তারেক রহমানের দেশে ফেরা কার নিয়ন্ত্রণাধীন

3

সুরেশ কুমার দাশ

বাংলাদেশের রাজনীতি গভীর সংকটে। এতদিন যেমন ছিল তো ছিলই। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতার মধ্যে রাজনীতির সংকট ভিন্নরূপ ধারণ করেছে। বেগম খালেদা জিয়া অবস্থা ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’ বলেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এভার কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অবস্থা সম্পর্কে নানা বিএনপির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
কিন্তু গুরুতর অসুস্থ মাকে দেখার জন্য উদ্বিগ্ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কিন্তু তিনি দেশে আসতে পারছেন না।
তারেক রহমান বলেছেন- ‘এ সময় তিনি অসুস্থ মায়ের পাশে থাকতে চান। কিন্তু দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত পুরোটা তার নিজের হাতে নেই।’
‘এখনই দেশে ফেরার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তার জন্য অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।’
কিন্তু দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত কেন তার হাতে নেই। স্পর্শকাতর এ বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
অথচ তারেক রহমান এখন বিএনপি’র মূল স্তম্ভ। বিএনপির সকল সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকাই এখন মুখ্য। এমন কী তার অসুস্থ মা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছেও অন্তত সন্তান হিসেবে তারেক রহমানের গুরুত্ব অনুরূপ। এমন সময়ে মায়ের পাশে থেকে সেবা-শুশ্রুষা করা প্রত্যেক সন্তানের জন্য সৌভাগ্যের।
কিন্তু মায়ের পাশে থাকতে না পেরে দলের এমন একজন নেতা যখন এ কথা বলেন, তখন দেশের রাজনৈতিক সঙ্কটও আঁচ করা যায়। যেখানে দেশের সচেতন মানুষ রাজনীতিতে গভীর সংকট দেখছেন।
কারণ দেশ এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে। যখন একটি নির্দিষ্ট সময়ে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার জন্য অপেক্ষা করছে দেশের মানুষ। তখনই এসব কিছু দুর্লঙ্ঘ্য হিসাবে দেখা দিচ্ছে।
‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’ খালেদা জিয়ার কথা বাদ দিলেও আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রধান রাজনৈতিক দল হচ্ছে বিএনপি। আগামী ইলেকশনে বিএনপি সরকার গঠন করবে এ কথা দেশের বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করে। এটা না হোক-তারা যে নির্বাচনে প্রধান দল তাতে কোন সন্দেহ নেই দেশের মানুষের। আসন্ন নির্বাচনে যখন দেশে আসতে দেশের প্রধান দলের নেতা সঙ্কটে- তখন স্বাভাবিকভাবে দেশের মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে দেশের ভবিষ্যৎ কি? দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ কি? সামনে তো নির্বাচন, কিভাবে দলটি নির্বাচন পরিচালনা করবে ?
অপরদিকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ১৭ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ, যার মধ্যে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ এবং গণহত্যা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনটি পৃথক অভিযোগে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড এবং আরও কয়েকটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি, ২৭ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে আরেকটি আদালত দুর্নীতির তিনটি পৃথক মামলায় হাসিনাকে মোট ২১ বছরের কারাদন্ড দিয়েছেন।
তিনি বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। হাসিনার মৃত্যুদÐের রায় কার্যকর করার জন্য বাংলাদেশ সরকার দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য ২৩ নভেম্বর ভারতকে চিঠি দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মোঃ তৌহিদ হোসেন। দিন দুয়েক আগে অর্থাৎ গত শুক্রবার এই চিঠি পাঠানো হয় বলে তিনি জানান।
উপদেষ্টা বলেছেন, “বাংলাদেশ আগেও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু দিল্লি সাড়া দেয়নি।
তিনি বলেন, ‘এখন পরিস্থিতি ভিন্ন, বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং তারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে।’
শেখ হাসিনার সাথে মৃত্যুদÐপ্রাপ্ত আসামি হিসাবে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও রয়েছেন।
সাজা কার্যকর করতে হাসিনাকে দেশে ফেরত আনতে চাই সরকার। কিন্তু চাইলেও হাসিনাকে আনতে পারছে না।
অপরদিকে তারেক রহমানের ব্যাপারে গতকাল পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে আসতে চাইলে তাকে একদিনের জন্য ‘ট্রাভেল পাস’ দেওয়া সম্ভব।
অর্থাৎ তারেক রহমানের ইচ্ছা থাকলেও তিনি দেশে আসতে পারছেন না। আর কাঠখড় পুড়িয়েও হাসিনাকে আনতে পারছে না সরকার। তাকে আনার চেষ্টা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। হাসিনা যেমন দেশে এসে বিচারের মুখোমুখি হতে চান না, যে কারণে তার আসার প্রশ্নই এখন বাহ্য আলাপ। আর হাসিনাকে ভারতও প্রত্যর্পণ করতে রাজি নয়।
কিন্তু যিনি আসতে চাচ্ছেন তার বাধা কোথায়। এরকম বাধা বা নিয়ন্ত্রণ কোত্থেকে? এটা এমন কী অদৃশ্য শক্তি!
রাজনৈতিক এমন সঙ্কটের মধ্যে কিছু আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির কথা বলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জিল্লুর রহমান।
নিজের ইউটিউব চ্যানেলে জিল্লুর রহমান বলেছেন, ‘ফেব্রæয়ারি মাসের বর্তমান সরকার অধীনে আমি কোন নির্বাচন দেখিনা। আমি আবারো আমার কথার পুনরাবৃত্তি করছি। আমি বরাবরই বলে আসছি- যদি কোন নির্বাচন হয়ও এটা একটা ফার্সিকাল ইলেকশন হবে’।
তিনি সরকারের মধ্যে নির্বাচনের সদিচ্ছা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো নির্বাচনী তৎপরতা দেখছেন না বলেও জানান।
এ কথার যৌক্তিকতা আছে। তারেক রহমান যদি তার মায়ের ঘোরতর অসুস্থতার মধ্েয দেশে আসতে না পারেন তাহলে নির্বাচনের সময় যে আসতে পারবেন তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়। এসেও যদি নির্বাচন গুছানোর কাজ সারতে না পারেন। যদিও এখন নির্বাচনের চেয়ে মায়ের অসুস্থতা এখন সবোর্চ গুরুত্বপূর্ণ। তারপরও তার আসার সুযোগ নেই! অন্যদিকে দেশও তো মাতৃস্বরূপ। দেশের জন্য উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা মায়ের অসুস্থতার উদ্বেগ- উৎকণ্ঠার সমতুল্য।
তারেক রহমান নিজেও বলে আসছেন-এ মাসে কিংবা ওই মাসে দেশে আসবেন। কিন্তু তার আসার আশায় পথ চেয়ে আছে মানুষ।
আর জিল্লুর রহমানের যে আশঙ্কা শুধু তা তার নিজের নয়, দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক সচেতন মানুষ, এমনকি সাধারণ মানুষের ভেতর থেকেও একই ধরনের আশঙ্কার ধ্বনি- প্রতিধ্বনি বারবার শোনা যায়।
তারেক রহমান লন্ডনে আছেন প্রায় ১৭/১৮ বছর। খালেদা জিয়া দেশে থাকলেও বেশিরভাগ সময় ছিলেন জেলে। দেশের রাজনীতি ‘হাসিনামুক্ত’ হয়েছে দেড় বছর। এরমধ্যে খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে বিশেষ কোনো বিচরণ ছিল না। এর প্রধান কারণ ছিল হয়তো তার অসুস্থতা। বলতে গেলে বিএনপির মত দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটি গত অনেক বছর ধরে অনেকটা দলীয় প্রধানের নেতৃত্ব ছাড়াই তাদের অন্যান্য নেতাদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। যে দলটির গণভিত্তি ব্যাপক পরিসরে হওয়ায় এটা সম্ভব হয়েছে। যদিও তারেক রহমান লন্ডন থেকে দল পরিচালনা করেছেন, তার নির্দেশে দল পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে দলকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে নেতাদের অবদান অস্বীকার্য। এখন কথা হচ্ছে- তারেক রহমানের দেশে আসার বিষয়ে একক নিয়ন্ত্রাধীন নয় বলে যে কথাটি জানানো হয়েছে- সেটার সাথে আর কারা কারা জড়িত। কার ‘নিয়ন্ত্রণাধীন’ তার দেশে ফেরা। যখন দেশে এক ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব শূন্যতা রয়েছে। দেশের মানুষের কাছে যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব একান্তই প্রয়োজন।
যিনি ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার পর চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে যান।
গণতান্ত্রিক দেশে শাসন কর্মে রাজনৈতিক দল ও নেতার গুরুত্ব অপরিসীম। ক্ষমতাসীন হয়ে তারাই দেশের কান্ডারি হন। গণতান্ত্রিক দেশের জনগণের ভাগ্যবিধাতাও।
কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি অদৃশ্য কোনো শক্তির নিয়ন্ত্রণে পড়ে তাহলে সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালিত হবে সেই আশা দূরাকাশের কালবৈশাখী মেঘের মত ভয়ার্ত। এটা জনগণের অলঙ্ঘনীয় ললাট লিখনের মত।
দেশের মানুষ এ সময়ে একজন যোগ্য নেতা খুঁজছেন। যখন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে এক বিশাল ঐতিহাসিক পট পরিবর্তন হয়েছে। যখন অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। এবং তারা অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করছেন। কার কাছে দেশের কর্তৃত্ব অর্পিত হবে এখনো জনগণ জানে না, ধোঁয়াশার মধ্যে। জনগণ যেখানে কোনো ক‚লকিনারা দেখছেন না।
এমন একটা পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের সমস্যা শুধু তার নয়, দেশের সমস্ত জনগণের। এই জায়গায় জনগণের প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক এবং প্রশ্ন করা স্বাভাবিক দেশে আসার ব্যবস্থা কোন জায়গা থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এসব ব্যাপারে খোলাখুলি জবাব থাকা দরকার।
অন্যথা হলে ২০২৪ সালে ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনকে আমরা ১/১১ এর সাথে মিলিয়ে নিতে পারি। যেখানে ষড়যন্ত্রের কথা বলা হয়, একই প্রক্রিয়ায় দেশে পর পর রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সুযোগ নিচ্ছে কেউ। অথবা রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা হয়। যাতে রাজনৈতিক দলের বাইরে অন্য কারো কর্তৃত্ব করার সুযোগ সৃষ্টি করা হয় বিভিন্ন মেয়াদে। এটা কোনো রুটিনমাফিক ব্যবস্থা কিনা? মানে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে কর্তৃত্ব করা, নিজেদের অবস্থান জানান দেয়া, দেশকে অস্থিতিশীল করে রাখা।
দেশের স্বার্থে দেশের রাজনীতির স্বার্থে এসব প্রশ্নের জবাব খোলামেলা হওয়া প্রয়োজন। যে কারণে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, এসব নানা প্রশ্নের উত্তর না পেলে, তার সুফল মানুষ পাবে না। তারেক রহমানের দেশে আসার প্রতিবন্ধকতার মাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। তাই যেখানে একজন রাজনৈতিক নেতা কোণঠাসা সেখানে জনগণের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা আদৌ কিভাবে নির্ণয় করা সম্ভব ?
লেখক : সাংবাদিক