পূর্বদেশ ডেস্ক
পিলখানা হত্যাকান্ডের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘সবুজ সংকেত’ থাকার পাশাপাশি সেই সময়ের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ‘সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী’ প্রমাণ পাওয়ার কথা তুলে ধরা হয়েছে এ বিষয়ক জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে। খবর বিডিনিউজের।
এ হত্যাকান্ড পরিকল্পিত এবং এর পেছনে ‘প্রধান সমন্বয়কের’ ভ‚মিকা পালন করেছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এতে ‘বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততার’ প্রমাণ পাওয়ার কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
গতকাল রোববার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তদন্ত কমিশনের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান এবং কমিশনের আরেক সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার এসব তথ্য দেন। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর পরে তা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে।
গতকাল কমিশনের প্রধানসহ অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ প্রতিবেদন জমা দেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদরদপ্তরে বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন তোলে ওই ঘটনা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদ্রোহ ও হত্যাকান্ডের ঘটনায় মামলা ও বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
দেড় দশক পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে এলে ওই ঘটনা পুনঃতদন্তের দাবি ওঠে। পরে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। এটির প্রধান করা হয় বিজিবির সাবেক মহাপরিচালক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ এল এম ফজলুর রহমানকে। কমিশনকে প্রথমে ৯০ দিন সময় দেওয়া হলেও পরে তা বাড়ানো হয়।
গতকাল জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন হাতে পেয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বিডিআর হত্যাকান্ডের ঘটনায় জাতি দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে ছিল। আপনারা সত্য উদ্ঘাটনে যে ভূমিকা রেখেছেন জাতি তা স্মরণে রাখবে। জাতির পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তিনি বলেন, ইতিহাসের এই ভয়াবহতম ঘটনা নিয়ে জাতির অনেক প্রশ্ন ছিল, এই কাজের মধ্য দিয়ে সেসব প্রশ্নের অবসান ঘটবে। এ প্রতিবেদনে শিক্ষণীয় বহু বিষয় উঠে এসেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, জাতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে এটি।
তদন্তকাজ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত করার স্বার্থে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব বজায় রাখার কথা তুলে ধরে প্রতিবেদন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে কমিশনের প্রধান ফজলুর রহমান বলেন, আমরা যখন কাজ শুরু করি তখন ১৬ বছর আগের এই ঘটনার বহু আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকে বিদেশে চলে গেছেন। আমরা দুটো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছি। সাক্ষীদের ডাকলাম, কারও কারও ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বক্তব্য শুনেছি আমরা। যতক্ষণ তিনি বলতে চেয়েছেন। যারা তদন্তে (আগের তদন্ত) জড়িত ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের তদন্তের প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছি, অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি।
তিনি বলেন, এই তদন্তের মাধ্যমে বিডিআর হত্যাকান্ড নিয়ে জনমনে থাকা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে, উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে কার কী ভূমিকা ছিল। কেন সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে থাকল, কোনো পদক্ষেপ নিল না।
পিলখানা হত্যাকান্ডের পর বিডিআর নাম বদলে হয় বিজিবি। তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেওয়া এ বাহিনীর সাবেক প্রধান ফজলুর বলেন, তদন্তে বিডিআর হত্যাকান্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে।
এসময় কমিশনের ‘ফাইন্ডিংস’ সম্পর্কে এটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, এই ঘটনার কিছু বাহ্যিক ও প্রকৃত কারণ বের করেছে কমিশন। এই হত্যাকান্ড পরিকল্পিত এবং এর পেছনে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছিল তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস।
হত্যাকান্ডের ঘটনায় জড়িতদের রক্ষা করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। তারা ২০-২৫ জনের একটি মিছিল নিয়ে পিলখানায় ঢুকেছে এবং বের হবার সময় সেই মিছিলে দুই শতাধিক মানুষ ছিল। তিনি বলেন, পুরো ঘটনাটি সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘সবুজ সংকেত’ ছিল।
অবসরপ্রাপ্ত এই সেনা কর্মকর্তা এ ঘটনার দায় নিরূপণের বিষয়ে বলেন, দায় তৎকালীন সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সেনাপ্রধানেরও। এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও র্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও রয়েছে চরম ব্যর্থতা। তিনি বলেন, ওই ঘটনার সময় কিছু প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং কয়েকজন সাংবাদিকের ভূমিকা ছিল অপেশাদার।
তিনি বলেন, ওই হত্যাকান্ডের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে যেসব বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে শেখ হাসিনা বৈঠক করেছে, তাদের সঠিক নাম পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি।
কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বেশকিছু সুপারিশ করে, যাতে করে ভবিষ্যতে বাহিনীগুলোতে এই ধরনের ঘটনা এড়ানো যায় এবং এই ঘটনার শিকার ব্যক্তিরা ন্যায় বিচার পায়।
প্রতিবেদন হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ সহকারী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল হাফিজ ও স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি।
স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সদস্যরা হলেন- অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাইদুর রহমান বীর প্রতীক, সাবেক যুগ্ম সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, সাবেক ডিআইজি এম. আকবর আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন।










