রাঙামাটি প্রতিনিধি
রাঙামাটি মোনঘরের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব উপলক্ষে দু’দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা, মিলন মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। মোনঘরের ৫০ বছর সুবর্ণজয়ন্তী সাবেক শিক্ষক গরিকা চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় সন্তু লারমা ওরফে সন্তু লারমা। শুক্রবার সকালে মোনঘর খেলার মাঠে এই সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে এসেও পাহাড়ের মানুষ অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আজকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা আমাদেরকে নানা ভাবে বাঁধাগ্রস্ত করে। এখানকার মানুষ স্বাধীন ভাবে তাদের জীবনকে ধরে রাখতে পারতো। কিন্তু কালের চক্রে রাজনৈতিক ডামাঢোলে ও সারা বিশ্বে যে রাজনৈতিক যে কার্যক্রম শাসন ব্যবস্থার যে বিভিন্ন বাস্তবতা তার মধ্যে দিয়ে পার্বত্য এলাকার মানুষ ধীরে ধীরে স্বাধীনসত্ত্বা হারাতে যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ২০২৪ সালে এসে আমরা কি দেখি কি অনুভব করি। পাহাড়ে একটা অনিশ্চিতা জীবন, পাহাড়ে নিরাপত্তাহীন জীবনযাপন করতে হচ্ছে। আজকে যারা মোনঘরের শিক্ষাথী ছিলেন, মোনঘরীয়ান নামে তারা পরিচিত। তারা আমাদের পাহাড়ের সম্পদ। মোনঘর এই বিদ্যাপীঠ থেকে জন্মাবেন অনেক সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, কবি, সংগ্রামী মানুষ। মোনঘরে যারা জীবন অতিক্রম করে অবদান রেখেছেন তারা আগামীতে মোনঘরকে ধরে রাখবেন। আমরা ফিরে যেতে চাই জীব বৈচিত্র্যে ভরা পাহাড়- ঝর্ণার সে জীবনে কিন্তু আমরা একটা বিশেষ শাসনে শোষিত হচ্ছি। সে বাস্তবতাকে ফিরে পেতে এখানকার মানুষ লড়াই সংগ্রাম করেছি। এই লড়াই সংগ্রামে মোনঘরের শিক্ষার্থীরাও অংশ নিয়েছে। আগামীতেও মোনঘরীয়ানরা পাহাড়ে প্রতিটি লড়াই সংগ্রামে এগিয়ে আসবে এই প্রত্যাশা করছি।
চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবার্শীষ চাকমা বলেন, মোনঘরের জন্য,পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের জন্য যারা যে অবদান রেখেছে তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। এই প্রতিষ্ঠানটি ৫০ বছর পেরিয়েছে সে জন্য আমি এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদকে ধন্যবাদ জানাই। পার্বত্য অঞ্চলের অনাথ, পিছিয়ে পড়া ও বঞ্চিত প্রান্তিক এলাকা থেকে এসে মোনঘরে পড়াশুনা করছে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অনেক মেধাবি শিক্ষার্থী বের হয়ে দেশ পরিচালনা করবে এমন আশা রাখি। তাই এই প্রতিষ্ঠানে যারা অর্থ দিয়ে, শ্রম দিয়ে, সময় দিয়েছেন সবার প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মং সার্কেল চিফ সাচিং প্রæ চৌধুরী, নাট্যকার মামুনুর রশীদ, শিক্ষাবিদ শামসুদ্দীন শিশিরিসহ পাহাড়ের বিশিষ্টজনরা। বক্তারা বলেন, পাহাড়ে শিক্ষা বিস্তারের আলোকবর্তিকা এই বিদ্যাপীঠ মোনঘর আগামী দিনগুলোতে আরো জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিবে এই প্রত্যাশা সবার। মোনঘর নামটি সকলের কাছে একটি পরিচিত নাম।
উপস্থিত বক্তারা বলেন, পাহাড়ে শান্তি নিকেতন হিসেবে পরিচিত ও ১৩টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড়ি জাতিসত্ত্বাবাদের শিক্ষা প্রসারে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান মোনঘর। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজ শুক্রবার মোনঘর ৫০বছরে পা রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির এই সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে পাঁচ দশকের স্মৃতিতে নবীণ-প্রবীণদের যেন মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে রাঙামাটি শহরের অদূরে রাঙ্গাপানি নামক এলাকায় চার একর জমিতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী জ্ঞানশ্রী মহাস্থবিরের কয়েকজন শিয্য বিমল তিয্যে ভিক্ষু, প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু ও শ্রদ্ধালংকার ভিক্ষুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেন মোনঘর শিশু সদন। ‘মোনঘর’ শব্দের অর্থ পাহাড়ে জুম চাষের জন্য চাষীদের থাকার অস্থায়ী আশ্রয়স্থল। যতদিন পর্ষন্ত চাষীরা জুম ধানের বীজ থেকে অন্যান্য ফলন মোনঘরে তুলতে না পারে ততক্ষু পর্ষন্ত এই আশ্রয়স্থলে থেকে কাজকর্ম চালিয়ে যায় জুমিয়ারা।
ঠিক তেমনি পাহাড়ের ১৩টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, বম, লুসাই, পাংখোয়াসহ অসহায় ছিন্নমূল অনাথ, গরিব ও মেধাবী ছেলে-মেয়েদের মোনঘরে আশ্রয় দিয়ে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা হয়। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি পাহাড়ে অন্যতম শিক্ষার স্থান হিসেবে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচ দশকে কয়েক হাজার পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ-বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। পাহাড়ের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান মোনঘরের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবে এই প্রতিষ্ঠান থেকে পড়ালেখা করে যাওয়া শিক্ষার্থীরা তাদের সহপাঠী ও বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে স্মৃতিচারণে মেতেছেন। সেই সাথে নবীনরাও প্রবীণদের সাথে যোগ দেওয়ায় পরিণত হয়েছে একটি মিলন মেলা।