নিমফুল

11

নূরনাহার নিপা

মোবাইলে ঘড়ির অ্যালার্ম বেজে উঠতে ঘুম ভেঙে গেলে দেখে তখন সুবেহ সাদিক। একটা ঘোরের মধ্যে ঘুম ভাঙে নিমফুলের। লেপ্টে থাকা শরীরটা অলসতা ঝেড়ে ছাদবাগানে ফুলদের সাথে কিছুটা গল্প করা। গাছের সাথে বন্ধুত্ব করে, তাদের কষ্টগুলো জানতে কাছাকাছি আসে নিমফুল। গাছের খিদে তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে। আর্তনাদ জীর্ণ ঝরাপাতা ঝরে অকালে যখন তখন তাদের বুকে মারছে কোপ। যখন কোনো গাছ কেটে ফেলে, তখন নিমের মনে হয় তার বুকের উপর কুড়াল মারছে কেউ একজন।
আহা কতো প্রাচীন বৃক্ষতল, বনজঙ্গল কেটে বড় প্রাসাদ গড়ে তখন কষ্ট হয়, কবে তোরা মানুষ হবি! গাছের ডালে পাখিটা রোজ এসে নিমের সাথে কথা বলে। পাখিটা উড়াল দিতে চাইলো, কিন্তু পারলো না।
একদিন নিমের ইসকুলে হরিনন্দনাথ স্যার প্রশ্ন করেন, নিমফুল নামকরণ অর্থ কী? নিম ছোট করে তার অনুভূতি প্রকাশ করল-
স্যার, আমার জন্মের পর বাবা মাকে একটা নিমগাছ উপহার দিয়েছিল, মা তো ভীষণ খুশি। মা এমনিতেই গাছপাগল মানুষ। বাড়ির উঠানে যত গাছ সব মায়ের হাতের লাগানো। নিমগাছ, কাঁঠাল গাছ, নারকেল গাছ, পেঁয়ারা গাছ, আম গাছ, আনারস, বড়ই গাছ সব দল বেঁধে বাড়ির সৌন্দর্য যেন এক নিখাঁদ সবুজ, ছিমছাম বাগান।
মা বলতেন, শরীরের পিত্ত বেড়ে গেলে নিমফুল খেলে অনেক উপকার হয়। তাছাড়া ডায়াবেটিসের সমস্যায় ভুগলে নিয়মিত নিমফুলের শরবত, ২ গ্লাস জলে ১ চামচ নিম ফুলের গুঁড়ো মিশিয়ে এতে সামান্য আদা কুচি আর কাঁচা আম কুচি, সামান্য গোলমরিচ গুঁড়ো আর গুড় মিশিয়ে পান করলে শরীরটা ভালো থাকে। তখন মা যতন করে নিমগাছটা লাগিয়ে ছিলো। শখ করে মা আমার নাম রেখেছিল নিমফুল। সবাই নিম বলেও ডাকে!
বেশকিছুদিন পর নিমগাছে ফুল ফোটে। নিমফুলের মধ্য অ্যান্টিসেপটিক গুণ রয়েছে। মা বলতো নিমফুলের শরবত রক্তকে পরিশুদ্ধ করে, ত্বকের সমস্যা কমে যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়া;য় নিমপাতা, নিমফুল আয়ুর্বেদে পিত্তকে শান্ত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। বাবা বলে আমি নাকি নিমগাছের মতো সবার উপকার করতে ভালোবাসি।
আমাদের আমগাছে প্রচুর সুস্বাদু আম। দেখে মন ভরে যেত সুগন্ধে আর খেতে। মায়ের হাতে অন্যরকম আছে। অমৃত লাগে গাছের সব ফলগুলো।
স্যার – বাহ্ চমৎকার। তোমার মায়ের মতো সবাই যদি এইভাবে বৃক্ষ রোপন করতো! তাহলে আমাদের চারপাশে সৌন্দর্য ও শান্তির পরশ বিরাজ করতো। নিমের পেঁয়ারা গাছ ছিল খুব প্রিয়। পাকা, কাঁচা, পেঁয়ারা গাছের ডালে বসে রোজ খেতে বেশ ভালো লাগে নিমের। আর ফুলগাছগুলো নিম নিজ হাতে লাগিয়েছিল বেশ যতন করে। ভোর বেলায় সব গাছে জল ঢেলে যেন পরম শান্তি পায় সে। ফল, ফুল গাছ দেখে মুগ্ধ। মনে মনে স্রষ্টাকে এত সুন্দর পৃথিবী দেখার জন্য ধন্যবাদ জানাই।
ব্রেকফাস্ট শেষ করে বেরিয়েই গাড়ির অপেক্ষা। চট্টগ্রাম কলেজের পাশে সরকারি ইসকুল, অনেক সময় তানিশা, ঐশি, আরিয়া, চিশতী, আলিফা, ইসান, ইনু, আইয়ান সাথে থাকলে গল্প করতে করতে পথটা দ্রæত শেষ হয়ে যায়। ইসকুলের টাইম ঘড়ির কাটা ছুঁইছুঁই, অথচ কোথায় গাড়ি! কৌতুহলী চোখে তাকায়। নিম হাটাশুরু করলো।
মহসীন কলেজের পাশ দিয়ে একি! এ তো তার রাতে দেখা স্বপ্ন। চারপাশে তাকিয়ে বিহŸল হয়ে দাঁড়িয়ে। ডানে বাঁয়ে, সামনে তেমন কেউ নেই। পেছনে চকচকে লাল গাড়ি। চশমা পরা সুন্দর একটা ছেলে। বয়স তের-চৌদ্দ বছর হবে হয়তো। ধবধবে ফর্সা। দূর থেকেও পারপিউমের ঘ্রাণ নাকে আসে তার গায়ের। যেন মোহময় সুবাস। নিম হাটাশুরু করলো স্বপ্নের রাজ্যে। চারদিকে জনশুণ্য। মহসীন কলেজে চূঁড়া, সবুজ পাহাড়। খেঁজুর গাছের নিচে বসে আছে আবারও সেই ছেলেটি। নিম কিছুটা ভয় পেয়ে যায়। এমন সুন্দর ছেলে তো সে আর কোনদিন দেখেনি। জ্বিন, পরী হবে হয়তো।
গল্প বলার সময় মা বলতো জিন, পরীর ছেলে-মেয়েরা অনেক সুন্দর হয়। তারা মানবজাতি থেকে আলাদা। বিভিন্ন সময়ে তারা বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারে।
নিম বুঝতে পারে না রাতের স্বপ্নটাই ফিরে এসেছে! নাকি দিবাস্বপ্ন দেখছে সে! হুবহু এক।
কিছুক্ষণ পর ছেলেটির এতো, এতো প্রশ্ন। আরো কাছে এসে ইশারা ভাষায় কথা বলার মতো।
ভয়টা খানিকটা কেটেছে বৈকি? জানা গেল ছেলেটির নাম নির্জন। এভাবে একটা দিন শুরু হলো।
মনে হয় সে নিজেই একটা জ্ঞানের বাতিঘর আসলেই কি জিন-পরীর সন্তানরা রহস্যজ্ঞানী?
ইসকুলে তো অনেক বন্ধু -সবাই মিলে টিফিন ছুটিতে পাহাড়ের চূঁড়াতে খেঁজুর খেতে আসে। রোজ
কতজন বন্ধু যোগ হলো, বিয়োগ হলো, গুণ করতে গিয়ে ঘুণেধরা কোথাও কে? আগন্তুকের আঙুলের ইশারায় স্পষ্ট ইঙ্গিত। সে সব কথা ডায়রীর পাতায় একটু, একটু জমা, যতন করে রাখা ডায়রীর বুকে, কৈশােরিকা।
বুকে জমা সে উদাস দুপুরের গল্প। ভাবতে অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলে নিঃশব্দ হাসি।
জীবনটা ছোট হলেও ঘটে যাওয়া গল্পগুলো অনেক বড়। সেদিন নিম, রাউজানে গেলে মেহেদী প্রোগ্রামে রাতে সেখানে সবার সাথে আড্ডা আনন্দ গান হৈ চৈ করে এক সময় ঘুমিয়ে পরে।
স্বপ্নের রাজ্যে বগারবিলে চলে আসে নিম।
এত প্রশ্নেও নিরুত্তর ছেলেটা। নির্বিকার অবয়ব জটলায় উত্তেজনা অপেক্ষাকৃত ভেংচি কেটে খোঁচাতে শুরু করে। নিরুপায় পালাতে চাইলে -বৃত্তে আটকে যায় বারবার। নিস্তরঙ্গ লোকালয়ে তরঙ্গের বুদবুদ ওঠে।
ঝিমধরা অরণ্য।
যেমন করে এসেছে সে। চেনা নেই, জানা নেই তবুও এই লোকান্তরে। জিজ্ঞেস করলে অস্পষ্ট আঙুলের ডগায় মুখের উপর থেকে চুলের সৌন্দর্য কোথাও যেনো ভেংচি কাটে। ভোরের অন্ধকার ঝাপসা আলোতে মাথাটা কি গুলিয়ে গেল! হয়তো তাই নাকি ভোরের আগে একটানা ঘুম দিয়েছি। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন। স্বস্তির বাতাস ফিসফিস করে বলে তুমি এসেছো? এই প্রশ্নের কোনো উওর না দিয়ে ছেলেটি ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ।
হা হা, যা বলেছিস মানবসন্তান! তোমরা সত্যি জিনিয়াস।

ইসান, চিশতী, গলায় কপট ধমকের স্বর-
– শালা ন্যাকা। দুই ঘন্টা বিলম্বে চলছে বেটার হুশ নাই।
– ওহ হো, দোস্ত আমি তোমাদের বন্ধু হতে চাই।
পরিহাস করে ওঠে। ইনু সুর মিলায় ওদের সঙ্গে। ওদের কথার শেষটুকুর রেশ রয়ে যায় তার কানে।
নিঝর! নিঝর! চেঁচিয়ে ডাকে নিম। ইসকুলে যাওয়ার সময় প্রতিদিন তারা সবাই সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকতো। স্কুলে যাওয়ার পথে নিমের চোখে চিরচেনা সেই মুখ। যেন পটে আঁকা চিত্র।