গুরুতর অসুস্থ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের গুরুতর সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে গত রবিবার তাঁকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এসময় বিএনপির নেতৃত্ব বেগম জিয়ার অবস্থা ‘সংকটাপন্ন’ বলে গণমাধ্যমকে বলেছেন। বিএনপি থেকে শুক্রবার গভীর রাতেই জানানো হয়েছে যে, খালেদা জিয়াকে হাসপাতালের সিসিইউতে রেখে দেশি বিদেশি চিকিৎসকদের তত্ত¡াবধানে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। গত শুক্রবার দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই বেগম জিয়ার অবস্থা ‘সংকটময়’ বলে জানিয়েছেন। মূলত এরপর থেকেই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ‘উৎকণ্ঠা’ তৈরি হয়েছে। তাদের অনেককেই গভীর রাত পর্যন্ত হাসপাতালের সামনে দেখা গেছে। তবে দলের পক্ষ থেকে তার প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশবাসীর মাধ্যমে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া চেয়েছেন যেন তিনি দ্রæত আরোগ্যলাভ করেন। মেডিকেল বোর্ড-এর তত্ত্বাবধানে সিসিইউ-তে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকের তত্ত¡াবধানে চিকিৎসা হচ্ছে’। বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এদিকে বেগম জিয়ার গুরুতর অসুস্থতা ও জীবন-মৃত্যুর এ সন্ধিক্ষণে বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেশে ফিরবেন কি না, তা নিয়ে নতুনভাবে বিতর্ক ওঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এ অবস্থায় তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি সংবাদপত্রে প্রেরণ করা হয়। তাতে বলা হয়, ‘মমতাময়ী জন্মদাত্রীর শয্যাপাশে শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকলেও জনাব তারেক রহমানের মন সার্বক্ষণিকভাবে রয়েছে মায়ের পাশে। উদ্বিগ্ন মনে মায়ের অবস্থার উন্নতি অবনতির প্রতিটি মুহূর্তের সাথে রয়েছে তাঁর নিবিড় সংশ্লিষ্টতা। মেডিক্যাল বোর্ডের প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাঁর রয়েছে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ।
অপরদিকে তারেক রহমান তাঁর ভেরিফাইড ফেইসবুকে লিখেছেন, ‘এমন সঙ্কটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাবার তীব্র আকাক্সক্ষা যেকোন সন্তানের মত আমারও আছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মত সেটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাঁর একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত নয়। স্পর্শকাতর সেই বিষয় বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত’। তিনি আরো লিখেছেন, ‘রাজনৈতিক বাস্তবতার সেই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়া মাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী’। যাই হোক, বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের সিনিয়র সিটিজেন ও রাজনীতিক এবং তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া গুরুতর অসুস্থ। কিন্তু দেশের এক ক্রান্তিকালে তাঁর এ গুরুতর অসুস্থতা দেশের মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এ মুহূর্তে বেগম জিয়ার মত নেতৃত্ব দেশের স্বার্থে খুব বেশি প্রয়োজন। আমরা জানি, ২০০৬ সালে কথিত ওয়ান ইলাভেন এর সামরিক ছদ্মাবরণে এক সিভিল শাসনের নির্মমতার স্বীকার হয়েছিলেন বেগম জিয়া, শেখ হাসিনা ও তারেক রহমান। সেইসময় টুমাইনেস ফর্মুলার নামে দুই নেতাকে নির্বাসন দেয়ার চক্রান্তের কথা আমরা শুনেছি। এরপর রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা দায়ের করা হয়। বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে অন্তত তেরটি মামলার কথা শোনা গিয়েছিল। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা হলেও ২০০৮ সালে নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের পর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তাঁর সব মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় খারিজ হলেও বেগম জিয়াকে প্রায় চারটি মামলায় আটকে দেয়া হয়। এসময় বছরের পর বছর জেলে ও নিজের বাসভবনে বন্দি অবস্থায় দিন অতিবাহিত করেন বেগম জিয়া। ২০২৪ সালে অগাস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৬ অগাস্ট রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তাকে সব দন্ড থেকে পুরোপুরি মুক্তি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। দীর্ঘদিনের আওয়ামী অপশাসনের বিরুদ্ধে যে স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ গড়ে ওঠে, তার চাপে ক্ষমতা হারিয়ে দেশত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জনতার একক দাবিতে সবচেয়ে আগে মুক্তি পান কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, যাঁকে গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী হিসেবেই দেশবাসী দীর্ঘদিন ধরে চিনে এসেছে।
এই মুহূর্তে খালেদা জিয়ার সক্রিয় নেতৃত্ব বড় বেশি জরুরি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঠিক সেই সময়েই মারাত্মকভাবে অবনতি হয় তাঁর শারীরিক অবস্থার। দীর্ঘমেয়াদি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, লিভার সিরোসিস ও ফুসফুসের জটিলতা তাঁকে শয্যাশায়ী করে ফেলেছে। তবু তাঁর প্রতি মানুষের আবেগ, আনুগত্য ও শ্রদ্ধা বিশাল জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করেছে- এ যেন রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃশ্য।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবং জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পথে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ দেশের সামনে, তখন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মতো একজন অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় নেত্রীর রাজনৈতিক ভূমিকা অনস্বীকার্য। বেগম খালেদা জিয়া দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার জনগণের মাঝে ফিরে আসবেন এবং একটি নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণে তাঁর আদর্শিক ভূমিকা অব্যাহত রাখবেন-এমনটি প্রত্যাশা আমাদের।











