নারীর মেধাশক্তি ও প্রতিভা বিকাশে সমাজের দায়বদ্ধতা

21

পারভীন আকতার

‘মা’ কথাটি অতি ছোট্ট কিন্তু তার ব্যাপ্তি আকাশসম। মায়ের কারণেই এ জগত সংসারে পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্র তৈরি হয়, মানুষ পাশে পায় আরেক সৃষ্টিসেরা জীব মানুষকে। এই মানুষ জন্ম দেয়ার মতো নিদারুণ কষ্টের কাজটি মায়েরা সন্তান গর্ভে নয় মাস বা তারো বেশি রাখেন। এ যেন বৃক্ষ ফেটে নতুন বৃক্ষ বের হওয়ার মতো কাজ! আর এই দুর্সাধ্য কাজটি করেন নারী, একমাত্র মা-ই। সুখে দুঃখে জন্ম দেয়া মায়েদের সন্তানরাই একদিন রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়। পৃথিবীতে মা-ই হলো অনন্য শক্তির আধার। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি একজন মায়ের অদৃশ্য হাজারো হাত আছে যা দিয়ে তিনি সংসারের নানা কাজ,জটিল সমস্যা সমাধান,চাকরী কিংবা সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কাজ একসাথে সামাল দেন যা অন্যজনের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়।
নেপোলিয়ন বানোপার্ট বলেছেন, ‘আমাকে তোমরা শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি দেব।’ তাঁর কথাটির গভীরতায় গেলে আমরা বুঝতে সক্ষম হই যে, দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় বড় বড় কর্মযজ্ঞে নারীর প্রেরণা, উৎসাহ আর সন্তানকে স্বশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল ও সুশাসনে বড় করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে কতখানি শ্রমের মহত্ত্ব রয়েছে।এবং যিনি এসব করেন তিনি অবশ্যই একজন সফল নারী। বলতে কোন দ্বিধা নেই পুরুষ নারীকে এগিয়ে দিতে সহায়তা করে বলেই নারীরা আজ স্বীয় চেষ্টায় যোগ্য উত্তরসূরী তৈরি করতে পারছে।
কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী আর অর্ধেক তার নর।’ কবি সাহিত্যিকরা সব সময়ই নারীর জয়গান গেয়েছেন। নারীর সৌন্দর্যে ও কর্মে কবিতার ভাব হয়ে ওঠে অতুলনীয়। যুগে যুগে মনিষীগণও নারীর আশ্চর্যরকম শক্তির আরাধনা করেছেন। জ্ঞান বিজ্ঞানেও নারীর অবদান অনস্বীকার্য। সেবায়ও পরম ব্রত নারী যেমন মাদার তেরেসা ও ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলসহ প্রমুখ। দেশ শাসনেও বর্তমানে নারীরা সফল ও অকুতোভয় সংগ্রামী। বিশিষ্ট সুফী আউলিয়া বায়োজিদ বোস্তামি (রা.) মায়ের দোয়ার বরকতে আজ বিশ্ব বিখ্যাত। যাঁর পবিত্র মাজার শরীফ দেখতে চট্টগ্রামে আসে হাজারো দেশী বিদেশী পর্যটক ও দর্শনার্থী। টমাস আলভা এডিসনকে তার স্কুলের শিক্ষকগণ একটি তিরস্কারমূলক চিঠি দিয়ে তাঁর মাকেই অপমান করেছিল। কিন্তু সেই মা ছেলেকে উল্টো উৎসাহ উদ্দীপনা দিয়ে একজন বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী তৈরি করতে সহায়তা করেছিলেন। হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রা.) মায়ের আদেশ মেনে মিথ্যা না বলায় ডাকাত দলকে নিপাট ভদ্রলোকে পরিণত করেছিলেন। একজন নারী মা হয়ে কত যে শক্তি রাখেন তা বলা বাহুল্য।
নারীর ত্যাগ স্বীকার দেখার মতো। কিন্তু তা অনেকেই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের চোখে দেখে। একজন নারীর কর্মঘণ্টা হিসাবে সংসারে যা কাজকর্ম, দেখভাল করেন তার যদি বেতন ধরা হতো তাহলে মাসে কত বেতন দিতে হতো তা বলা বাহুল্য। তবুও বেশিরভাগ নারীরা সংসারের সুখের জন্য নিজের সমস্ত সখ আহ্লাদ নিমেষে বিসর্জন দিতে পারে। কিন্তু দিন শেষে দেখা যায় সেই নারীকেই শত শত আঘাত সইতে হয়,কটু কথা ও অপমানিত হতে হয়। জীবন তখন নারীর দূর্বিষহ হয়ে পড়ে। আশেপাশের পরিবেশ তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। পরিবার,সমাজ তথা রাষ্ট্র নারীর কর্মে,সেবায় উন্নতির জয়জয়কার করবে অথচ তার সফলতা, শান্তি শূন্যের কোটায় থাকবে কেন?
একজন পুরুষ চাকরী করলে সংসারে, সমাজে যে সম্মান পায় কিন্তু একজন নারী তা এখনো পান না। অনেকেই নারীদের চাকরী করাটা অপরাধও মনে করে। অথচ বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতি, প্রশাসন, নীতি পরিকল্পনা, চাকরী ইত্যাদিতে নারী দারুণ সাফল্য অর্জন করছে যার প্রমাণ আমাদের দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি চেষ্টা করে চলেছেন বলেই দেশ আজ অনেকটাই এগিয়ে। সবাই যদি তাঁর মতো দেশকে ভালোবাসতো,নিজের কর্তব্যটা বুঝত তাহলে এ দেশে একত্রিত সততার শক্তি বিশাল উন্নয়নের জোয়ার বয়ে দিত যেমন স্বল্প সময়ে মালয়েশিয়া