দম্ভের হার

3

জসিম উদ্দিন মনছুরি

উনাকে সবাই নব্য ফেরাউন হিসেবেই চিনে। দম্ভের কারণে ফেরাউন ঈশ্বরের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে নিজেকে ঈশ্বর দাবি করে বসেছিলো।কী দুর্দন্ড প্রতাপে সে রাজত্ব করেছিলো মিশরের বুকে। যুগে যুগে ফেরাউনের উত্তরসূরী হয়ে আসে কত চেঙ্গিস খান। পৃথিবীতে কত স্বৈরাচারের আবির্ভাব হয়েছে। আবার তাদের পতন হয়েছে নির্মমভাবে। লাতু মিয়ার মনে পড়ে গেলো পৃথিবীর সেই সব স্বৈরাচারীর কিচ্ছা-কাহিনিগুলি। তিনি ভাবনার রাজ্যে নিমগ্ন হলেন। ফেরাউন থেকে মুক্তির জন্য মহান আল্লাহ মুসা নবীকে পাঠিয়েছিলেন। মুসার বদৌলতে বনি ইসরাইলের ফেরাউন থেকে মুক্তি মেলে। এসব ভাবতে ভাবতে তিনি ভাবনার অতল সাগরে নিমজ্জিত হলেন। মনের অজান্তে বলে উঠলেন, হে প্রভু আমাদের কি মুক্তি দেওয়ার কেউ নেই? হে ঈশ্বর, তুমি আমাদের মুক্ত করো। আমরা মুক্তি চাই। আমাদেরকে মুসার উত্তরসূরী দাও। জবরের ডাকে সম্বিত ফিরে ফেলেন লাতু মিয়া।
জবর : লাতু কি করছিস? চমকে উঠলেন লাতু মিয়া।দীর্ঘাশ্বাস ফেলে লাতু মিয়া বললেন, কি আর করা। উনার উপর যদি খোদার লানত হইতো। তইলে বাঁচতাম। এই জুলুম-নির্যাতন আর সহ্য হয় না। গতকাল গভীর রাতে সবুরের ছেলে করিমকে কারা যেন নিয়ে গেছে। সব জায়গায় খোঁজা হয়েছে। কোনখানে তার হদিস নেই। শুনেছি থানায় জিডিও করা হয়েছে। কারা নিয়ে গেছে এখন পর্যন্ত কেউ বলতে পারছে না। কোথায় আছে? কি করছে? আল্লাহই ভালো মালুম। সবুরের বউ বিলাপ করতে করতে আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলে-আমাদের কি অপরাধ ছিলো? কেন এমন শাস্তি দিচ্ছো? আমার ছেলেরে ফিরায়ে দাও। প্রয়োজনে আমার জান নিয়ে নাও। হে আল্লাহ, তুমি উনার বিচার করো। উনার জুলুম আর সহ্য করতে পারছি না। উনারে লানত দিয়ে ধ্বংস করে দাও।
ঘর থেকে বের হওয়ার জো নেই। ঘর থেকে বের হলে যে ফিরে আসবে এমন নিশ্চয়তাও দেওয়া যায় না। কিছু বললেও দোষ। শুনলে পেয়াদা এসে ধরে নিয়ে যায় কিনা?
