
ডক্টর মুহাম্মদ কামালউদ্দিন
মানুষ বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে পৃথিবীর পরিমন্ডলে বসবাস করে। এই পারিপার্শ্বিক অবস্থাই মানুষের পরিবেশ। পারিপার্শ্বিক অবস্থা বলতে আমাদের চারপাশের আকাশ, বাতাস, মৃত্তিকা, জল, গাছপালা, ঘরবাড়ি এবং পশুপাখি ইত্যাদি উপাদানকে বুঝায়। পরিবেশের এই উপাদানগুলোই মানুষকে প্রভাবিত করে এবং পরিবেষ্টিত রাখে। প্রতিটি মানুষের নিজের একটি আভ্যন্তরীণ পরিবেশ আছে, যাকে জীব-পরিবেশ (Biological environment) বলা হয়। এই জীব-পরিবেশের সঙ্গে পারিপার্শ্বিক ভৌত পরিবেশের সুনিয়ন্ত্রিত মিথস্ক্রিয়ার ফলে পৃথিবীর পরিমন্ডলে মানুষের প্রাণপ্রবাহ বজায় থাকে। আদিম মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সংগতি (বা সমন্বয়) রেখে বাস করত, কিন্তু জীবনধারার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দ্বারা প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তন ঘটে, ফলে সৃষ্টি হয় মানুষের তৈরি পরিবেশ (Man-made environment)। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যপুস্তকে পরিবেশ রক্ষার কথা তত্ত্বাকারে তোতা পাখির বুলি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমেরিকা বা চীনের কোনো তাত্তি¡ক যেভাবে বলেছেন, আমাদের কারিকুলামগুলো যেন তার পরোক্ষ কপি। প্রতিটি সমস্যা একেক জায়গায় একেক রকম আচরণ করে।
বাংলাদেশের পরিবেশগত সমস্যার সমাধান আমেরিকার ল্যাব উৎসারিত তত্ত¡কে হুবহু বইতে তুলে ধরে বাচ্চাদের সামনে দিলেই হয় না। বাস্তবতা নির্ধারণ করাই হচ্ছে প্রথম গবেষণা। আমাদের সমস্যা আমাদের মতো করে পুস্তকে সন্নিবেশ করে তার সমাধান খুঁজতে হবে। নচেৎ প্রজেক্ট হবে, টাকা কারো কারো পকেটে যাবে; কিন্তু সমস্যা আরও বাড়তে থাকবে। ঢাকা মহানগরের ৩৫টি খাল কোথায় ছিল, তা-ই হয়তো আজ কেউ বলতে পারবে না। প্রতিটি খালেরই নিঃসরণ মুখ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা বা বংশাই নদীতে শেষ হয়েছিল। কিন্তু খালগুলোর উৎস বা নিঃসরণ মুখ আজ বিবর্ণ ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। কারণ পার্শ্ববর্তী নদীগুলোই আজ কাফনের কাপড় মুড়িয়ে কবরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দখলে-দূষণে আজ তারা আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। নগর ও কারখানার অপরিশোধিত-বিষাক্ত বর্জ্য পাইপলাইনের মাধ্যমে ওই সব নদী ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। দেখার কেউ নেই; তবে দূষণকারী-দখলকারীর সঙ্গী-সাথীর অভাব নেই। কারখানা, বাড়ি-ঘর নির্মাণের জন্য প্রত্যেককেই পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হয়। কিন্তু ছাড়পত্র প্রদান করা হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে আন্ডার-টেবিল ডিলিংসের মাধ্যমে। কারণ সরেজমিনে পরিদর্শন বলতে টেবিলের নিচের জায়গাকেই যেন বোঝানো হয়। টেবিলের নিচের কাজ-কারবার বাকি-বকেয়া হলেই কেবল সরেজমিনে যাওয়া হয়।
টেবিলের নিচের কারবার যত বাড়ে, শীতলক্ষ্যারা ততই মরে। যে ছাড়পত্র দিচ্ছে তার কোন ভাবনা নাই, সমস্যা নাই। পুরো একটি জনগোষ্ঠির সমগ্র নষ্ট করতেও তার কোন ইচ্ছেরে কমতি নেই, এই হল শিক্ষা।
শিক্ষা পরিবেশগত সচেতনতা তৈরিতে একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসাবে কাজ করে। শিক্ষামূলক পাঠক্রমে সংরক্ষণের নীতিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তরুণদের মানস ও আচরণ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। দেশে টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিবেশ শিক্ষাকে জাতীয় পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই অন্তর্ভুক্তি শিক্ষার্থীদের পরিবেশগত সমস্যা এবং টেকসই অনুশীলন সম্পর্কে শিক্ষিত করতে সাহায্য করবে। গণমাধ্যম (সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও ইত্যাদি) পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, আইন ও নীতি সম্পর্কে জনগণের জ্ঞান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে পারে। পরিবেশগত সমস্যা সম্পর্কে জনসাধারণকে শিক্ষিত করার জন্য বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রচারাভিযান, কর্মশালা ও মিডিয়ার মাধ্যমে এনজিওগুলো মানুষকে পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব এবং কীভাবে তাদের কর্মকান্ড পরিবেশকে প্রভাবিত করে, তা বুঝতে সাহায্য করে। জ্ঞানের সঙ্গে ব্যক্তিকে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে পৃথিবীকে রক্ষা করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
এ ছাড়া মানুষ সামাজিক প্রাণী, তাই সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ (ঝড়পরধষ-পঁষঃঁৎধষ বহারৎড়হসবহঃ)-ও মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। তাই মানব-পরিবেশ বলতে প্রাকৃতিক, মনুষ্যসৃষ্ট এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশকেই বুঝায়। বর্তমান পৃথিবীতে বসবাসের জন্য রয়েছে পরিবেশগত অফুরন্ত সম্ভাবনা এবং অন্যদিকে রয়েছে মারাতত্মক পরিবেশগত ঝুঁকি। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর পড়ছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। যার ফলাফলস্বরূপ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন-বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন, টর্নেডো প্রভৃতি দেখা যাচ্ছে। এ কারণে জীব ও জীবের বসবাসকৃত পরিবেশের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন, যা পরিবেশ শিক্ষা অধ্যয়নের মূল আলোচ্য বিষয়। আলোচ্য অধ্যায়ে পরিবেশ ও পরিবেশ শিক্ষার ধারণা, পরিবেশ শিক্ষার পরিধি, প্রয়োজনিয়তা এবং জলবায়ুু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
পরিবেশ শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করবে এবং ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হবে। এর ফলে যে-কোনো প্রতিষ্ঠানের ভৌত অবকাঠামো, শিক্ষা উপকরণ ও অন্যান্য সামগ্রী পরিবেশ শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে সক্ষম হবে। উৎসাহী শিক্ষার্থীরা পরিবেশ ক্লাব গঠন করে পরিবেশ বিষযকে যে কোনো সমস্যা চিহ্নিত করবে এবং প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা গ্রহণ করবে। বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণের কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হতে হবে।
পরিবার ও শিক্ষালয় যেখানে পরিবেশের শিক্ষার হাতেখড়ি হবে; সেখানেও তথৈবচ অবস্থা। শিশুরা প্রতিনিয়ত দেখছে মা-বাবা জানালা দিয়ে থু থু ফেলছেন, ছেঁড়া কাগজ ফেলছেন। যখন দেখে মা ঘর ঝাড়ু দিয়ে ময়লাগুলো যততত্র নিক্ষেপ করছেন; রান্নাঘরের বর্জ্য ঘরের পাশেই ফেলে দিয়ে নাক চেপে ধরে ঘরে ফিরছেন; তখন শিশুরা মনে করছে এটাই বুঝি নিয়ম। তারাও বড় হয়ে একই কাজ করছে হিরোর মতো। খাওয়ার পর কোকের বোতল স্টাইল করে নিক্ষেপ করাও আমাদের সমাজে হিরোইজম হিসেবে দেখা হয়।
আজকালকার তরুণ-তরুণীদের ডাস্টবিন দেখে নাক সিটকানো এক ধরনের আধুনিকতা। যদিও ডাস্টবিনের গন্ধ আমাদেরই তৈরি। ঘরে বিড়াল পালা হয়; পাখি পালা হয় কিন্তু একটি ময়লার ঝুড়ি কেনা হয় কদাচিৎ। কারণ পাখি পাললে, ফুলের টব থাকলে নাকি জাতে ওঠা যায়। তাই ময়লার ঝুড়ি ঘরের কোণে বা রান্নাঘরে যথারীতি স্থান পায় না। এই হলাম আমরা।
শিক্ষার দ্বারা নীতিবোধের বিকাশ, দেশপ্রেম, বিবেকবোধ জাগ্রত না হলে পরিবেশ-শিক্ষাটাকে বিলাসিতাই মনে হবে। শিক্ষাটা পরীক্ষা, জিপিএ-৫ এর নষ্ট জালে আটকা পড়েছে। জাল যদি দৈবক্রমে ছিঁড়ে যায় তবেই রক্ষা। আর নাহয় এমন লেখনি প্রতিবাদ আর কথা বলা এই জাতিকে মুক্ততে নিতে পারবে না। আমি সেইসময় পর্যন্ত বলে যাব যেইসময় সুন্দর পরিবেশ বিকশিত হবে না। আসুন সকলে মিলেই পরিবেশটাকে সুন্দর রাখি নিজেদের জন্য।
লেখক : শিক্ষাবিদ, নজরুল গবেষক










