
মোহাম্মদ ইউসুফ
সীতাকুন্ডের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সর্বজনশ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ডা. এখলাছ উদ্দিনের গত (২৭ নভেম্বর) ছিল দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২৩ সালের এদিনে তিনি মুত্যুবরণ করেন। প্রয়াত এ ত্যাগী রাজনীতিকের দ্বিতীয় প্রয়াণদিবসে জানাই আন্তরিক সশ্রদ্ধ অভিবাদন ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সীতাকুন্ডে আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে তাঁর নাম একাকার হয়ে আছে; আগাগোড়াই তিনি ছিলেন একজন নির্ভেজাল রাজনীতিক। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে তাঁর প্রবাদতুল্য অবদান। জীবন-যৌবনের বেশিরভাগ সময় তিনি ব্যয় করেছেন রাজনীতি ও চিকিৎসাসেবায়। দুই দশকের বেশি সময় তিনি ছিলেন সীতাকুন্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতিও ছিলেন।সীতাকুন্ডের মাটি ও মানুষের সাথে ছিলো তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সর্বস্তরের মানুষের কাছে ছিলো তাঁর ঈর্ষণীয় গ্রহণযোগ্যতা। কাছ থেকে দেখা নিবেদিতপ্রাণ এই রাজনীতিকের সাথে রয়েছে আমার অনেক স্মৃতি। শিশুর মতো সহজ-সরল মানুষটি রাজনীতির জন্যে শুধু দিয়েই গেছেন, বিনিময়ে পাননি কিছুই।
ডা. এখলাছ ১৯৩৮ সালের ২০ এপ্রিল সীতাকুন্ডের বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের বহরপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম সৈয়দুর রহমান বার্মা রেলওয়ের হিসাব কর্মকর্তা ও পরে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সেক্রেটারি ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বাগদাদেও কর্মরত ছিলেন তাঁর বাবা। ডা. এখলাছ ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক পাস করেন। আইএসসি উত্তীর্ণ হন চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে। চট্টগ্রাম ও ঢাকা ( মিটফোর্ড) মেডিকেল স্কুলে এলএমএফ কোর্স সম্পন্ন করেন। এমবিবিএস পরীক্ষা চলাকালীন স্বাধীনতাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় তা আর শেষ করতে পারেননি। পরে ভারতীয় দুটি মেডিকেল সংগঠন তাঁকে ফেলোশিপ দেয়। ১৯৬২ সালে আয়ারল্যান্ডে যাওয়ার বৃত্তি পেলেও বাবার গুরুতর অসুস্থতার কারণে যাওয়া হয়নি।
১৯৬০ সালে ডা. এখলাছ ফটিকছড়ির রোসাংগিরির জমিদার আরমান আলী চৌধুরীর কনিষ্ঠ কন্যার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর এক ছেলে প্রয়াত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. মাসুদ পারভেজ ও পাঁচ মেয়ে; সবাই উচ্চশিক্ষিত।
স্কুলজীবন থেকে ডা. এখলাছ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে জাতির প্রতিটি অপরিহার্য আন্দোলন-সংগ্রামে রয়েছে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল ভ‚মিকা। মেডিকেল স্কুলে ১৭০ দিন ধর্মঘট করে চট্টগ্রাম মেডিকেল স্থাপনেও তিনি ভূমিকা রাখেন।
১৯৫৮ সালের আইয়ুবের সামরিক শাসনের সময়েও হুলিয়া জারি হলে তাঁকে বগুড়া, কুষ্টিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে আত্মগোপন করে থাকতে হয়। ১৯৬৮ সালে সীতাকুন্ড থানা আওয়ামী লীগের প্রথম সক্রিয় কমিটি গঠিত হলে ডা. এখলাছ ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তাঁর ওপর চরম নির্যাতন চালায়। ১৯৭১ সালে বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতের হরিণা ক্যাম্পে প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ও মোটিভেটর ছিলেন তিনি।
এ ছাড়া যুবশিবির ও শরণার্থী শিবির দেখভাল দায়িত্বও তাঁর ওপর ছিল। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর ডা. এখলাছ সীতাকুন্ড এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সিভিল প্রশাসন স্থাপন করেন। স্থানীয় এমপির অনুপস্থিতিতে তিনি ডেপুটি এডমেনিস্ট্রেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সার্বক্ষণিক রাজনীতি করতে গেয়ে ডা. এখলাছকে বিভিন্ন সময়ে আর্থিকভাবে ভীষণ ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়। ’৭১ সালে সীতাকুন্ডের বড়দারোগাহাটে তার একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেয় দুষ্কৃতিকারীরা। এছাড়া বহরপুরে তাঁর গ্রামের বাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় পাকবাহিনী। ড.কামাল হোসেনের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করার সময় সীতাকুন্ড বাজারস্থ তাঁর চেম্বার পুড়িয়ে দেয়া হয়।
লেখক : প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম










