‘থাংলিয়ানা’ পাঠে মগ্নতা

4

দুই হাজার চব্বিশের একুশের বইমেলায় ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘থাংলিয়ানা’ গ্রন্থটির প্রশস্তি ও গুণকীর্তন প্রায়শ চোখে পড়েছিল সামাজিক মাধ্যমে। নামের বৈচিত্রতা নাকি আকর্ষনীয় বিষয়বস্তু পাঠকদের উস্কে দিচ্ছিল বোঝা যাচ্ছিলো না। যাই হোক ‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম’ গ্রন্থের যশস্বী লেখক হারুন রশীদ বর্ণিত গ্রন্থের লেখক জানতে পেরে গ্রন্থটি পাঠ করার জন্য বেশি আগ্রহান্বিত হয়ে পড়ি। ‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম’ গ্রন্থটি সবিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। সুপ্রাচীন ঐতিহ্যমন্ডিত চট্টগ্রামের ৫০০ বছরের ধারাবাহিক ইতিহাস তিনি সুবিন্যাস্তভাবে পাঠকদের উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন। যার দৃষ্টান্ত ইতিপূর্বে বিরল।
গ্রন্থটি নিয়ে ব্যাপক আলাপ আলোচনা শুনে পড়ার জন্য বেশ লোভ জাগে। লেখকের সাথে বাতচিতও হলো। এরি মাঝে ঘটনা চক্রে গ্রন্থাকারের স্বহস্তে লিখিত শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা বাক্য সমেত কুরিয়ারে পেয়ে পুলকিত হয়ে পড়ি। সমস্যা হল ঘরে হারুনের ভক্ত ও গুণমুগ্ধ পাঠক আমরা দুজন। লেখালেখি ছাড়াও আমার আছে প্রকৃতি ও প্রবীণদের নিয়ে নানাবিধ কাজকর্ম। তারপর হারুনের ইতিহাস চর্চায় আমি মুগ্ধ। অতএব ভাগাভাগি পাঠ শুরু। একজন ইংরেজ রাজ কর্মচারীর প্রত্যক্ষ দর্শনীতে আমার প্রিয় শহর চট্টগ্রামের স্মৃতিচারণ পাঠের গভীর আগ্রহ এবং লোভ সামলানো সত্যিই কঠিন।
‘থাংলিয়ান’ হল পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত এক ব্রিটিশ কর্মচারীর রোমাঞ্চর অভিযানের স্মৃতিকথা। লেফটেন্যান্ট থমাস হারর্বট লুইন ১৮৬৫ সালে চট্টগ্রামের পুলিশ প্রধান হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ১৮৬৬-১৮৭২ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। ১৮৭৯ সালে দারজিলিং থেকে ডেপুটি কমিশনার এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদায় অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পর নিজ দেশ লন্ডনে ফিরে গিয়ে রোমাঞ্চকর অভিযান ও স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘এ ফ্লাই অব দ্য হুইল (A Fly on the wheel) প্রকাশ করেন। গ্রন্থটি ১৮৮৫ সালে লন্ডন থেকে প্রাকশিত হয়। তাঁর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, প্রকৃতি ও আদিবাসীদের নিয়ে তাঁর মুগ্ধতা গ্রন্থের প্রতিটি পাতায় পাতায়।
থমাস লুইন ১৮৬৫ থেকে ১৮৭২ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। চট্টগ্রামের মাটিতে পা রাখার পর থেকেই এতদঞ্চলের প্রকৃতি এবং কর্ণফুলীর উজানের পাহাড়, নীলাকাশ, মেঘমালা তাঁকে এতো মুগ্ধ করেছিল যে, তিনি যে কোন ছুতোয় পাহাড়ে যাওয়ার জন্য উৎগ্রীব থাকতেন। এই ঘটনাপ্রবাহ আজ থেকে ১৫০ বছর আগের। ঘটনার প্রেক্ষাপট কয়েক হাজার বর্গমাইলের গভীর জঙ্গলাকৃত পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় টিলা বনজঙ্গল, গিরিখাদ বন্যপ্রাণীসহ সহজ সরল পাহাড়ি আদিবাসীগণ। বিশেষ করে লুসাই সম্প্রদায়। তিনি যখন ১৮৬৫ সালে চট্টগ্রামে পোস্টিং পেলেন এবং পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রামে থাকাকালীন সময়ের তথাকার প্রকৃতি ছিল দুর্গম। যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল প্রায় অগম্য। বেশকিছু আদিবাসী বা পাহাড়ি জনগোষ্ঠি সেখানে বাস করতো স্বাধীনভাবে। তেমনি গভীর জঙ্গলে ‘তাউংখ্যা, নামে পরিচিত এক আদিম ও দুর্ধর্ষ জনজাতির বাস ছিল। হাজার বছর ধরে সমভূমি অঞ্চলের মানুষের কাছে ‘তাউংখ্যারা’ অসভ্য, হিংস্র, বর্বর বলে পরিচিত ছিল। জনশ্রুতি ছিল তাউংখ্যাদের ভূখন্ডে সমতলের মানুষদের প্রবশে নিষিদ্ধ। তাঁদের নিয়ে সমতলের মানুষের লোকমুখে ছিল অসংখ্য উদ্ভট গুজব। তাঁরা মানুষ খেকো এই ভয়ে সমতলের মানুষ সেখানে প্রবেশ করতে ভয় পেত। আবার এই জনজাতি নদী বা জলের স্পর্শ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতো। পৃথিবীর অন্য মানুষ বা জগত সম্পর্কে তাঁদের কোন ধারণা ছিল না। কোন খোঁজ খবর রাখার চেষ্টাও করতে না। তাঁরা যেন অন্যগ্রহের মানুষ।
এই মানুষগুলো সম্পর্কে নানান গুজব উদ্ভদ কতা শুনে ব্রিটিশ অফিসার হারবার্ট লুইয়ের মনে কৌতুহল ও জেদ চেপে যায়। নিজের প্রাণবাজী রেখে এই নিষিদ্ধ দুর্গম এলাকায় প্রবেশ করেন লুইন। তার এই দুঃসহসিক অভিযানে উন্মোচিত হতে থাকে একের পর এক বিষ্ময়। লুইন তাঁদের সাহচর্যে আসেন, আলাপ করেন। ঘনিষ্ঠ হয়ে নিজের চোখে দেখেন তাঁদের খাদ্য রুচি, সংস্কৃতি ও সমাজ জীবন। গোত্রপ্রধানের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। তাঁদের সহায়তায় ব্রিটিশ রাজের লোকজন লুসাইদের অপহৃত একটি শিশু উদ্ধারে যুদ্ধে নামেন। থমাস লুইয়ের পার্বত্য চট্টগ্রাম অবস্থানকালীন সময়েই লুসাই জাতির কর্তৃক ইংরেজ কর্মচারী ও শিশু মেরী ইউনচেষ্টার জোলুটি অপহৃত হয়। তাঁদের উদ্ধারে ইংরেজ সেনাবাহিনী যুদ্ধাভিযান শুরু করে। লুইন ছিলেন সে যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রধান। বলা যেতে পারে তথাকথিত সভ্য মানুষ হানা দিয়ে পাহাড়ের নির্জনতা তছনছ করে। ব্রিটিশ বাহিনীর অগ্রাভিযান প্রতিহত করার কৌশল হিসাবে লুসাইরা নিজেদের বসতবাড়ী, গ্রাম, খাদ্যগুদাম প্রভৃতি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে পাহাড় অভ্যন্তরে পালিয়ে যেতে থাকে। সেই প্রথম অচিন অঞ্চলের মানুষ তথা বাইরের দুনিয়ার সাথে তাঁদের প্রথম পরিচয়ের পালা শুরু।
থমাস হারবার্ট লুইন ১৮৩৯ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৫৭ সালে তরুণ লেফটেন্যান্ট হিসাবে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদান। ১৮৬৫-১৮৭২ পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশের পাহাড়ঘেরা চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। তাঁর স্মৃতিচারণে তিনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠি সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করেন। অথচ বাঙালি হিন্দু মুসলমানদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। অথচ তাঁর কর্মজীবনের প্রতিমুহূর্তে তাঁদের সহায়তায় পথ চলেছেন। তাঁর মতে বাঙালিরা দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত এক জাতি। যাঁরা পরিশ্রম ও সততা বিমুখ। আমার ধারণা তিনি কর্মক্ষেত্রে এবং পেশাগত সূত্রে যাঁদের সাথে মেলামেশা করেছেন, তারা সবাই ছিল টাউট, বাটপার এবং মোকতার শ্রেণির লোকজন। তবে লুইন সৎ, পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান কর্মচারী ছিলেন ।
লুসাই জনগোষ্ঠিরা ভালোবেসে তাঁর নাম দেন ‘থাংলিয়ানা’ গ্রন্থটি ও অনুবাদক হারুন রশীদ। থমাস হারর্বাট লুইয়ের স্মৃতি চারণগ্রন্থ ‘এ ফ্লাই অন দ্যা হুইল’ বিষ্ময়কর ভাবে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করার পরও বোঝাযায়নি এটি একটি অনুবাদগ্রন্থ। মনে হচ্ছিল একটি মৌলিক রোমাঞ্চকর বই পাঠ করছি। থাংলিয়ানা পাহাড়ি লুসাই আদিবাসীর ভালোবাসার ডাকনাম। গ্রন্থটি পাঠশুরু করলে তাতে মজে না যাওয়াটাই অশ্চর্য্যরে বিষয়। হারুণ মুন্সিয়ানার সাথে তার অনুবাদ করে বাঙালি পাঠকের অন্তর জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। গ্রন্থটির বিষয়বস্তু এতো আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর যে কোন পাঠক বই ছেড়ে উঠতে পারবেন বলে মনে হয় না। তিনি অপ্রতিরোধ্য ভাবে এবং মাধুর্য্য মিশিয়ে অনুবাদ করেছেন। বলা যায় অদৃশ্য এক চম্বুকীর শক্তির টানে গ্রন্থটি পাঠে।
সবশেষে বলা চলে থাংলিয়ানা একটি সমৃদ্ধ, মুখপাঠ্য এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ। হারুন রশীদকে অভিনন্দন। বাঙালি পাঠক সমাজ তাঁর হাত ধরে অনাবিস্মৃত একটি ইতিহাসের সন্ধান পেল। আমরা তাঁর কাছ থেকে আরও আরও মূল্যবান গ্রন্থ প্রত্যাশা করি। দীর্ঘ জীবন কামনা করি।

লেখক : কবি, নিসর্গী ও ব্যাংক নির্বাহী (অব)