দুঃস্বপ্নের দিন শেষে ঘরে ফিরলেন ২৩ নাবিক

2

নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘ দুই মাসের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষার প্রহর শেষে দেশে ফিরেছেন সোমালি জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্ত হওয়া ‘এমভি আবদুল্লাহ’র সেই ২৩ নাবিক। গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৪ টায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) এক নম্বর জেটিতে নাবিকদের বহন করা জাহাজ ‘এমভি জাহান মনি-৩’ পৌঁছানোর পর ২৩ নাবিকদের অভ্যর্থনা জানায় বন্দর কর্তৃপক্ষ।
গতকাল বিকাল ৪টায় চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি-১ জেটিতে এসে পৌঁছলে নাবিকরা অপেক্ষমাণ স্বজনদের দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নাবিক-স্বজন সবার চোখে ছিল পানি, মুখে ছিল হাসি। এ সময় সবাই মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানান।
এ সময় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, এমভি আবদুল্লাহ জলসদ্যুদের কবলে পড়ার পর থেকে প্রতি মুহূর্তে আমরা খবর রাখছিলাম। বিভিন্ন নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বল প্রয়োগের কথা বলেছিল। হয়ত সেটা আমরা করতে পারতাম। কিন্তু সবাই এতে অক্ষত থাকত কি?
আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া, নাবিকরা সবাই সুস্থভাবে দেশে ফিরেছেন। তবে ভবিষ্যতে যাতে বাংলাদেশের কোনো জাহাজ আর জলদস্যুর কবলে না পড়ে, সে জন্য জাহাজ মালিকদের সজাগ থাকতে হবে। যেসব জায়গা ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে আর্মড গার্ড থাকতে হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মালিক কর্তৃপক্ষের অসীম ধৈর্য ছিল। তারা লক্ষ্য রেখেছিল, লোকক্ষয় যাতে না হয়। এজন্য সবাইকে অভিনন্দন। একই সঙ্গে সাহসের জন্য নাবিকদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
হাছান মাহমুদ আরও বলেন, আপনাদের সেখানে ঈদের নামাজ আদায় করতে দেখে আমাদের খুব শান্তি লেগেছে। সবাই উদ্বেগে ছিল। সব কিছু সুন্দরভাবে হয়েছে। নাবিকদের সুস্থতা, কর্মজীবনে সফলতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, আমাদের দেশের সন্তানরা সুস্থভাবে দেশে ফিরে এসেছে এজন্য শুকরিয়া জানাই। দুই মাস সবাই উৎকণ্ঠায় ছিল। সরকারের সাহসিকতা, দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও দক্ষতার কারণে নাবিকরা সুস্থভাবে ফিরে এসেছেন। একঝাঁক পায়রা যেন জীবনে ফিরেছে। আমি উচ্ছ¡সিত, আনন্দিত ও খুশি। সবার সুস্থতা কামনা করি।
চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল বলেন, জলদস্যুরা অত্যন্ত দুর্ধর্ষ হয়। সোমালিয়ার জলদস্যুরা খুব ভয়ানক। আমাদের নাবিকরা অকুতোভয়। সরকারের পক্ষ থেকে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পররাষ্ট্র ও নৌ মন্ত্রণালয়, নৌ বাহিনী ও অন্য সংস্থাগুলো একসাথে কাজ করেছে। এর ফলে এই সফলতা।
এসময় কবির গ্রুপের ডিএমডি শাহরিয়ার জাহান রাহাত বলেন, যখন আন্তর্জাতিক যুদ্ধজাহাজ হুমকি দিচ্ছিল, তারা জাহাজ ডুবিয়ে দেবে। জলদস্যুদের সারেন্ডার করতে বলছিল। সাথে সাথে আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও নৌপরিবহন মন্ত্রীকে বিষয়টি জানাই। এর ২০ মিনিটের মধ্যে উনাদের কাছ থেকে সাড়া পাই। নাবিকরা যে ফিরেছেন, এটা বাংলাদেশের জয়। নাবিকদের মধ্যে দুই জনের এই সময়ে সন্তান জন্মলাভ করেছে। কিন্তু তারা দুবাই থেকে আগেভাগে ফেরেননি। জাহাজের সাথেই তারা আজ দেশে এসেছেন। আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও নৌপরিবহন মন্ত্রীকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাই।
এর আগে গত ১২ মার্চ দুপুর ১২টার দিকে এমভি আবদুল্লাহ জাহাজটি ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবলে পড়ে। জাহাজটি কয়লা নিয়ে আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকের মাপুতো বন্দর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল হামরিয়া বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। পথে জাহাজটি সহ ২৩ নাবিককে জিম্মি করে জলদস্যুরা।
এরপর নানান ক‚টনীতিক আলোচনা শেষে মুক্তিপণ পরিশোধের পর গত ১৩ এপ্রিল জিম্মিদশা থেকে মুক্তি মেলে জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর। তারপর জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল হামরিয়া বন্দরের পথে রওনা দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুটি যুদ্ধজাহাজ এমভি আবদুল্লাহকে জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রিত উপক‚ল থেকে সোমালিয়ার সীমানা পার করে দেয়।
গত ২১ এপ্রিল জাহাজটি আল হামরিয়া বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছে। পরদিন সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় নোঙর করে জেটিতে। সেখানে ৫৫ হাজার মেট্রিক টন কয়লা খালাসের পর ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় সেটি চুনাপাথর বোঝাই করার জন্য মিনা সাকার বন্দরে যায়। শেষে আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর থেকে জ্বালানি নিয়ে ৩০ এপ্রিল দেশের পথে পাড়ি দিতে শুরু করে এমভি আব্দুল্লাহ। অবশেষে গত ১৩ মে দুপুরে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় কক্সবাজারে পৌঁছে জাহাজটি। সন্ধ্যা ৬টা দিকে জাহাজটি কুতুবদিয়ায় নোঙর ফেলে। লাইটারেজ জাহাজে চড়ে নতুন নাবিকদের একটি দল জাহাজটির দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পরদিন গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন মুক্ত ২৩ নাবিক। বিকাল ৪টার দিকে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে পৌঁছালে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানায় বন্দর কর্তৃপক্ষ।