পতেঙ্গায় পাওয়া যাবে কক্সবাজার সৈকতের স্বাদ

10

একসময় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতকে মানুষ উপভোগ করত প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা সৈকতের বালুচরে পানিতে গা ভিজেয়ে বা বেড়িবাঁধের বড় বড় পাথরগুলোতে দাঁড়িয়ে বা বসে বিস্তৃর্ণ জলরাশির ঢেউ। সময়ের ব্যবধানে এ সৈকতের সংস্কার হয়েছে। সৈকতের দক্ষিণ পূর্বের গা ঘেঁষে কর্ণফুলির তলদেশে গড়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম এবং দীর্ঘ বঙ্গবন্ধু টানেল। আছে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। উত্তর পাশে গড়ে উঠছে বে-টার্মিনাল। এসব স্থাপনাকে সামনে রেখে গড়ে তোলা হয়েছে স্থায়ী বেড়িবাঁধ যার উপরে দীর্ঘ লিংরোড নির্মাণ কাজ চলছে। বেড়িবাঁধ কাম লিংকরোডের প্রবেশদ্বার পতেঙ্গ সমুদ্র সৈকতকে আকর্ষণীয় ও পর্যটকমুখী করার জন্য চট্টগ্রাম সিটি করের্পারেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। করা হয়েছে সৈকতে নামার জন্য ঘাট, ওয়াকওয়ে ইত্যাদি। পর্যটকরা যাতে তীরে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের বিশালত্ব অনুভব করতে পারে সেই জন্য আরসিসি ঢালাই করে উদ্যান করা হয়েছে, বসার জন্য গ্যালারি করা হয়েছে। কিন্তু সবকিছুই ভাসমান হকার আর স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে। সৈকতে নামার দুটি ঘাটই স্পীড বোট এর দখলে। পর্যটকদের হাঁটার, বসার কোন জায়গা নেই যা আছে তা ভাসমান খাবার দোকানগুলোর সারি সারি চেয়ার। বসলেই দোকানের অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতেই হবে। পতেঙ্গা সৈকতের এসব নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি ও বিপন্ন পরিবেশ নিয়ে দৈনিক পূর্বদেশসহ বিভিন্ন সময় স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রতিবেদন ছাপানো হয়েছে। অবশেষে প্রশাসনের টনক নড়েছে বলে আমাদের ধারণা। জেলা প্রশাসন এবার এ বিচটির সংস্কারসহ এগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এ চট্টগ্রাম জেলার বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির একসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতকে কক্সাবাজার সমুদ্র সৈকতের আদলে গড়ে তোলার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণসহ একগুচ্ছ পরিকল্পনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে আমরা জানতে পারি। সভায় নগরের পতেঙ্গা ও আনোয়ারার পারকিসহ জেলার সকল সমুদ্র সৈকতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পর্যটন উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট কার্যাবলী সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একইসঙ্গে সমুদ্র সৈকতগুলোর নিরাপত্তা, শৃংখলা পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাদির ব্যবস্থা, অবকাঠামো নির্মাণ, সৈকতের সার্বিক উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনার জন্য মহাপরিকল্পনা তৈরি এবং পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের আদলে গড়ে তোলার বিষয়ে কমিটির সদস্যরা মতামত দেন। আলোচনা সভা শেষে ১৬টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেগুলো হলো বিচ সংশ্লিষ্ট এলাকায় পর্যটকদের সুবিধাজনক অবকাঠামো নির্মাণ করা, বিচ এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা, স্থায়ী/অস্থায়ী অফিস স্থাপন, সমুদ্র সৈকতের জন্য মহাপরিকল্পনা তৈরি, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পূর্ব পর্যন্ত সৈকতের দোকানসমূহ সুশৃংখল ও পুনর্বাসন করা, সৈকত এলাকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য পোশাকধারী সেবক নিয়োগ, গাড়ি পার্কিং, সেবা গুলোকে জোন ভিত্তিতে ভাগ করা, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের আদলে সাজানো, বিচের গেজেটভুক্ত এলাকা চিহ্নিত করে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও অবৈধ দখলদারদের পুনর্বাসন করে উচ্ছেদ করা, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ব্যবস্থা নেওয়া, পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা ব্যবস্থাসহ সৈকতের সার্বিক উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনাসহ বিদেশি পর্যটকদের জন্য সৈকতে এক্সক্লুসিভ জোন নির্ধারণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা, পর্যাপ্ত টয়লেট, শৌচাগার, চেঞ্জিং রুম ও ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণ, বিচ এলাকায় ফটোগ্রাফারসহ বিভিন্ন সেবা প্রদানকারীদের সংখ্যা নির্দিষ্টকরণ, সাময়িক পরিচয়পত্র প্রদান, সেবা মূল্য নির্ধারণ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা, সৈকত এলাকায় খাদ্য দ্রব্যের মূল্য বাজার মূল্যের সঙ্গে মিল রেখে বিক্রয়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। এছাড়া পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের উন্নয়নের বিষয়ে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। সৈকত এলাকায় পর্যটকদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য ট্যুরিষ্ট পুলিশের অফিস নির্মাণের উদ্যোগের বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা মনে করি, দেরি হলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। বিচ ব্যবস্থাপনা কমিটির গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত তার প্রাণ ফিরে পাবে। চট্টগ্রাম নগরীর গা ঘেঁষে গড়ে উঠা এ বিচের প্রতি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ বেড়ে যাবে। তবে এ উদ্যোগের সাথে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে সম্পৃক্ত করলে কাজের গতি বাড়বে বলে আমাদের ধারণা। যেভাবেই হোক, বিচটি আকর্ষণীয়, নিরাপদ ও পর্যটনবান্ধব করার যতরকম প্রক্রিয়া আছে তা অনুসরণ করে ব্যবস্থাপনা কমিটি গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে আন্তরিক হবেন-এমনটি প্রত্যাশা নগরবাসীর।