
সালাহউদ্দিন শাহরিয়ার চৌধুরী
রাস্তা পারাপার হতে গিয়ে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনার স্বীকার হচ্ছেন পথচারীরা। কেউ হচ্ছেন পঙ্গু, কেউ আবার পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। বাংলাদেশে এসে এক বিদেশি পর্যটক বলেছিলেন. “আমি একসময় নাস্তিক ছিলাম অর্থাৎ ঈশ্বরকে বিশ্বাস করতাম না কিন্তু বাংলাদেশে এসে মনে হলো একজন ঈশ্বর আছেন এবং এদেশের পথচারীদের ঈশ্বর রক্ষা করেন, না হয় এমন অনিয়ন্ত্রিত গাড়ি এবং পথচারীদের রাস্তা পারাপার প্রতিমূহুর্তে মৃত্যু এখানে হাতছানি দেয়। প্রতিদিন এ রকম চিত্র সারা বাংলাদেশে অনেক জায়গায় লক্ষ্য করা যায়। ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা এভাবে পারাপার বন্ধে বিভিন্ন পয়েন্টে ফুটওভার ব্রিজ তৈরি হলেও তার ব্যবহারে পথচারী- নগরবাসীর রয়েছে অনীহা। দেখা যায়, পথচারীরা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে রাস্তার আইল্যান্ড টপকে, সুযোগ বুঝে রাস্তার ওপর দিয়ে দ্রæতগতির যানবাহনের সামনে দিয়েই দৌড়ে পারাপার হচ্ছেন। গুটিকয়েকজন ছাড়া সবাই ঝুঁকি নিয়ে নীচ দিয়েই রাস্তা পার হচ্ছেন। নারী, শিশু, শিক্ষার্থী, রোগী এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও হেঁটে রাস্তা পার হচ্ছেন এমনিভাবে। সচেতনতার অভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিনই রাস্তা পারাপার হচ্ছেন পথচারীরা। অবার অনেক ফুটওভার ব্রিজ পথচারীদের পারাপারের জন্য তৈরি করা হলেও তা ব্যবহার হচ্ছে না। চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার ও নিউমার্কেট সংলগ্ন এলাকায় স্থাপিত হওয়া দুটি ফুটওভার ব্রিজের একটাও ব্যবহার করেনা পথচারীরা। ফুটওভার ব্রিজের ছাউনি নেই, সিঁড়িগুলো ময়লা আবর্জনায় ভরা, ব্রিজের উপরে সব মল-মূত্র ,বখাটে ও মাদকসেবীদের আড্ডা যার কারণে পথচারীরা ফুটওভার ব্রিজ পার না হয়ে নিচ দিয়ে চলে যায়। মিউনিসিপ্যাল স্কুলের সামনে যে মোড়টি আছে তার গোড়ায় সব ফুটপাতের উপর ভ্রাম্যমাণ দোকানের সারি ফুটওভার ব্রিজটির একপাশ অবৈধভাবে দখল করে বসেছে দোকান। এতে চলাচলের রাস্তা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটা যায় না। একপাশ থেকে অন্য পাশে যেতে অনেক দূর থেকে ঘুরে আসতে হয়। অন্যান্য যে ফুটওভার ব্রিজ রয়েছে সেখানেও ওজন মাপার যন্ত্র, নামাজ পড়ার টুপি, আতর, তসবিহ থেকে শুরু করে মোজা-গেঞ্জি, শার্ট, ব্রাশ, বিছানার চাদর, মোবাইল ফোন অ্যাক্সেসরিস সহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে বসেছেন হকাররা, এসব দোকানের কারণে পথচারীরা ব্রিজ দিয়ে সহজে হাঁটতে পারে না।
চট্টগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে নেই ফুটওভার ব্রিজ,বিভিন্ন স্থানে বর্তমানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, সড়ক দূর্ঘটনা রোধে যা নিয়ামক ভূমিকা হিসেবে পালন করবে।বর্তমানে ৬০ লক্ষাধিক জনসংখ্যার এ নগরীতে ক্রমাগত বাড়ছে যানবাহনও। নগরীর শাহ্ আমানত সেতু সংযোগ সড়ক, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ষোলশহর, ২নং গেইট, জিইসি, লালখান বাজার, টাইগার পাস, দেওয়ানহাট, আগ্রাবাদ, নিমতলা বিশ্বরোড, অলংকার, হালিশহর,বড়পোল, কাস্টমস, সল্ট গোলা ক্রসিং এবং সিমেন্ট ক্রসিং মোড়সমূহে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটলেও স্থাপিত হয়নি ফুটওভার ব্রিজ। এইসব সড়ক পার হতে গেলেই ভয় লাগে, মনে হয় এই বুঝি দুর্ঘটনা ঘটলো, রাস্তা পারাপারে কি ভোগান্তিই না পাচ্ছে পথচারীরা। পথচারীরা নিশ্চয়ই নিত্যদিন মৃত্যুভয় হাতে নিয়ে চলাচল করেন শুধু সংশ্লিষ্ট কর্তৃৃপক্ষগুলো কিছুই অনুধাবন করতে পারেন না। তাই বিভিন্ন জনবহুল গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পথচারীদের জন্য ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ হলে নগরীতে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আসবে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায় দুর্ঘটনা এড়াতে শুধু ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণই কি সমাধান? প্রকৃত অর্থে ফুটওভার ব্যবহারের জন্য আগে জনগণের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। শুধু মাত্র জনসচেতনতার অভাবে পথচারীরা ফুটওভার ব্যবহার করছেনা না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কিছু অব্যবস্থাপনা তাদের সে সুযোগ করে দিচ্ছে। জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন সময় সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয় কিন্তু জনগণের মাঝে সেইগুলো তেমন একটা আস্থা অর্জন করতে পারেনি। আমরা দেখেছি একসময় পথচারীদের ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে সড়ক পারাপারে শাস্তির বিধানও করা হয়েছিল, বসানো হয়েছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু এতসব উদ্যোগের পরও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে জনগণের মাঝে অনীহা থেকেই গেছে। আর এই অনীহা থেকেই আমরা দেখেছি জনগণই ফুটওভার ব্রিজের আশে পাশে কয়দিন পর রোড ডিভাইডার ভেঙ্গে চলাচলের ব্যবস্থা করেন আবার দিনদুপুরে অথবা রাতে অন্ধকারে রাস্তায় দেওয়া ফেন্সিং ও গ্রীলসমূহ চুরি হয়ে যায়। পথচারীদের ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে আগ্রহ নেই এর জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব ও মানুষের অসচেতনাতাই দায়ী। ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নই। কেউ যদি নিজ থেকে নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি না বিবেচনা করেন তাহলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না।
দুর্ঘটনা রোধে সড়ক আইন পালনে আমাদের সবার মনমানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। প্রথমত ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মূল সড়কে আইল্যান্ড বা রোড ডিভাইডার দিয়ে রাস্তা পারাপারের স্থান বন্ধ করে দিতে হবে। সচেতনতার পাশাপাশি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করে পথচারীদের ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে বাধ্য করতে হবে। ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে চলাচলের জন্য সঠিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। ফুটওভারের আশে পাশে নতুন পথ সমূহ হকারমুক্ত করতে হবে। ট্রাফিক বিভাগকে এবং আইন শৃংখলা বাহিনীকে আরো সচেষ্ট হতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে এবং জন সচেতনতা বাড়াতে চাই সম্মিলিত উদ্যোগ, ফুটওভার ব্রিজ যেমন নির্মাণ করা জরুরী তেমনি ট্রাফিক বিভাগে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। তবে শুধু নাম মাত্র ফুটওভার ব্রিজ তৈরী করে অর্থ খরচ করলে হবে না তা ব্যবহারের জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ফুটওভার ব্রীজ তৈরী হলেই যে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ হবে এমনটা ভাবলে হবে না। গাড়ির চালক থেকে শুরু করে আমাদের সবাইকে আইন ও নিয়ম মানার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।
লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার
বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ










