নগরীতে ৪ ঘণ্টা সড়ক অবরোধ শিক্ষার্থীদের

11

নিজস্ব প্রতিবেদক

নগরের সিডিএ এভিনিউ’র ষোলশহর দুই নম্বর গেইট ও জিইসি এলাকায় কোটাবিরোধী আন্দোলনের কারণে চার ঘণ্টা ধরে যান চলাচল বন্ধ ছিল। গতকাল রবিবার বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা ১০ মিনিট পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা এসব সড়কে অবস্থান নিয়ে মিছিল-মিটিং ও বিক্ষোভ করেন। রাত ৮ টার পর আন্দোলন শেষ করে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে শুরু করলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হতে থাকে। এর আগে সৃষ্ট যানজট দুই নম্বর গেইট থেকে চমেক হাসপাতাল, মুরাদপুর, বায়েজিদ সড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়ে। গুরুত্বপ‚র্ণ এই মোড়ের চার সড়কে দীর্ঘ যানজটে শত-শত যাত্রীবাহী গাড়ি আটকা পড়ে। বাধ্য হয়ে অনেককে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।
গতকাল রবিবার নগরীর ষোলশহর এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে, আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থী, পথচারী, যাত্রীদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
গতকাল রবিবার দুপুর আড়াইটা থেকে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি পুনর্বহালের প্রতিবাদে দুই নম্বর গেইট এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে। প্রথমদিকে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা কম হলেও বিকেল চারটার দিকে হাজারো শিক্ষার্থী জড়ো হয় সেখানে। এতে ব্যস্ততম সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সরকারী হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজের শিক্ষার্থী ছায়েদ বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিলো সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সরকারি চাকরিতে কোটার ফলে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা মেধা থাকার পরও যোগ্য চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মূলত আমরা বৈষম্যমূলক কোটা প্রত্যাহার করার জন্য এই আন্দোলন করে যাচ্ছি।’
এসময় সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীদের ‘সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’, ‘মেধা না কোটা? মেধা-মেধা’, ‘মেধাবীদের কান্না, আর না, আর না’, কোটার বিরুদ্ধে-লড়াই হবে একসাথে’- ইত্যাদি স্লোগান দিতে দেখা যায়। অনেকের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুনও।
লালখান বাজার থেকে বহদ্দারহাটের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন মো. ফরিদুল আলম। তিনি দুই নম্বর গেইটে গিয়ে আটকা পড়েন। বাসের অন্য যাত্রীরা পায়ে হেঁটে রওনা দিলেও ফরিদ এক জায়গায় বসে ছিলেন দীর্ঘক্ষণ। তিনি পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমার পায়ে ব্যাথা। ডাক্তার দেখানোর উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। কিন্তু এখানে আন্দোলন চলায় আমি পায়ে হেঁটে যেতে পারছি না। তাই বসে পড়লাম। আন্দোলন শেষ হলে পুনরায় গাড়ি করে রওনা দিবো’।
হিউম্যান হলার চালক রাকিব বলেন, ‘আন্দোলনের কারণে তিন ঘণ্টা ধরে বসে আছি। আজকে রথযাত্রার জন্য সকাল থেকেই যাত্রী কম ছিল। এখন আন্দোলনের কারণে এখানে তিন ঘণ্টা ধরে আটকে আছি। আমাদের কী সংসার নেই, পেট নাই? তাছাড়া দিন শেষে গাড়ির মালিক কে ইনকামের টাকা কেমনে দিবো? নিজে চলবো কেমনে, কোম্পানিকে (গাড়ির মালিক) কী দিবো?
সিএনজি অটোরিকশাচালক মো. সাগর বলেন, ‘যানবাহনের উপর কিছু মানুষের পেট নির্ভর করে। যারা আন্দোলন করছে তাদের ভাবা উচিত, আমাদের মত চালক-শ্রমিকদের বেতন কে দেবে? আমাদেরও তো অধিকার আছে রাস্তায় গাড়ি চালানোর’।
পাঁচলাইশ এলাকার ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (টিআই) মো. মাসুদুর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, ‘বিকেল চারটা থেকে আন্দোলনকারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে রাত আটটা পর্যন্ত আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা। পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। এখন (রাত ৮টা ৩৭ মিনিট) রাস্তা পুরোটাই স্বাভাবিক। কোনো যানজট নেই।
পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সন্তোষ কুমার চাকমা বলেন, ‘আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেছেন। ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। কোনো ঝামেলা হয়নি।’
এর আগে শনিবার বিকেল সাড়ে চারটা থেকে একই এলাকায় সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে মিছিল নিয়ে সড়কে অবস্থান নেয় তারা। ফলে দেড় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে।
প্রসঙ্গত, কোটা ব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে গত পাঁচদিন ধরে টানা আন্দোলন করে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে দু’দিন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলন করলেও নগরে এর প্রভাব ছিল না। কিন্তু শুক্রবার থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে নগরীর দুই নম্বর গেইট ও ষোলশহর এলাকায়। এ আন্দোলনে তারা চার দফা দাবি জানিয়ে আসছে।
দাবিগুলো হলো- ২০১৮ সালে ঘোষিত সরকারি চাকুরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিপত্র বহাল রাখা, ২০১৮ এর পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি চাকুরিতে (সব গ্রেডে) অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দেয়া, এবং সংবিধান অনুযায়ী কেবল অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে; সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহারের সুযোগ না রাখা এবং কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দেয়া, দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া।