নাগরিক সচেতনতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি

2

শীতের আমেজ শুরুর আগেই বায়ুদূষণে চট্টগ্রামের বাতাস ভারি হয়ে ওঠছে। সাধরণত ঢাকা বায়ুদূষণে শীর্ষে থাকলেও চট্টগ্রামও সম্প্রতি বায়ুদূষণের মাত্রা ভযাবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে নগরীর বন্দর, শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকা নাসিরাবাদ, বায়েজিদ, কালুরঘাট, মাঝিরঘাট, সদরঘাট, কর্ণফুলি লিংরোড, আগ্রাবাদ, বন্দর, সিইপিজেডসহ বিভিন্ন এলাকায় দূষণমাত্র বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। বুধবার দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, দৈনিক এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) এর মতে, নভেম্বর মাসের প্রথম ১০ দিনের ৬ দিনই খুবই অস্বাস্থ্যকর ছিল চট্টগ্রামের বায়ু। এরমধ্যে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সবচেয়ে খারাপ ছিল চট্টগ্রামের বায়ু। এ দুইদিন বায়ুদূষণের ভয়াবহ এতো বেশি ছিল যে, মানুষের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়েছে।
বলার অপেক্ষা নেই যে, শিল্পনগরী হিসেবে দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এখানে বেড়েছে কলকারখানা, যানবাহন, বন্দর কার্যক্রম ও নির্মাণকাজ যেগুলোই এখন শহরের বাতাসে বিষাক্ত বায়ু ছড়িয়ে দিচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বায়ুর মান এখন অনেক ক্ষেত্রেই অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান সড়কগুলোয় ট্রাক, কন্টেইনার লরি, বাস ও গাড়ির ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে বাতাসে। তার ওপর নির্মাণাধীন ভবনগুলোর ধুলাবালি, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি এবং মাজিরঘাট ও বন্দর এলাকায় বড় বড় লরি, কার্গো, ক্রেন ও জাহাজের কার্যক্রম বায়ুর মানকে আরও খারাপ করছে। ফলে শহরের সাধারণ মানুষ প্রতিদিন অজান্তেই বিষাক্ত বায়ু গ্রহণ করছে। ভয়াবহ এ বায়ুদূষণে নগরবাসীর জীবন অনেকটা বিপন্ন হওয়ার উপক্রম। নানা রকম জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে জীবন ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে অনেককে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, চট্টগ্রামের বাতাসে ধুলিকণা ও ক্ষতিকর গ্যাসের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চর্মরোগ ও ফুসফুসের জটিলতা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক মানুষরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রুহুল ফুরকান সিদ্দিক একটি জাতীয় দৈনিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বাংলাদেশের ফুসফুস সুন্দরবন ও ভাওয়াল গড় যক্ষা আক্রান্ত। ফলে দূষিত বায়ু বিশুদ্ধ করার সক্ষমতা দেশের নেই। বাড়ছে দেশে অসংক্রামক রোগ। বায়ুদূষণের কারণে হাসপাতালগুলোতে ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), ক্রনিক অ্যাজমা, ক্রনিক ব্রংকাইটিস রোগীর আধিক্য। তিনি বলেন, এ ছাড়া শহুরে এলাকা ও শিল্পাঞ্চলগুলোর দূষিত বায়ু থেকে ভারী ধাতু মানবদেহে প্রবেশ করে কিডনি, ক্যান্সার, লিভারের জটিল রোগ সৃষ্টি করছে। কিন্তু সরকারের এ বিষয়ে কোনো ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন শহরজুড়ে প্রায় ২,২০০ থেকে ২,৪০০ টন গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। তবে শিল্পকারখানার বর্জ্য এখনো নদীতে ফেলা হচ্ছে, যা সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি আরও বলেন, অনেক নাগরিক নিজেরাও বর্জ্য খাল কিংবা ড্রেনে ফেলে দিচ্ছেন ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ও বর্জ্য থেকে বিষাক্ত পদার্থ বায়ুতে মিশে বায়ুদূষণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। শতভাগ বর্জ্য সংগ্রহ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য করপোরেশন ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে পরিবেশে বায়ুদূষণ ও পানিদূষণ কমাতে নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে। নগরবাসী হিসেবে নিজেদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, চট্টগ্রামের এই দূষণ শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে না বরং প্রভাব ফেলছে সামগ্রিক পরিবেশে। গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ধুলা ও ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে আকাশ, সূর্যের আলো কম প্রবেশ করছে এবং তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছে। দূষণের কারণে চট্টগ্রামবাসীর গড় আয়ু কমেছে প্রায় ছয় বছর, শিশু ও বয়স্করা রয়েছেন অকালমৃত্যুর ঝুঁকিতে।
আশার কথা হলো, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তর এখন বায়ুদূষণ কমাতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। রাস্তাঘাটে নিয়মিত পানি ছিটানো, পুরোনো গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষা, শিল্পকারখানায় নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রবর্তন এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন আনতে হলে দরকার নাগরিক সচেতনতা, সবুজায়ন বৃদ্ধি, এবং পরিবেশবান্ধব নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা। আমরা মনে করি, বায়ুর বিষাক্ততা ও পরিবেশ দূষণের ভয়াবহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা সিটি কর্পোরেশনের একক উদ্যোগে কোন কার্যকর ফল পাওয়া যাবেনা, এক্ষেত্রে নগরীর সেবা সংস্থাগুলোকেও সমন্বয় করতে হবে। একইসাথে পরিবেশ আইনের কঠোর পয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। চট্টগ্রামে পাহাড়কাটার যে উৎসব তা চূড়ান্তভাবে বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রশাসন আরো কার্যকর ভূমিকা রাখবে-এমনটি প্রত্যাশা নগরবাসীর।