লাতুর কথায় জবর সাই দিয়ে বলল, দেশে কি আইলো রে ভাই। এমন দুঃশাসন চৌদ্দগুষ্টির জন্মেও শুনিনি। দেখা তো দূরের কথা। এমন অরাজকতা খোদা কিভাবে সহ্য করছেন? মনে মনে অভিশাপ দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোন করণীয় নেই। আমরা সহজ-সরল মানুষ। দুই বেলা খাইতে পারি না। খাবার নিয়ে যত চিন্তা।
লাতু : কি আর বলবো ভাই। উনার অনুসারী রাজা মিয়া দলবল নিয়ে সেই দিন শহীদের শেষ সম্বল জায়গাটুকুও দখল করে নিয়েছে। বাঁধা দিলে তাকে ভীষণ মারধর করে। কোন বিচার নাই।শুনেছি থানায় রাজা মিয়ার মামলা নেয়নি। অদৃশ্য শক্তির ইশারা বলে বড় কর্তারা ইঙ্গিত করে।
জবর : উনার ছেলেমেয়েগুলিও বড্ড বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। উনার বড় ছেলে লাল পানিতে আসক্ত। রাত-বিরাতে পৈচাশিক উন্মাদনায় অন্যের বউয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘরের বউ ঝি রাও নিরাপদ নয়।উনি ছেলেমেয়েদের শাসন করেনা। উনার আস্কারা পেয়ে ছেলেমেয়েরা যা ইচ্ছা তাই করছে। কি আর বলবো, সেদিন নাকি ডালিম মিয়ার বউয়ের ঘরে প্রবেশ করে তার সম্ভ্রম হানি করে। ভয়ে লজ্জায় ডালিম মিয়ার বউ এতদিন কাউকে প্রকাশ করে নি। প্রকাশ না করলেও মুখে মুখে রটে গেছে।
ডালিম মিয়া কিন্তু বিস্তর রাগী মানুষ। তার দাপটও কম নয়।সাহসী ও সৎ মানুষ হিসেবে সবাই তাকে সমীহ করে। উনার ছেলে এই মস্ত বড় অন্যায় কাজ কিভাবে করলো? তাও আবার ডালিম মিয়ার বউয়ের সাথে ! ভাবতে অবাক লাগে। কি হচ্ছে এসব। সবার কানে কানে এ নিন্দনীয় ঘটনাটি প্রচারিত হয়ে গেছে।
লাতু : উনার বাহিনীর সম্মুখে কেউ কোন কিছু প্রকাশ করতে পারে না। প্রকাশ করলে তাকে হয়তো লুকিয়ে ফেলবে। না হয় জেলে ভরবে।
দীর্ঘ দুই মাস পর ডালিম মিয়া প্রবাস থেকে এসেছে। আসার সময় কানাঘুষা শুনে সে নিশ্চিত হলো উনার পুত্রের নির্লজ্জ নগ্ন কর্মকান্ডের ব্যাপারে। ডালিম মিয়ার বউ শেফালী তাকে দেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। ডালিম মিয়া আগেই জেনে ফেলেছিলো এসব বিষয়।
তাই কান্নার কারণ আর জিজ্ঞেস করলেন না।
ইতোমধ্যে উনার বিরুদ্ধে সবাই সোচ্চার হলেও কারো সাহস ছিল না প্রতিবাদ করার। উনি একচ্ছত্র আদিপত্য বিস্তার করে একনায়ক বনে গেলেন। উনি রাত বললে রাত। দিন বললে দিন। এভাবেই চলছে উনার দুঃশাসন। চুরি, ডাকাতি, মারামারিতে যেন যুদ্ধময় একটি রাজ্যের করুন পরিণতি।
ডালিম মিয়া উনার কাছে বিচার নিয়ে গেলে উনি তার ছেলের বিচার না করে বরং হেসে উড়িয়ে দিলেন।
ডালিম মিয়া ক্ষুব্ধ হয়ে বাড়িতে ফিরে এলো। সে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করলো।গোপনে ডালিম মিয়া তার বন্ধুদের নিয়ে সংঘটিত হতে থাকে। কিছু সংখ্যক সাহসী যুবককে তার দলে ভিড়িয়ে নিলেন। ডালিম মিয়া সুযোগের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন।
জনগণ খোদার কাছে ফরিয়াদ করলেও এভাবে যে উনার পতন হবে কেউ ভাবতে পারেননি। আচমকা যেন বিনে মেঘে বজ্রপাতের প্রতিধ্বনি হয়ে উনার দুঃশাসনের সিংহাসন তছনছ হয়ে গেল। সেদিন ছিলো অমাবস্যার রাত। তিমির আঁধারে ছেয়ে গেছিলো সারা পৃথিবী।রাতের নির্জনতা ভেদ করে বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ও মস্তক অবনত হয়ে পড়ে উনার নিথর দেহ। ডালিম মিয়া যেন ত্রাতা হয়ে মজলুমদের মুক্ত করলেন। নব্য ফেরাউনের ইতিহাসের অবসান হলো। নতুন সূর্যের উদয় হলো। নতুন প্রভাত এলো। এ যেন এক নতুন পৃথিবী। মজলুমরা মুক্ত হয়ে স্বাধীনতার দিন গুণতে লাগলো। সাম্যের, অধিকারের,আত্মসম্মানের।
দীর্ঘ তিন যুগ পর উনার অভিশপ্ত সমাধি থেকে একটি শিকড়ের জন্ম নিলো। শিকড়টি ডালপালা হয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লো বিষবৃক্ষ হয়ে। বিষবৃক্ষের শিকড় গজাতে গজাতে উনার আত্মা হয়ে জন্ম নিলো রক্তখেকো একটি বটগাছ। গাছের ছায়ায় সন্ন্যাসীরা জমায়েত হলো। প্রার্থনা হলো। উনার আত্মা খুশি হয়ে বর দিলেন, বুভুক্ষু লাশের জীবন্ত প্রতিমা । পাথরে প্রাণসঞ্চার হলো। উনার পাপাচারি আত্মা থেকে শত শত বিষবৃক্ষের জন্ম নিলো। যে সিংহাসনে বসে উনি নগ্ন সভ্যতার কলঙ্কৃত রাজ্য গঠন করেছিলেন, সেই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলেন তার উত্তরসূরী বিষবৃক্ষের জলজ্যান্ত সন্ন্যাসী প্রতিমা। শুরু হলো শাসন। উনার আত্মা শান্তি পেলো। সৃষ্টি হলো লক্ষ লক্ষ কলঙ্কিত সভ্যতার নিষ্ঠুর সন্তান। অনুগত লাঠিয়াল বাহিনী, অস্ত্রধারী পেয়াদা, ও বিষবৃক্ষের অঙ্কুরোদগমন হয়ে মানবরূপি দানব শিশু।
প্রতিমা রাণীর নিষ্ঠুর আদেশে বিরোধীদের গাঢ়মড়কাতে থাকে তার সশস্ত্র বাহিনী। প্রতিবাদী হলে মৃত্যু অনিবার্য। প্রতিমা রাণীর আসল রূপ কেউ ধরতে পারে না। জনসমক্ষে তসবি হাতে আল্লাহর নাম জপতে জপতে সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ জিকির করতে থাকেন। প্রচলিত আছে প্রতিমা রাণী সন্ন্যাসীর আড়ালে জীবন্ত মানুষের রক্ত দিয়ে বহুকালের পিপাসা মিটায় । মদের সাথে জীবন্ত মানুষের রক্ত মিশিয়ে উল্লাসে মেতে উঠেন। রাজ্যের অধিবাসীদের ভাগ্যে নেমে এলো কালো মেঘের হিংস্র থাবা। যেন ফিরে এসেছে তিন যুগ আগের উনার শাসনামলের বীভৎস স্মৃতি। উনার আত্মা হয়ে। নবজন্ম লাভ করেছে উনার প্রতিচ্ছবি।
লুণ্ঠন, হত্যা, ধর্ষণে যেন আইয়ামে জাহিলিয়া। শুরু হলো রাজ্যময় অস্থিরতার কালো সাপ। পাষাণ পেয়াদার নিষ্ঠুর ছোবল। রুখে দাঁড়াবার সাহসী কেউ নেই। ভিনদেশীরা এসে পশরা সাজায়। নিয়ে যায় কলস ভর্তি সোনার কড়ি।ওরা চেয়ে থাকে নিরীহ জড় বস্তুর মতো।
সন্ন্যাসিনী প্রতিশোধের নেশায় বিভোর হয়ে ওঠে।
উনার মৃত্যুর প্রতিশোধে মরিয়া হয়ে উঠে লাল দরিয়ায় মত্ত হয়ে। প্রতি রাতে সন্ন্যাসিনী জীবন্ত মানুষের রক্ত পান করে হাজার বছরের তৃষ্ণা মিটায়। প্রথমে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করলেও। সন্ন্যাসিনীর মনমগজে রক্তের নারকীয় পিপাসা। রক্তছাড়া তার পিপাসা মিটেনা। বলি হতে থাকে রাজ্যের সুদর্শন পুরুষগুলি। সমাধি থেকে উনার আত্মা শান্তি পায়।
সন্ন্যাসিনী সিদ্ধান্ত নেয় যারা উনাকে সমাধিতে পাঠিয়েছে তাদের বংশধরের রক্তে স্নান করিয়ে দিবে উনার কলঙ্কিত সমাধি।
সন্ন্যাসিনীর যেমন ইচ্ছা তেমন কাজ।
একে একে ধরে আনা হলো হাজার হাজার যুবককে।যেনো হত্যাযজ্ঞের মহোৎসব।রক্তের নহর বয়ে যায় উনার সমাধিতে। রূধিরে ভেসে যায় সভ্যতা-সংস্কৃতি ও মানবতার রূহ। বোবা মানুষগুলো এখন আর কাঁদে না। অশ্রæ গড়ায় না। শুধু চেয়ে থাকে অপলক। শোকার্ত পাথরের মত স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে। শত শত পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ।
নির্বাক পাথরে প্রাণ সঞ্চার হয় আবাবিলরূপে। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে আবাবিল। বুলেটের আঘাতে মরলো শত শত। একটার মরণ হলে শতটার জন্ম নেয়। নিষ্পাপ পাখিরা পাপের রাজ্য ধুয়ে দিলো।
বুলেট ফুরিয়ে গেলো। পেয়াদারা পালিয়ে গেল। সন্ন্যাসিনী উধাও হয়ে গেলো। শত শত লাশের রক্তস্নাত বন্যায়। সিংহাসন পাথরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ধসে পড়লো। ক্ষুব্ধ পাখির জয়গানে।
জনতা দেখলো উনার প্রতিবিম্ব হয়ে সেই নব্য ফেরাউনের বীভৎস আত্মা। দেওয়ালে লিখা হলো- সংগ্রাম সংগ্রাম- মুক্তির সংগ্রাম। স্বাধীনতার সংগ্রাম। বিদ্রোহের সংগ্রাম। প্রভাত পাখির গানে। হাসনাহেনার ঘ্রাণে। পড়ে আছে সিংহাসনের কোণায় কোণায় তাজা রক্তের দাগ। যে দাগগুলি শত চেষ্টা করেও মুছা গেলো না। ধ্বনিত হলো কলঙ্কিত সন্ন্যাসিনীর নিষ্ঠুর দন্ড হোক।
প্রতিধ্বনি- দন্ড দন্ড। আকাশে বাতাসে আওয়াজ ওঠে: চূর্ণ হোক অহংকার; দম্ভের হারে। কালের স্বাক্ষী হয়ে।বোবা প্রাণীর থাবা হয়ে।
জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ে। বিষবৃক্ষের ফলগুলি কুড়িয়ে আনা হলো সম্মিলিত জয়ধ্বণিতে। প্রশান্তির বৃষ্টিতে শূচি হলো পৃথিবীর জঞ্জাল। রিমঝিম বৃষ্টির অঝর ধারায়। কলঙ্কিত দাগগুলি মুছে গেলো আকাশের কান্নায়। ঝরনা হয়ে-মহাপ্লাবন হয়ে। ছোট্ট পাখির বিপ্লবে। ঈশ্বরের আশীর্বাদে। নতুন ভোরের প্রতীক্ষায়…