নারীসহ প্রতারকচক্রের পাঁচ সদস্য গ্রেপ্তার

56

পুলিশ পরিচয়ে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে এক ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে জোরপূর্বক টাকা আদায়ের অভিযোগে দুই নারীসহ পাঁচ প্রতারককে করেছে পুলিশ। সংঘবদ্ধ চক্রের এই সদস্যরা গত পাঁচ বছর ধরে নগরীতে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে এধরনের অপরাধ করে আসছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তারা লোকজনকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে আপত্তিকর ছবি তুলে তা প্রকাশের হুমকি দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।
গত শুক্রবার বিকেলে নগরীর চশমা হিলের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালী থানা পুলিশ। এরা হল- মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম দিদার (৩৫), ফাতেমা ইয়াছমিন নিশি (২৮) ও বিথিত মাহমুদ মোস্তফা সিফা (২৩)
তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বায়েজিদ বোস্তামি এলাকা থেকে আনোয়ার হোসেন আনু (৪৪) ও পাহাড়তলী থেকে রাকিব আল ইমরানকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি-দক্ষিণ) শাহ মো. আব্দুর রউফ জানান, নগরীর স্টেশন রোডের নুপুর মার্কেটের দোকানি মো. ইমরান (৩২) গত ২ মার্চ রাত পৌনে ১০টার দিকে দোকান বন্ধ করে সিএনজি অটোরিকশায় করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। অটোরিকশা কাজীর দেউড়ির মোড়ে যাবার পর রাস্তায় দাঁড়ানো তিনজন সেটিকে থামার সংকেত দেয়। অটোরিকশা থামার পর তারা পুলিশ পরিচয় দিয়ে ইমরানকে নামিয়ে আনে। এরপর কোতোয়ালী থানায় নেওয়ার কথা বলে আরেকটি অটোরিকশায় তুলে চোখ বেঁধে নগরীর চশমাহিল এলাকায় একটি বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে নারীর সঙ্গে ও ইয়াবা দিয়ে আপত্তিকরভাবে তার ছবি তোলে সাংবাদিক পরিচয়ধারী একজন। সেই ছবি ফেসবুক ও ইউটিউবে আপলোডের ভয় দেখিয়ে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরে বিকাশের মাধ্যমে তিন দফায় ৫৫ হাজার টাকা আদায় করে ৩ মার্চ বিকেলে ছেড়ে দেয়।
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন বলেন, ‘ঘটনার ৬ দিন পর শুক্রবার দুপুরে ইমরান থানায় এসে মামলা দায়ের করেন। এরপরই আমরা আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযানে নামি। পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও কামরুল হাসান নামে একজন এখনও পলাতক আছে।’
ওসি বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পেরেছি- ইমরানকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়েছিল দিদার, কামরুল ও রাকিব। চশমা হিলের বাসায় আগে থেকে অবস্থান করছিল নিশি ও সিফা। একপর্যায়ে আসে আনোয়ারও। সিফাকে ইমরানের পাশে বসিয়ে আপত্তিকর ছবি তোলা হয়। এসময় ইমরান ছবি তুলতে না চাইলে আনোয়ার তাকে মারধর করে। পরে ইয়াবা দিয়েও ছবি তোলা হয়। কামরুল সাংবাদিক সেজে ছবি তোলে। নিশি সেই ছবি ফেসবুক ও ইউটিউবে আপলোডের ভয় দেখায়।’
ইমরানের কাছ থেকে প্রথম দফায় ১০ হাজার, দ্বিতীয় দফায় ১৫ হাজার এবং শেষ ধাপে আরও ৩০ হাজার টাকা আদায় করা হয় বলে জানান ওসি মোহাম্মদ মহসীন।
কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘কয়েকদিন আগে অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ফোনকলের মাধ্যমে ইমরানের সঙ্গে নিশি’র পরিচয় হয়। এরপর তাদের মধ্যে মাঝে মাঝে কথাবার্তা হোত। ঘটনার দিন ইমরান যখন দোকান থেকে বেরিয়ে অটোরিকশায় উঠে, তখন নিশির ফোন আসে এবং ইমরান তার গন্তব্যের বিস্তারিত নিশিকে জানান। এভাবে ইমরানকে বহনকারী অটোরিকশাটি টার্গেট করে অপহরণকারীরা। চশমা হিলের বাসায় নেওয়ার পর ইমরান প্রথম নিশিকে দেখেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরা একটি সংঘবদ্ধ চক্র। গত পাঁচ বছর ধরে এই ধরনের অপরাধ করে যাচ্ছে। এর আগে একবার পাহাড়তলী থানায় গ্রেপ্তার হয়েছিল এই চক্রের কয়েকজন। গত পাঁচ বছরে তারা কমপক্ষে ৫০টি অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রতিমাসে অন্তত একটি অপরাধ তারা করে। চক্রের মূল হোতা হচ্ছে দিদার ও নিশি। তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নেয় এবং ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে টাকা আদায় করে। বাস্তবে তারা স্বামী-স্ত্রী নয়। আর আনোয়ার এই অপরাধী চক্রের গডফাদার হিসেবে কাজ করে।’


বাসায় নিয়ে জিম্মি, আপত্তিকর ছবি তুলে টাকা আদায়
প্রেমের ফাঁদ : নারীসহ
৩০ জনের চক্র সক্রিয়
রতন কান্তি দেবাশীষ
প্রথমে প্রেমের ফাঁদ, তারপর নিয়ে যাবে বাসায়। এরপর চক্রের অন্য সদস্যদের সহায়তায় জিম্মি করে আপত্তিকর ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নেয় অর্থ। এ ধরনের একটি প্রতারকচক্র রয়েছে নগরীতে। তাদের সংখ্যা ৩০ জন। এদের মধ্যে রয়েছে ১০ জন নারী। চক্রটি গত ৫ বছরে শতাধিক ঘটনা ঘটিয়েছে। বিত্তশালীরাই টার্গেট তাদের। এ চক্রের ৫ সদস্য ধরা পড়েছে। পুলিশের কাছে তারা অপকর্ম স্বীকারও করেছে।
কোতোয়ালী থানা পুলিশ নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এ চক্রের ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হল, দিদারুল ইসলাম প্রকাশ দিদার (৩৫), ফাতেমা ইয়াছমিন নিশি (২৮), বিথিত মাহমুদ মোস্তাফা সিফা (২৩), আনোয়ার হোসেন আনু (৪৪) ও রাকিব আল ইমরান (২৬)। তাদের বাড়ি চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায়।
পুলিশ জানায়, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তাদের অবস্থান। স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া নিলেও প্রকৃতপক্ষে তারা স্বামী-স্ত্রী নয়। একই বাসায় তিন বা চার জন করে থাকে। কাছাকাছি স্থানে বাসা নেয় তারা।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বিত্তশালী লোকদের মোবাইল নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে পুরুষ সদস্যরা। ওই নম্বর নিয়ে মোবাইল ফোন, ইমো, ভাইবার, ওয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে যোগাযোগ স্থাপন করে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে নারী সদস্যরা। ফেসবুকেও যোগাযোগ করে নারী সদস্যরা। এভাবে টার্গেট করা ব্যক্তিকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে নারী সদস্যরা। এক পর্যায়ে বাসায় আসার আমন্ত্রণ জানায়। কেউ প্রলোভনে পড়ে বাসায় আসলেই পড়ে যায় বিপদে। এসময় প্রতারক চক্রের অন্য সদস্যরা এসে হাজির হয়ে যায়। তারা জোর করে নারীর সাথে আপত্তিকর ছবি তোলে। এছাড়া ভিডিও করে। এরপরই দাবি করে মোটা অংকের টাকা। না দিলে আপত্তিকর ছবি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখায়। উপায় না দেখে ওই ব্যক্তি চাহিদা মোতাবেক টাকা পরিশোধ করে ছাড়া পায়। পরবর্তীতে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে একই রকম ভয় দেখিয়ে বার বার টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। অহরহ এধরনের ঘটনা ঘটলেও সামাজিক সুনামের খাতিরে কেউ তা প্রকাশ করে না।
আবার অপহরণের মাধ্যমেও অর্থ আদায় করে চক্রটি। পূর্ব থেকে যোগাযোগ করা ব্যক্তিটির গতিবিধি সম্পর্কে জেনে নেয় নারী সদস্যরা। কোন পথে আসা যাওয়া করে, কয়টায় যাওয়া আসা করে এসব জেনে নেয় তারা। পরে তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুরুষ সদস্যরা টার্গেটকৃত ব্যক্তির গতিবিধি লক্ষ্য করে সুবিধাজনক জায়গা থেকে অপহরণ করে। পরে ওই ব্যক্তির সঙ্গে নারীদের অশ্লীল ছবি তুলে ওইসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করে।
সিএমপি’র উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এসএম মেহেদী হাসান বলেন, নগরে দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি চক্র নারীদের ব্যবহার করে ফাঁদ পেতে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল। এমন একটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কৌশল ছিল নারীদের দিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ী ও বিত্তশালী লোকদের প্রথমে প্রেমের ফাঁদে ফেলা এবং তারপরে বাসায় ডেকে এনে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ধারণ করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়া। ওই চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ জন ব্যক্তি লাখ লাখ টাকা হারিয়েছেন।
তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে নগরের বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে এ চক্রের সদস্যরা। তাদের বাসার ড্রইং রুমে হালকা আসবাবপত্র থাকলেও বাকি রুমগুলোতে কোনো কিছু থাকে না। ২/৩ মাস পর পর তারা বাসা পরিবর্তন করেন।
জানা যায়, এ চক্রের দলনেতা দিদারুল ইসলাম প্রকাশ দিদার। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলাও রয়েছে। নারীদের মধ্যে মূল ভূমিকা পালন করেছে নিশি। তাদের নির্দেশেই কার্যক্রম চলে।
কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে নগরে সক্রিয় রয়েছে। আগে কয়েকজন ধরাও পড়েছে। তারা লোকজনকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল। অনেকের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিলেও সামাজিক মর্যাদার ভয়ে অভিযোগ করেনি কেউ। তিনি বলেন, চক্রের অন্য সদস্যদেরও চিহ্নিত করতে পেরেছি আমরা। তারাও ধরা পড়বে।
পুলিশ জানায়, এক জায়গায় বেশিদিন বাসা রাখে না তারা। এক বা দুটি ঘটনা ঘটানোর পরই বাসা বদল করে।