স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে। জ্ঞানের অবারিত দ্বার কিন্তু একজন নারী। একজন নারী যখন অফিসে যান তখন দক্ষতার সাথে তার পুরো মেধা প্রয়োগ করে সঠিকভাবে শ্রম দিয়ে কাজটি সম্পন্ন করেন। আবার ঘরের কাজকর্ম যত আছে সবকিছুই একদম পরিপাটি ও গুছানো তার। নারীরা পারে না এমন কোন কাজ এখন নেই বললেই চলে এখন। নারীরা এখন যথেষ্ট আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য চেষ্টা করে। তারা এখন রাইড শেয়ারিং ,ব্যবসা, উদ্যোক্তা, ফ্যাশন ডিজাইনার, ভ্লগার, লেখক, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং সরকারী বেসরকারি নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন আছেন। প্রত্যুষে ঘরের সমস্ত কাজ সামলে দৌড়াতে দৌড়াতে গাড়ি ধরে অফিসে যাওয়া মানুষটিই একজন নারী।
নারীর শক্তি, প্রতিভা ও মেধা প্রয়োগের সুযোগটি করে দিন। নারী বলে অবহেলা করে তার প্রতিভাকে নষ্ট করার কোন অধিকার কারো নেই। পুরুষের যেমন জন্মগতভাবে বেঁচে থাকার কিছু মৌলিক অধিকার আছে তেমনি নারীরও সমান অধিকার আছে। হিংসে বিদ্বেষ, লিঙ্গ বৈষম্য ভুলে পুরুষ মহিলা পরস্পর শ্রদ্ধায় সব জায়গায় সহঅবস্থান সম্মানে হলে পুরো পৃথিবীর চিত্র পাল্টে যাবে। আর আমাদের দেখতে হবে না মাত্র আট বছরের মেয়ে শিশু কোন বিকৃত রুচির পুরুষ দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছে, পথে একলা হেঁটে গেলে নারীকে ছেলেরা ইভটিজিং করছে। নারীর নিরাপত্তা বিধান সর্বময় সকলেরই দায়িত্ব। বিশ্বের প্রতিটি ঘরেই নারী আছে। নারীদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে সুশৃঙ্খল ও সুশাসনে মানুষ করাও প্রত্যেক বাবা মা,পরিবার,সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এর সাথে আমাদের নারীদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধার পুরো হকদার করতে হবে। যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে নিজেদের নারীদের। আগেকার দিনের তুলনায় বর্তমান আধুনিক সভ্যতা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি অনেক উন্নত। সমাজে খারাপ ও ভাল দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির লোক বসবাস করে। কিন্তু ইতিবাচক চিন্তার মানুষ তৈরি করতে হবে আমাদের। এজন্য দরকার মানুষকে ভালো মন্দের তফাৎ বুঝানো। কীসে আমাদের উন্নতি ও লাভবান হবো ও মান মর্যাদা বাড়বে তা বুঝাতে হবে স্যোসাল মিডিয়া, টিভি, রেডিও, বিভিন্ন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। ধর্মীয় মূল্যবোধ সমাজে তৈরি করতে হবে। নারীকে পণ্য নয় বরং সমাজের ভালো কাজে লাগাতে হবে। সমাজের প্রতিটি ঘরেই মা বোন, স্ত্রী জাতির সাথে নিয়েই বসবাস করতে হয় আমাদের। কিন্তু তাদের প্রতিভা ও প্রজ্ঞা শক্তির অবমূল্যায়ন অবমাননা করবে কেন সমাজ? বর্তমান কি সেই যুগ আছে যে আজেবাজে চিন্তা করে সময় নষ্ট করে পৃথিবীর অন্য দেশ থেকে আমরা নিজেদের পিছিয়ে নেব? ক্ষুদ্র কথাকে উপলক্ষ্য করে আসল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি হওয়ার সুযোগ এখন আর নেই। আমাদের লক্ষ্য দেশ গড়া,কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উন্নতির শিখরে পৌঁছা। সন্তানদের সঠিকভাবে মানুষের মতো মানুষ করা। তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে সহায়তা করা। সর্বোপুরি একটি সর্বোত্তম জাতি গঠনে সচেষ্ট হওয়া। এজন্য সমাজের নারীকে উজ্জীবিত রাখার দায় আছে বৈকি।
নারীর যথাযথ সম্মান,অধিকার ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দিতে সমাজের প্রত্যেক শ্রেণির মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। এ না হলে প্রতিদিন দেবীর আরাধনা করা অনর্থক, হাজারো মহীয়সী নারীর জীবনীগ্রন্থ পাঠ করে সময় নষ্ট ব্যতীত আর কিছুই নয়। যেখানে মা শক্তির আধার হয় সেখানে নারী কত রূপে, নানা সম্পর্কে আমাদের সামনে হাজির হয়ে সমাজের নানামুখী কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত থাকে তা আমরা চাক্ষুষ দেখছি এবং সেবা নিচ্ছি। নারীর প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন ও শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠায় সকলের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। আসুন আমরা নারী শক্তি যথাযথ কাজে লাগাই ও সম্মান দিই; নারীদের সত্যিকারের সহযোদ্ধা করে সেইভাবেই তাঁদের প্রতিভা ও মেধাকে মূল্যায়ন করি।
লেখক : শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক