তিন প্রকল্পে দেশের ২ প্রান্ত ছুঁবে রেলপথ

17

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত ৫২৬ কিলোমিটার রেলপথ ব্রডগেজ। ঢাকা থেকে কক্সবাজার ৪৭৪ কিলোমিটার রেলপথ ব্রডগেজ ও মিটারগেজ। যমুনা নদীর দুই পাড়ে বিভক্ত হওয়া রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল রেলপথের এমন ভিন্নতার কারণেই এখনো দেশের দুই প্রান্ত ছুঁয়নি রেলপথ। যে কারণে উত্তরাঞ্চল থেকে সরাসরি কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন যোগাযোগ স্থাপন হয়নি। পূর্বাঞ্চলের ঢাকা-কক্সবাজার রুটের ২৯২ কিলোমিটার রেলপথ মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজ করা গেলেই ট্রেনযোগে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে সরাসরি কক্সবাজার যেতে পারবেন পর্যটকরা। ইতোমধ্যে দেশের সব মিটারগেজ রেলপথকে ২০৩০ সালের মধ্যেই ব্রডগেজে রূপান্তর করার উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। এতে ট্রেন চলাচল সহজ হবে এবং সময়সূচি মেনে চলার হার বাড়বে।
রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মুহাম্মদ কুতরত-ই-খুদা পূর্বদেশকে বলেন, ‘মিটারগেজ সব রেলপথকে ব্রডগেজে রূপান্তর করা হবে। দোহাজারি থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি প্রকল্প চলমান আছে। লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি প্রকল্প নেয়া হলেও সেটির ডিপিপি এখনো প্রক্রিয়াধীন আছে। এটি হওয়ার পরেই দ্বিতীয় ধাপে টঙ্গী থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ প্রকল্প নেয়া হবে। এই তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের সাথে পর্যটন শহর কক্সবাজারের যোগাযোগ সহজ হবে।’
জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়েকে দুটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। যমুনা নদীর পূর্ব পাশে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিম পাশে পশ্চিমাঞ্চল। পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর চট্টগ্রাম ও পশ্চিমাঞ্চলের সদরদপ্তর রাজশাহী। পূর্বাঞ্চলে এক হাজার ২৭৯ কিলোমিটার রেলপথ আছে। এরমধ্যে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ৪৭৪ কিলোমিটার রেলপথ আছে। অপরদিকে পশ্চিমাঞ্চলে এক হাজার ৪২৭ কিলোমিটার রেলপথ আছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ব্রডগেজ রেলপথ প্রশস্ততা বেশি। যে কারণে উচ্চগতি এবং বেশি মালামাল বহনে এই লাইনে সুবিধা আছে। মিটারগেজ রেলপথ সংকীর্ণ এবং এটি মূলত পুরানো প্রযুক্তিতে তৈরি। পাহাড়ি অঞ্চল এবং কিছুটা উঁচু জায়গায় এই রেলপথ হয়। বাংলাদেশে ধীরে ধীরে মিটারগেজ রেলপথ উঠে যাচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চলে অভ্যন্তরীণ কিছু রুটে মিটারগেজ লাইন থাকলেও বিভাগীয় শহরের সাথে সম্পৃক্ত লাইনগুলো ব্রডগেজ।পূর্বাঞ্চলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে টঙ্গী থেকে কমলাপুর ৮ কিলোমিটার, আখাউড়া থেকে লাকসাম ৭২ কিলোমিটার রেলপথ ব্রডগেজ। এই রুটের টঙ্গী থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ৯৩ কিলোমিটার, লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ১৪৭ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারি পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার রেলপথ এখনো মিটারগেজ আছে।
পশ্চিমাঞ্চলে চলাচল করার ব্রডগেজ ইঞ্জিন ও কোচগুলো ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করতে পারে না। যে কারণে পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর, রাজশাহী, খুলনা বিভাগের যাত্রীদের ঢাকা এসে অন্য ট্রেন ধরে চট্টগ্রাম কিংবা কক্সবাজার যাতায়াত করতে হয়। কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের পর উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড় থেকে সরাসরি ট্রেন চালুর দাবি সামনে আসে। কিন্তু ঢাকা-কক্সবাজার রুটের ২৯২ কিলোমিটার রেললাইন এখনো মিটারগেজ থাকায় দেশের দুই প্রান্ত পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল চালুর সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি রেলওয়ে।
২০২৩ সালে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারি পর্যন্ত রেলপথটি ব্রডগেজ ট্রাকে রূপান্তর করতে প্রায় সাড়ে দশ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটির অধীনে মেইন লাইন এবং লুপ লাইন মিলিয়ে প্রায় ৬২ কিলোমিটার রেললাইন ব্রডগেজ হবে। ইতোমধ্যে টঙ্গী থেকে আখাউড়া এবং চট্টগ্রাম থেকে লাকসাম পর্যন্ত রেলপথকে ব্রডগেজে রূপান্তরে দুটি প্রকল্পের সমীক্ষা হয়েছে। এই দুটি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ২০৭ কোটি টাকা। যদিও বৈদেশিক ঋণের অভাবে প্রকল্প দুটির ডিপিপি এখনো অনুমোদন হয়নি।
দেশের সব রেলপথকে মিটারগেজের পরিবর্তে ব্রডগেজ করার পরিকল্পনা নেয়ায় মিটারগেজ ইঞ্জিন ও কোচ কেনা কমানো হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে রেলওয়ে মিটার গেজের তুলনায় ব্রডগেজ ইঞ্জিন ও কোচ কেনা হয়েছে বেশি। যদিও এসব ব্রডগেজ কোচ-ইঞ্জিন পশ্চিমাঞ্চলেই চলে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট এখনো পুরোপুরি মিটারগেজ ইঞ্জিন ও কোচের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু মিটারগেজ ইঞ্জিন ও কোচ সংকট থাকায় মালবাহী ট্রেন চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি চাহিদা থাকা সত্তে¡ও নতুন ট্রেন চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন পূর্বদেশকে বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরোটা ব্রডগেজ করা গেলে ইঞ্জিন সংকট কাটবে। এখন বিচ্ছিন্নভাবে ব্রডগেজ হয়েছে। ঢাকা থেকে টঙ্গী, আখাউড়া থেকে লাকসাম হয়েছে। টঙ্গী থেকে আখাউড়া, লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম অংশ এখনো ব্রডগেজের আওতায় আসেনি। এটা হয়ে গেলে সংকট নিরসন হবে। কারণ আমাদের ব্রডগেজ কোচ ও ইঞ্জিন পর্যাপ্ত আছে। আমরা যেহেতু ব্রডগেজে যাচ্ছি তাই মাঝখানে মিটারগেজ ইঞ্জিন কম কেনা হয়েছে। ২১টি মিটারগেজ মেরামত করছি, ২০টি চায়না দিচ্ছে, ৩০টি ইঞ্জিন কিনছি। আগামী বছর থেকে পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে।