খালেদ মনছুর, আনোয়ারা
চট্টগ্রাম শহর থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে আলাদা করেছে কর্ণফুলী নদী। লুসাই পাহাড় থেকে সৃষ্ট কর্ণফুলী নদী গিয়ে মিশেছে পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের সাথে। কর্ণফুলী আর বঙ্গোপসাগরের মোহনায় আছে দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দর। কর্ণফুলী আর বঙ্গোপসাগরের তীরেই অপার সম্ভাবনার দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও বাঁশখালী উপজেলা। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চোখে নদী-সাগর-পাহাড় বেষ্টিত এই অঞ্চল দেখতে সিঙ্গাপুরের মত। এ অঞ্চল অর্থনীতির হাব হওয়ার রয়েছে অপার সম্ভাবনা। চট্টগ্রাম শহরের উপর অফিস আদালত ও আবাসনের চাপ কমাতে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে চীনের সাংহাইয়ের আদলে ওয়ান সিটি টু টাউনের পরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার। ইতোমধ্যে কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু ও কর্ণফুলী টানেলকে ঘিরে সেই সম্ভাবনা অনেকটা এগিয়েও গিয়েছিল। কিন্তু এই দুই প্রকল্পের যানবাহন চলাচলে অতিরিক্ত টোল আদায়ের ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্প-বাণিজ্য ও আবাসন সম্প্রসারণ বড় ধাক্কা খেয়েছে। উত্তর চট্টগ্রামে যেভাবে কোনো টোলের বাধা না থাকায় শিল্প-বাণিজ্য ও আবাসনের প্রসার ঘটেছে তা দক্ষিণ চট্টগ্রামে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারী, দেশিয় ব্যবসায়ী ও আবাসন ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। এভাবে চলতে থাকলে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে ঘিরে চীনের সাংহাইয়ের আদলে ওয়ান সিটি টু টাউনের পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। কর্ণফুলী উন্নয়ন পরিষদ, সিডিএ কর্ণফুলী আবাসিক প্লট মালিক কল্যাণ সমিতি, হিউম্যান রাইটস ওয়াটস ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম জেলা ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেছে। তাদের দাবি, কর্ণফুলী টানেল ও শাহ আমানত সেতুর টোলের বিষয়ে সরকারকে একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে। তা না হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।
জানা যায়, কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু ২০১০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন করা হয়। সেতু নির্মাণে ৩০০ কোটি টাকা সহায়তা দেয় কাতার সরকার। এই সেতু থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩০ লক্ষ টাকা টোল আদায় হয়। গত ১৫ বছরে শাহ আমানত সেতু থেকে প্রায় ১৬০০ কোটি টাকা টোল আদায় হয়েছে। শাহ আমানত সেতুতে টোল আদায়ের হার হচ্ছে দশ চাকার গাড়ি ট্রেইলার ৭৫০ টাকা, বড় বাস-ট্রাক ৩০০ টাকা, মাঝারী বাস-ট্রাক ২০০ টাকা, ছোট ট্রাক-বাস ১৫৫ টাকা, মাইক্রোবাস-হাইয়েস ১০০ টাকা, কার ৭৫ টাকা, তিন চাকার গাড়ি ৩০ টাকা।
অন্যদিকে কর্ণফুলী টানেলের যানবাহনের টোল হচ্ছে প্রাইভেট কার, জিপ, পিকআপ ২০০ টাকা, মাইক্রোবাস ২৫০ টাকা, বাস (৩১ আসনের কম) ৩০০ টাকা, বাস (৩২ বা তার বেশি আসন) ৪০০ টাকা, বাস (৩ এক্সেল) ৫০০ টাকা, ট্রাক (৫ টন) ৪০০ টাকা, ট্রাক (৫ থেকে ৮ টন) ৫০০ টাকা, ট্রাক (৮ থেকে ১১ টন) ৬০০ টাকা, ট্রাক ট্রেইলার (৩ এক্সেল) ৮০০ টাকা, ট্রাক ট্রেইলার (ফোর এক্সেল) ১০০০ টাকা, ট্রাক-ট্রেইলার (ফোর এক্সেলের বেশি) প্রতি এক্সেলে ২০০ টাকা বেশি।
উত্তর চট্টগ্রামের একজন ব্যবসায়ী অথবা চাকরিজীবী চট্টগ্রাম শহরে কাজ করেও তাদের নিজস্ব গাড়ি নিয়ে বাসাবাড়িতে গিয়ে দুপুরের খাবারসহ অন্যান্য কাজ সেরে আসতে টোল নামক কোনো বাড়তি টাকা খরচ করতে হয় না। চাইলে প্রতিদিন নিজস্ব গাড়িতে করে একাধিকবার বাসা থেকে চট্টগ্রাম শহরে আসা-যাওয়া করতে পারেন। যাতে বাড়তি কোনো টাকা খরচের ঝামেলা নেই। বিপরীতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের কোনো বাসা-বাড়ি থেকে কোনো চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম শহরে দৈনিক কয়েকবার আসা-যাওয়া করলে মাস শেষে তাকে অতিরিক্ত ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়। আর এই বাড়তি খরচ দিয়ে চট্টগ্রাম শহরে একটি ভাল মানের বাসা ভাড়ায় অনায়াসেই থাকা যায়। ফলে তারা দক্ষিণ চট্টগ্রামে বাসা ভাড়া বা নিজস্ব বাড়ি নির্মাণ করে চট্টগ্রাম শহরে যাতায়াত করতে আগ্রহী নয়।
