণ করে। সুলতান রেনজু শাহ রিনচেন পরে সুফি বুলবুল শাহ (রহ.) এর জন্য শ্রীনগরে একটি খানকা নির্মাণ করেন এবং মুসলমানদের জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এটিই ছিল কাশ্মীরে প্রথম মসজিদ। শ্রীনগরের নাওয়াদকল নামক স্থানে অবস্থিত মসজিদটি বুলবুল শাহর নামে পরিচিত। সুফি বুলবুল শাহ কাশ্মীরে ইসলামের যে বীজ রোপণ করেছিলেন তা ফুলে-ফলে বিকশিত হয়েছিল মীর সৈয়দ আলী হামদানি (রহ.) এর প্রচেষ্টায়। তিনি ১৩৭২ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৭৭৪ হিজরিতে ইরানের হামদান শহর থেকে কাশ্মীরে এসেছিলেন। সৈয়দ আলী হামদানি (রহ.) ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। যিনি একই সঙ্গে একজন কোরআনে হাফেজ, ফকিহ, প্রাজ্ঞ আলেম, লেখক ও সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি ইতিহাসের পাতায় ‘আলী সানি’ নামেও পরিচিত। তার সঙ্গে আরও সাত শতাধিক ‘সৈয়দ’ (রাসুল সা.-এর বংশধর) কাশ্মীরে আগমন করেন। তারা চার মাস কাশ্মীরে অবস্থান করে মক্কায় যান এবং সেখান থেকে ফিরে এসে ৭৮১ থেকে ৭৮৩ হিজরি পর্যন্ত কাশ্মীরে অবস্থান করেন। এরপর তিনি তুর্কমেনিস্তান যান এবং ৭৮৬ হিজরিতে সেখানেই তার ইন্তেকাল হয়। শায়খ আলী হামদানি (রহ.)এর হাতে ৩৭ হাজার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। তার উৎসাহে তৎকালীন শাসক সুলতান কুতুবুদ্দিন কাশ্মীরে একাধিক মাদ্রাসা ও মসজিদ নির্মাণ করেন যা উপত্যকায় ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আল্লামা হামদানি (রহ.)কাশ্মীরে শুধু ধর্মীয় জ্ঞান আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতার প্রসার ঘটাননি বরং তিনি পারস্যের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলারও বিকাশ ঘটান। তার মাধ্যমে কাশ্মীরে কারপেটশিল্প, শাল বোনা, ক্যালিগ্রাফি ও তাঁতশিল্পের বিকাশ ঘটে। এতে কাশ্মীর বাসীর জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়।
মীর সৈয়দ আলী হামদানি (রহ.)এর পর তার সুযোগ্য সন্তান মীর মুহাম্মদ হামদানি কাশ্মীরে ইসলাম ও ইসলামি শিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি ৭৯৬ হিজরি মোতাবেক ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে কাশ্মীরে আগমন করেন। তার দাওয়াতে সুলতান সিকান্দরের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপতি ‘সুহ ভাট’ ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলমান হওয়ার পর তিনি ‘সাইফুদ্দিন’ নাম ধারণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণ বহু কাশ্মীরিকে ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করেছিল। সুলতান মীর মুহাম্মদ হামদানি (রহ.) এর জন্য শ্রীনগরে একটি খানকা নির্মাণ করেন। খানকাটি বর্তমানে খানকাহ-ই-মাওলা নামে পরিচিত। মীর মুহাম্মদ হামদানি (রহ.) ছাড়াও বেশ কয়েকজন সুফি আলেম কাশ্মীরে ইসলাম প্রসারে অবদান রাখেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েক হলেন শায়খ জাইনুদ্দিন, সৈয়দ মুহাম্মদ হেসারি, শায়খ হামজা মাখদুমি, সৈয়দ আহমদ কিরমানি, শায়খ নুরুদ্দিন (রহ.)প্রমুখ। কাশ্মীর-যেন সত্যিকারে স্বপ্নের ভূস্বর্গ। পৃথিবীর সব রূপ-সৌন্দর্য যেন ভিড় করেছে এখানে। ছুটে এসেছে প্রকৃতির রূপের সব অনুষঙ্গ। প্রকৃতির প্রতিটি বিচিত্র স্বাদের অলঙ্কার দিয়ে সাজানো এ ভূস্বর্গ। একটা সময় কাশ্মীর শব্দটি ভৌগোলিকভাবে শুধু বিশাল হিমালয় এবং পিরপাঞ্জাল পর্বতমালার উপত্যকাকে নির্দেশনা করা হতো। আজ কাশ্মীর বলতে বোঝায় একটি বিশাল অঞ্চল যা ভারতীয়-শাসিত রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর, পাকিস্তানশাসিত গিলগিট-বালতিস্তান এবং আজাদ কাশ্মীর প্রদেশ এবং চীন-শাসিত আকসাই চীন এবং ট্রান্স-কারাকোরাম ট্রাক্ট অঞ্চলসমূহ নিয়ে গঠিত। তাই বলা চলে কাশ্মীরের দুটি অংশ। একটি ভারতশাসিত জম্মু কাশ্মীর এবং অন্যটি পাকিস্তান অধিভুক্ত আজাদ কাশ্মীর। কাশ্মীরে পর্যটকদের চোখ জুড়ায় শ্রীনগর, পহেলগাঁও, গুলমার্গ, সোনমার্গ ও কাটরা। তারপরই বলা যায় ডালহৌসি, অমৃতসর, মানালী, কুলু, হিমাচল ও পাঞ্জাব। বানিহাল টানেল কাশ্মীরের সঙ্গে আশ্চর্য যোগসেতু রয়েছে। প্রায় সোয়া দুই কিলোমিটার এই টানেল। এসব জায়গা ঘুরে আসতে এক মাসেরও বেশি লম্বা ছুটি বা অবসর থাকা চাই। কাশ্মীরের ইতিহাসে ইসলামের প্রবেশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, বর্তমান প্রেক্ষাপটও তেমনই উদ্বেগজনক। কাশ্মীরের মুসলমানরা বর্তমানে নানা বিধিনিষেধ ও দমন-পীড়নের শিকার।
ভারত সরকারের কঠোর নীতির ফলে মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে। ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠা কাশ্মীরের এই ভূখন্ডে ইসলামের পথচলা যেমন সংগ্রামের, তেমনি টিকে থাকারও। অতীতের ঐতিহ্য আজও জেগে আছে কিন্তু নতুন প্রজন্মের জন্য কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। পৃথিবীর সর্গরাজ্য বা ভূসর্গ বলা হয় কাশ্মীরকে। নিজের চোখে এই সর্গরাজ্য দেখার লোভ সবারই কম বেশি জেগে উঠে। প্রকৃতির এই অপূর্ব সৃষ্টিকে কয়েকটি শব্দ দিয়ে বর্ণনা করা খুবই কঠিন। নিজের চোখে না দেখলে কাশ্মীরের সৌন্দর্য্য ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। তাই সুযোগ হলে নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতা মিস করবেন না।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট










