
মুহাম্মদ এনামুল হক মিঠু
মানুষের জীবনে বাবা নামের মানুষের অবস্থানটা ঠিক কোথায় ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা প্রায়শই দেখি, তিনি নেই সামনে, নেই উচ্চারণে, নেই গল্পের প্রথম সারির আলোয়, অথচ পরিবার নামের যে স্থাপত্যটি দাঁড়িয়ে আছে ফুলের মতো কোমল, শেকড়ের মতো শক্ত, তার মূল স্তম্ভটি হলেন সেই নীরব মানুষ, যাকে আমরা ‘বাবা’ বলে ডাকি।
বাবারা মায়ের মতো আবেগী প্রকাশে স্বচ্ছ নন। তারা সন্তানদের মাথায় হাত রেখে বলেন না- ‘আমি তোমাদের জন্য কত কিছু করি।’ বরং সন্তানদের জন্য কত কিছু করেন, তার বেশিরভাগই চাপা পড়ে যায় দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। অনেকে একসময় বুঝেই ফেলেন না, এই নীরব মানুষটির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে তাদের নিরাপত্তা, তাদের ভবিষ্যৎ, তাদের প্রতিটি ছোট স্বপ্নের আলো।
‘বাবারা শব্দে নয়, আচরণে ভালোবাসেন’ দুনিয়ার সব ভালোবাসা যে চোখে দেখা যায় না, বাবার ভালোবাসা তারই সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তিনি সন্তানদের বুকে জড়িয়ে বলেন না ‘আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি’ তবুও বাজারের শেষ টাকাটা খরচ করেন সন্তানের খুশির পিছনে। সন্তানদের স্কুল ফি সময়মতো দেওয়া, রাতে নিজের ক্ষুধা ভুলে ঘরে খাবার তুলে দেওয়া, ভোররাতে উঠে বাস ধরতে ছুটে চলা, এসব কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এগুলো নীরব, অপ্রকাশিত ভালোবাসার পূর্ণ অধ্যায়।
তিনি ঘাম ভেজা শার্টে লুকিয়ে রাখেন দিনের পর দিন পরিশ্রমের গন্ধ, আর সেই গন্ধে মিশে থাকে নিঃশব্দ দায়িত্ববোধ। তিনি ক্লান্ত হয়ে ফিরলেও মুখে আনেন নরম হাসি, সন্তানের সামনে ক্লান্তি দেখানো তার স্বভাবে নেই। তিনি কঠোর দেখালেও ভেতরে থাকেন নরম, সন্তানের একটি সামান্য কষ্টও তাকে ব্যথিত করে ফেলে।
‘মায়ের শেখানোর মধ্যে লুকানো থাকে বাবাকে বুঝতে শেখা’ প্রত্যেক মায়ের উচিৎ সন্তানের হৃদয়ে বাবার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলা। মা বলতে পারেন, ‘বাচ্চারা, যখন তোমাদের বাবা ঘরে ফিরবেন, সবাই মিলে এগিয়ে গিয়ে তাকে হাসিমুখে স্বাগত জানাবে। বলবে- ‘বাবা, তোমাকে আমরা খুব ভালোবাসি।’ তোমাদের বাবা সারাদিন কাজ করে ফেরেন শুধুই তোমাদের মুখের হাসির আশায়।’ একটি ছোট্ট বাক্য, একটি ছোট অভ্যর্থনা-একজন বাবার জন্য তা দিনের সমস্ত ক্লান্তিকে ধুয়ে দেয়।
‘বাবা মানে ছায়া, কিন্তু ছায়াকে কেউ দেখে না’ বাবারা অনেকটা সেই পুরোনো গাছের মতো, যাকে কেউ ফুল দিতে দেখে না, রূপ দিতে দেখে না-কিন্তু যার ছায়ায় দাঁড়িয়েই পরিবার ঠান্ডা বাতাস পায়। বাবা মানে সেই মানুষ, যিনি নিজের স্বপ্ন পিছিয়ে দেন সন্তানদের স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে, যিনি নিজের প্রয়োজন ভুলে যান পরিবারের প্রয়োজন সামনে এলেই, যিনি নিজের মনের কষ্ট গোপন করেন শুধু সন্তানদের মুখে আনন্দ দেখতে।
তারা রাত জেগে হিসাব মিলান, অথচ কাউকে জানাতে চান না। তারা দিনের শেষে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, অথচ বাড়িতে প্রবেশ করার আগে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ক্লান্তিটুকু ফেলে রেখে তবেই ভিতরে যান। ‘নীরবতাই তাদের শক্তি, তবুও সেই নীরবতাই তাদের ভুল বোঝার কারণ’ অনেক সন্তান মনে করে- ‘বাবা কেমন যেন চুপচাপ, কঠোর, কম কথা বলেন’ কিন্তু সেই নীরবতার পেছনে লুকিয়ে থাকে পাহাড়সম দায়িত্ব, জীবনের কঠিন বোধ, আর পরিবারের প্রতি অবিরাম চিন্তা।
সন্তানরা যত বড় হয়, ততই তারা বুঝতে শেখে কথা কম বলাই ভালোবাসার কমতি নয়, নীরব থাকা মানেই আবেগহীন হওয়া নয় বরং নীরবতার ভেতরেই বাবারা লড়াই করেন পরিবারের ভবিষ্যৎকে সুন্দর রাখার জন্য।
‘একটি আলিঙ্গন একজন বাবার অমূল্য পাওয়া’ সন্তানের ছোট্ট একটি আলিঙ্গন একজন বাবার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শান্তি। একটি “বাবা, তুমি কেমন আছ?” এই প্রশ্ন একজন বাবার কঠোর মুখে অদৃশ্য হাসি এনে দেয়, তার কঠিন দিনকে নরম করে দেয়, তার ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দেয়। বাবারা ভালোবাসা প্রত্যাশা করেন না- শুধু চান শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা, আর একটি সরল হাসি।
পরিবারের আশ্রয়, শক্তি, ভিত্তি-বাবার আরেক নাম। বাবা শুধু অর্থ উপার্জনকারী নন। তিনি পরিবারের নীরব রক্ষাকবচ, যিনি ভালোবাসাকে লুকিয়ে রাখেন ত্যাগের আড়ালে, যিনি ব্যর্থতাকে নিজের মধ্যে গোপন করেন, যিনি ভবিষ্যৎকে দেখেন সন্তানদের চোখ দিয়ে। একজন বাবা কখনোই চান না-তার সন্তান তাকে ভয় পাক -তিনি চান বাচ্চারা তাকে বুঝুক, শ্রদ্ধা করুক, তার পাশে দাঁড়াক।
শেষ কথা : যেদিন সন্তানরা বুঝতে শেখে, বাবার নীরবতা কোনো দূরত্ব নয়, বরং তা ভালোবাসার অন্য রূপ সেদিনই তারা উপলব্ধি করে। পরিবারের প্রকৃত নায়ক সবসময় আলোতে দাঁড়ান না। অনেকে আলো জ্বালিয়ে রাখেন অদৃশ্য হয়ে, নিঃশব্দে, ধৈর্যের ভরসায়। একজন বাবা- তিনি যতটা শক্ত, তার ভেতর ততটাই কোমল। তিনি যতটা নীরব, তার ভালোবাসা ততটাই গভীর। তিনি যতটা কঠোর দেখান, তার ভেতর ততটাই মমতা জমে থাকে। বাবা তিনি সত্যিই নীরব দায়িত্ববোধের সবচেয়ে সুন্দর মডেল। সবাই বাবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন বাবার পাশে থাকবেন- পৃথিবীর সকল বাবা সুখে থাকুক, ভালো থাকুক এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : প্রাবন্ধিক