বর্ধিত টোলের কারণে একইভাবে দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্প-বাণিজ্য বিস্তারে অনীহা বিনিয়োগকারীদের। তাদের ভাষ্যমতে, দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে অতিরিক্ত টোলের কারণে পণ্য পরিবহনে খরচ অনেক বেড়ে যায়। ফলে বিনিয়োগকারীরা দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্প স্থাপনে তেমন আগ্রহী হচ্ছে না। এতে করে অর্থনৈতিকভাবে বিপুল সম্ভাবনার এই জনপদ বরাবরের মতই পিছিয়ে থাকছে।
সিডিএ কর্ণফুলী আবাসিক প্লট মালিক কল্যাণ সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি বিশিষ্ট মানবাধিকার সংগঠক অ্যাড. জিয়া হাবীব আহসান জানান, পৃথিবীর কোথাও সিটির ভেতর সেতু থেকে টোল আদায়ের নজির নাই। শাহ আমানত সেতুর দক্ষিণ পাড়ে কর্ণফুলী উপজেলা সিএমপিতে আর উত্তরের বাকলিয়াও সিএমপিতে। ফলে এই সেতু সিটির মধ্যে হওয়ায় এখান থেকে টোল আদায় অবৈধ। আমরা প্রথমে সংবাদ সম্মেলন করেছি, পরে মানববন্ধন করেছি। এখন গণস্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে। এরপর শাটডাউন কর্মসূচি নেওয়া হবে। সর্বশেষ আমরা হাইকোর্টে রিট করব। তিনি আরো বলেন, কর্ণফুলী শাহ আমানত তৃতীয় সেতু ও কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন হয়েছে তা এই দুই প্রকল্পের অতিরিক্ত টোল আদায়ের কারণে ভেস্তে যেতে বসেছে। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, বিনিয়োগকারীরা দক্ষিণে বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।
সিডিএ কর্ণফুলী আবাসিক এলাকা দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে পড়ে আছে। কিন্তু কেউ তাতে বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।
জেসি ফুড প্রোডাক্টসের মালিক আবু ছৈয়দ সওদাগর বলেন, শাহ আমানত সেতুর টোলের কারণে আমরা শিল্প কারখানা মালিকরা দক্ষিণ চট্টগ্রামে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছি না। প্রতিদিন আমাদের শতাধিক ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লরি মালামাল নিয়ে সেতু পার হয়। এসব যানবাহনের টোলের টাকা পণ্যের উৎপাদন খরচে যোগ হয়। যা অন্যান্য শিল্প কারখানার উৎপাদিত পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় হিমশিম খেতে হয়। এজন্য দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্প কারখানা স্থাপনে এক প্রকার অনীহা শিল্প মালিকদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্ণফুলী টানেল ও শাহ আমানত সেতুর টোল পুরোপুরি বিলুপ্ত করা না গেলেও একটি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। তাছাড়া শাহ আমানত সেতুর টোল থেকে আয় সেতু নির্মাণের ব্যয় থেকে কয়েকগুণ বেশি আদায় হলেও এখনো টোল আদায় অব্যাহত রাখার কোনো যৌক্তিকতা আছে বলে মনে করেন না তারা। টোল আদায় থেকে সরকারের যে আয় হয় তা থেকে শিল্প-বাণিজ্য ও আবাসন খাত স¤প্রসারণ হলে সরকার অনেক বেশি লাভবান হবে বলে মত প্রকাশ করে কর্ণফুলী টানেলের টোল সহনীয় পর্যায়ে এনে শাহ আমানত সেতুর টোল পুরোপুরি বন্ধ করা যায় কিনা তা বিবেচনা করে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) চট্টগ্রামের প্রকৌশলী জাহিদ হাসান বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তমতে শাহ আমানত সেতুতে টোল আদায় করা হয়। টোলের বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিষয়ে আমরা ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবগত আছেন। সরকার নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আমরা সে হিসেবে কাজ করব।
কর্ণফুলী টানেলের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবুল কালাম আজাদ জানান, কর্ণফুলী টানেল বিদেশি লোনের মাধ্যমে করা হয়েছে। বর্তমানে এ প্রকল্প লোকসানে রয়েছে। তার মধ্যে টোলের হার কমানোর কোনো সিদ্ধান্ত নিলে লোকসানের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পাবে।










