পটিয়ার ৪ গ্রাম থেকে পানি উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ

75

পটিয়ার চারটি গ্রামকে ‘পানি সঙ্কটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। ২০১৩ সালের পানি আইনের ১৭ ধারার অধীনে আগামী তিন মাসের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে আদালত। পাশাপাশি পটিয়ার চরকানাই, হুলাইন, পাচুরিয়া এবং হাবিলাসদ্বীপ গ্রামে অব্যাহতভাবে সুপেয় পানি সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয় বোর্ড, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসক ও পটিয়া উপজেলা চেয়ারম্যানকে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলেছে আদালত। খবর বিডিনিউজের
২০১৩ সালের পানি আইনের ১৭ ধারায় পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা এবং তার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। (১) সরকার নির্বাহী কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে জলাধার বা পানিধারক স্তরের সুরক্ষার জন্য, যথাযথ অনুসন্ধান, পরীক্ষা নিরীক্ষা বা জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যেকোন এলাকা বা উহার অংশবিশেষ বা পানি সম্পদ সংশ্লিষ্ট যেকোন ভূমিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসাবে ঘোষণা করতে পারবে। (২) উপ-ধারা (১) এর অধীন জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে মৌজা ম্যাপ ও দাগ নম্বর উল্লেখ করিয়া পানি সংকটাপন্ন এলাকার সীমানা নির্দিষ্ট করতে হবে। (৩) নির্বাহী কমিটি পানি সংকটাপন্ন এলাকার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করিবার লক্ষ্যে, এই আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে, সুরক্ষা আদেশ দ্বারা যে কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারবে।
২০১৫ সালে এ সংক্রান্ত একটি রিটে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদীর হাই কোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। রুলের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ফিদা এম কামাল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মিনহাজুল হক চৌধুরী,আলী মুস্তফা খান এবং সাঈদ আহমেদ কবীর।
আটটি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে এ চার গ্রাম থেকে পানি উত্তোলন বন্ধ রাখার পাশপাশি দূষণের মাত্রা যাচাই করে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়েরও নির্দেশ দেওয়া হয় রায়ে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসককে দূষণের মাত্রা ও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।
এই আট শিল্প প্রতিষ্ঠান হল- বনফুল অ্যান্ড কোম্পানি, বনফুল মিনারেল ওয়াটার কোম্পানি, আম্বিয়া নিটিং ডাইং লিমিটেড, আম্বিয়া পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস লিমিটেড, মোস্তফা পেপার কমপ্লেক্স লিমিটেড, হাক্কানী পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস লিমিটেডি, আনোয়ারা পেপার মিলস লিমিটেড ও শাহ্ আমানত নিটিং অ্যান্ড ডাইং লিমিটেড। আদালত রায়ে বলেছে, ভবিষ্যতে ওই চার গ্রামে পানির বিকল্প ব্যবস্থা না করে ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর নির্ভর করে ‘লাল’ বা ‘কমলা’ শ্রেণির শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না। এছাড়া পরিবেশগত ছাড়পত্র ও কার্যকরী বর্জ্য শোধনাগার প্ল্যান্ট ছাড়া পটিয়ায় কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান যেন না চলে তা পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এ বিষয়ে আদালতে বাস্তবায়ন প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পরে সাংবাদিকদের বলেন, আটটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের অপরিকল্পিত গভীর নলকূপ দিয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পটিয়ার হাবিলাস দ্বীপ ইউনিয়নের চরকানাই, হুলাইন,পাচুরিয়া এবং হাবিলাসদ্বীপ গ্রামে পানির স্তর নিচে নেমে যায়। এতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের স্থাপন করা ৩৫০টি টিউবওয়েল পানি ওঠা বন্ধ হয়ে গেলে চার গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কটে পড়ে।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, যে আট শিল্প প্রতিষ্ঠানের পানি উত্তোলনের কারণে গ্রামগুলোতে পানি সঙ্কট দেখা দিয়েছিল তাদের মধ্যে ছয়টিরই পরিবেশগত ছাড়পত্র ছিল না। এমনকি বর্জ্য শোধনাগার প্ল্যান্ট ছাড়াই সেগুলো চলছিল।
সেই প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) পক্ষে আট শিল্প প্রতিষ্ঠানের পানি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা এবং প্রতিকার চেয়ে হাই কোর্টে রিট আবেদন করা হয়। সে বছরের ২৯ জানুয়ারি আদালত কয়েকটি অন্তর্র্বতীকালীন নির্দেশনাসহ রুল জারি করে। সেই রুলের অংশবিশেষ যথাযথ ঘোষণা করে গতকাল মঙ্গলবার রায় দেওয়া হল।
মামলাটি চলমান রাখা হয়েছে এবং দেশে পানি আইনের অধীনে এটিই প্রথম আইনি পদক্ষেপ বলে জানান এই আইনজীবী।
আদালতের আদেশের পর গত চার বছরে অবস্থার উন্নতি হয়েছে কিনা জানতে চাইলে রিজওয়ানা হাসান বলেন, মামলার শুনানিতে পরিবেশ অধিদপ্তর শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর দূষণ নিয়ে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন তুলে ধরেছে। এছাড়া পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড যেসব প্রতিবেদন আদালতে দিয়েছে তাতে এটা স্পষ্ট যে, গ্রামগুলোতে এখন নলকূপ বা টিউবয়েল দিয়ে পানি উত্তোলন সম্ভব না। মাটির ১৫০ মিটার নিচ থেকে পানি উত্তোলনে সক্ষম এমন পাম্প বসিয়ে এলাকাবাসীর পানি চাহিদা মেটাচ্ছে সরকার। তবে আমরা এর বিরোধিতা করে বলেছি, সরকারের এমন উদ্যোগ ক্ষয়িষ্ণু ভূগর্ভস্থ পানি স্তরের উপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। আমরা বলেছি, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পাশ্ববর্তী খালের পানি নিয়ে কার্যক্রম চালানোয় খালের পানিও দূষিত হয়ে পড়েছে। তাই খালের পানি পরিশোধন করে গ্রামের মানুষের পানির চাহিদা প্রাথমিকভাবে পূরণ করা হোক।
২০১৫ সালে রুল জারির পাশাপাশি পরিবেশগত ছাড়পত্র না নেওয়া পর্যন্ত বনফুল অ্যান্ড কোম্পানি (ফুড প্রডাক্টস), বনফুল মিনারেল ওয়াটার, আম্বিয়া পেপার মিলস, আনোয়ার পেপার মিলস ও মোস্তফা পেপার প্রডাক্টসের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল আদালত।
সেই সঙ্গে পটিয়ার হাবিলাস দ্বীপ ইউনিয়নে অবস্থিত চারটি পেপার মিল, দুটি পোশাক কারখানাসহ আটটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের বসানো গভীর নলকূপ বন্ধেরও নির্দেশ দিয়েছিল। পাশাপাশি আদালত আটটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য কৃষি জমি ও খালে ফেলার উপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
অন্তবর্তীকালীন এসব নির্দেশনার পাশাপাশি আদালত রুল জারি করে জানতে চায়, পরিবেশ দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম চালানো কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। এছাড়া গভীর নলকূপ দিয়ে পানি উত্তোলন কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, ওইসব এলাকাকে পানি সঙ্কটাপন্ন এলাকা হিসেবে কেন ঘোষণা করা হবে না এবং ওইসব এলাকার মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না- তাও জানতে চাওয়া হয় রুলে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ ২৯ বিবাদীকে চার সপ্তাহের মধ্যে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল।