খালেদ মনছুর, আনোয়ারা
আনোয়ারায় আমন ফলন কৃষকের প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে। অতিবৃষ্টি আর বৈরি আবহাওয়ার পরও আমনের বাম্পার ফলনে বেজায় খুশি কৃষকরা। এ বছর ৭ হাজার পাঁচশ সাতান্ন হেক্টর জমিতে আমন চাষাবাদ হয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে বেশি। এবার ব্রি-৪৯ ও ব্রি-১০৩ জাতের ধানে বাজিমাত করেছে কৃষকরা। উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনায় এবার আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানা গেছে। উপজেলাজুড়ে মাঠগুলো এখন পাকা ধানের গন্ধে মাতোয়ারা। ধানে ধানে ভরে ওঠা এই মাঠ দেখে প্রান্তিক কৃষকের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। অগ্রহায়ণ মাসের শুরু থেকেই উপজেলাজুড়ে শুরু হয়েছে আমন ধান কাটার মহোৎসব। নতুন ধানের আগমনে প্রতিটি কৃষক পরিবারে লেগেছে উৎসবের আমেজ।
সরেজমিনে আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ, বটতলী, বারশত, বারখাইন, বরুমচড়া, চাতরী ও পড়ৈকোড়াসহ বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, এক কর্মচাঞ্চল্যকর দৃশ্য। কৃষাণ-কৃষাণীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ ধান কেটে আঁটি বাঁধছেন, কেউ সেই আঁটি মাথায় বা গাড়িতে করে বাড়ির উঠানে নিয়ে যাচ্ছেন। মাঠের পাশেই তৈরি করা হয়েছে ধানের খলা, যেখানে চলছে মাড়াইয়ের কাজ। বাতাসে ভাসছে পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ, আর কৃষকের আঙিনায় চলছে সোনালি ফসল ঘরে তোলার ধুম।
কর্ণফুলী টানেলের পাশের বেলচূড়া বিলে দেখা যায়, এক কৃষক মনের আনন্দে পাকা ধান কাটছেন। তার ১২ বছরের মেয়ে তাকে সাহায্য করছে। মাথায় ধানের আঁটি বহন করে নিয়ে যাচ্ছে বাড়ি। অনেকে ধান কাটার সাথে সাথে একই জমিতে অন্যান্য সবজি মরিচ, টমেটো, বেগুন, বিভিন্ন রকমের সবজি চাষ করছেন। বাড়ির পাশে বিল হওয়ায় কৃষকদের সাহায্য করছেন কৃষাণীরা।
গুয়াপঞ্চক গ্রামের কৃষক আব্দুল করিমের কণ্ঠেও শোনা গেল সন্তুষ্টির সুর। ফলন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আল্লাহর রহমতে এবার ধানের আবাদ বেশ ভালো হয়েছে। তবে কামলার (শ্রমিক) দামটা একটু বেশি হওয়ায় খরচ কিছুটা বেড়েছে। একই সুরে কথা বলেন বরুমচড়া এলাকার কৃষক মনির আহমদ। তবে তার কণ্ঠে ছিল ধানের ন্যায্যমূল্য নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ। তিনি বলেন, আমরা অনেক কষ্ট করে ফসল ফলাই, কিন্তু বাজারে যথাযথ দাম পাই না। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, যেন সরকারিভাবে ন্যায্যমূল্যে ধান ক্রয় করা হয়। তাহলে আমরা কৃষিকাজে আরও উৎসাহ পাব। অন্যথায় দিন দিন এই পেশা থেকে কৃষকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
আনোয়ারা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার বৈরি আবহাওয়ার কারণে ফসলের যেটুকু ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল, তা বাস্তবে খুবই সামান্য। বরং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ফলন পাওয়া যাবে বলে তারা আশাবাদী।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, উপজেলায় এবার ৭ হাজার পাঁচশ সাতান্ন হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে ব্রি-৪৯ ও ব্রি-১০৩ জাতের ধানের ফলন এবার বেশি হয়েছে।
আনোয়ারা কৃষি অধিদপ্তরের উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সরওয়ার আলম জানান, ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। তবে বোরো মৌসুমের ক্ষেত্রে আনোয়ারার কৃষকরা কিছুটা দেরিতে রোপণ শুরু করেন। তাই আমাদের পরামর্শ থাকবে, বোরো চাষের জন্য যেন তারা একটু আগাম প্রস্তুতি নেন এবং রোপণ শুরু করেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামীম আহমদ সরকার বলেন, আনোয়ারার কৃষকদের চাষাবাদে যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে এবং আমনের ফলনও আশানুরূপ হয়েছে। আমরা সরকারিভাবে কৃষকদের যথাসম্ভব উৎসাহিত করছি এবং প্রণোদনার প্যাকেজগুলো তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছি। তিনি আরও জানান, শুষ্ক মৌসুমের জন্য সরিষা, ভুট্টা, চিনাবাদামসহ বিভিন্ন সবজি বীজ আনোয়ারার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। কৃষকরা যেন সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারেন, সে জন্য কৃষি বিভাগ প্রতিনিয়ত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।











