জাতীয় ঐক্য জরুরি

3

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘জাতীয় ঐক্য’ এমন এক শব্দ, যা প্রায় প্রতিটি যুগে বারবার উচ্চারিত হয়েছে-বিপ্লব, নির্বাচন বা রাষ্ট্রীয় সংকটের সময়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ঐক্য কি বাস্তবে কোনো জাতীয় শক্তিতে রূপ নিচ্ছে, নাকি এটি কেবল বক্তৃতার মঞ্চে, রাজনৈতিক প্রচারণার ব্যানারে কিংবা টকশোর আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ একটি স্লোগান।
পৃথিবীর ইতিহাসে যত গণবিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, তার প্রায় সবই কোনো না কোনো জাতীয় নেতার আহবানে সংঘটিত হয়েছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণবিপ্লব ছিল এক অভূতপূর্ব ও অবিশ্বাস্য ঘটনা-একটি নেতাহীন বিপ্লব, যা নিজস্ব শক্তিতে সফলতা অর্জন করেছে।
জাতীয় ঐক্য হলো একটি দেশের সকল নাগরিকের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে একতা, সংহতি ও ভ্রাতৃত্বের গভীর অনুভূতি। গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিগুলো তথা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যে অনৈক্য বিরাজ করছে, তার অবসান হওয়া জরুরি। তাদের এই অনৈক্য নানাভাবে প্রকাশ পাচ্ছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজপথেও গড়িয়েছে। বস্তুত ভোটের হিসাব-নিকাশ যত এগিয়ে আসছে, অনৈক্য ততই প্রকাশ্যে রূপ নিচ্ছে। এটি জনমনে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি করছে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় ইস্যুতে অনৈক্য কখনো কাম্য নয়। কারণ এর ফলে গণতন্ত্রের শত্রæরাই লাভবান হবে। ফ্যাসিবাদীদের পুনর্বাসনের পথ সহজ হবে। তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর অনৈক্যের সুযোগ নেবে সুযোগসন্ধানীরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের পতন সম্ভব হয়েছিল জনগণের সম্মিলিত আকাক্সক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ঐক্যের কারণে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে যে শক্তিগুলো সেদিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল, আজ তাদের মধ্যেই বিভেদ ও অনৈক্যের সুর তীব্র হচ্ছে। এই বিভেদ মিটিয়ে ফেলা দরকার।
ইতিহাস বলে, পারস্পরিক কোন্দল ও বিভাজন যে কোনো বড় অর্জনের পথকে বিপন্ন করে। গণ-অভ্যুত্থানের বিজয়ের পর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, একটি গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, যা এখনো বহুলাংশে অনিশ্চিত। এখন দরকার বাস্তব পদক্ষেপ ও সহনশীল মনোভাব।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণেও প্রধান উপদেষ্টা ঐক্যের আহবান জানিয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর এ মুহূর্তে একটিই লক্ষ্য থাকা উচিত, যা হলো জাতীয় নির্বাচন। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই পারে সব ধরনের গণতন্ত্রবিরোধী তৎপরতা রুখে দিতে।
যদি নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দলসমূহ ও জনগণ একসঙ্গে এই নৈতিক ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তবে জাতি তার হারানো আস্থা, আত্মমর্যাদা ও ন্যায়ের পথ ফিরে পাবে।