এম সাইফুল্লাহ চৌধুরী, লোহাগাড়া
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নয়, অদম্য ইচ্ছাশক্তিই মানুষকে এগিয়ে নেয়- এ কথার জীবন্ত দৃষ্টান্ত চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের দূর্গম হরিদাঘোনা এলাকার মো. আলী। দুই হাত না থাকলেও পা দিয়ে লিখে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ থেকে মাস্টার্স অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এমবিএ) ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি। এখন তাঁর একমাত্র স্বপ্ন- নিজের যোগ্যতায় একটি চাকরি পেয়ে সমাজে স্বাবলম্বী হিসেবে বিচরণ করা। ইতোমধ্যে তিনি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর আবেদন করেছেন।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মানো মো. আলীর শৈশব ছিল সংগ্রামময়। মো. আলী তাঁর জীবনের গল্পের কথা তুলে ধরে বলেন, আমি নিজে একজন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তার ওপর জন্ম থেকেই আমার দু’টি হাত নেই। আমি সমাজের বোঝা হতে চাইনি। যেভাবেই হোক চেয়েছি লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হতে। প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মেছি বলেই আমার জন্য আমার মাকেও শুনতে হয়েছে নানা কটু কথা। সমাজের লোকেরা কয়েকজন ভাল কথা বললেও অনেকে বলেছেন অপমানজনক ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যে ভরা নানান কথা। তার পরিবার এ কারনে নীরবে চোখের জল ফেলতেন।
মো. আলী বলেন , আমার মা লেখাপড়া জানেন না। তবুও তিনি চেয়েছিলেন আমি যেন লেখাপড়াটা করি। মা বলতেন, বাবারে তোর হাত নেই তো কি হয়েছে পা তো আছে। মূলত মায়ের অনুপ্রেরণাতেই আমি স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করেছি এবং পা দিয়ে লেখার অনুশীলন শুরু করি। প্রায় দুই বছরের চেষ্টায় বাংলা ও ইংরেজী অক্ষর লেখা আয়ত্ত করি। আজ আমি সাতকানিয়া সরকারি কলেজ থেকে বিবিএ (ব্যবস্থাপনা) এবং চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ থেকে এমবিএ পাশ করেছি। তিনি আরও বলেন, শিক্ষাকালীন সময়ে আমি সরকারিভাবে প্রতিবন্ধী ভাতা ও চিত্তরঞ্জন মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে শিক্ষা বৃত্তি পেয়েছি যা এখনও চলমান। মো. আলীর মা সামশুন নাহার বলেন, ছেলেটি দু’টি হাত ছাড়া জন্ম নেয়ার পর খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। প্রতিবেশীরা মনে করতো তাকে দিয়ে কিছুই হবেনা। আমি তাকে পা দিয়ে লেখা শেখাতে লাগলাম। যেহেতু হাত নেই কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাকে ভর্তি নিচ্ছিল না। তবে উত্তর বড়হাতিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর সহযোগিতায় স্কুলে ভর্তি করার মধ্য দিয়ে আলীর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। শারিরীক সীমাবদ্ধতা কখনো আলীকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সহযোগিতা আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে পা দিয়ে লেখা শিখেছিলো সে। বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি পরীক্ষায় পায়ে লিখেই উত্তরপত্র পূর্ণ করেছে। সক্ষমতার পরিচয় দেয়া মো. আলী জানান, ‘শরীরের অক্ষমতা নয়, মানসিক শক্তিই আসল ক্ষমতা। অনেক কষ্ট করে আজকের অবস্থানে এসেছি। এখন একটা চাকরি পেলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব, পরিবারকে সাহায্য করতে পারব’। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক এডিসন কান্তি দেসহ অন্যান্য শিক্ষকরা বলেন, কারো সহযোগিতা ছাড়াই পায়ে লিখেই মো. আলী বিবিএ ও এমবিএ পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে কৃতকার্য হয়। প্রতিবন্ধী হলেও তার যথেষ্ঠ মনোবল ছিলো। শিক্ষকরা আরোও জানান, মো. আলী ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও মনোযোগী ছাত্র। শ্রেণিকক্ষ কিংবা পরীক্ষায় কখনো পিছিয়ে থাকেননি। সহপাঠীদের কাছেও তিনি অনুপ্রেরণার প্রতীক ছিলেন। বড়হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ বলেন, ‘মো. আলী আমাদের এলাকার গর্ব। তাঁর জন্য একটি উপযুক্ত চাকরির সুযোগ পেলে তা শুধু তাঁর নয়, সমাজেরও সম্মানের বিষয় হবে’। বর্তমানে মো. আলী সরকারি-বেসরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত চাকরির প্রত্যাশা করছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, সুযোগ পেলে নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবেন। মো. আলীর এই সাফল্য প্রমাণ করে শরীর নয়, মনের শক্তিই মানুষকে করে তোলে বিজয়ী। লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, মো. আলী প্রতিবন্ধী হলেও তার যে প্রচেষ্টা সত্যিই অনেক প্রশংসনীয়। সরকারিভাবে চাকুরীর যদি কোনো সুযোগ থাকে মো. আলীর জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।










