রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা রাজনীতির কঠিন চালের হিসেব করতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর জয়-পরাজয় নির্ধারণ করলেও বাস্তবে রাজনীতিবিদদের কঠিন চালে পর্যুদস্ত হয় দেশের সাধারণ জনগণ। কয়দিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে একটি নাটিকা দেখছিলাম। তাতে দেশের রাজনীতিবিদদের পারিবারিক অবস্থান ও সাধারণ কর্মী বা জনগণের অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। ক্ষমতার পালাবদল করতে গিয়ে হাজারো রাজনৈতিক কর্মী বা সাধারণ মানুষ নানাভাবে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হন। কিন্তু দল বা গোষ্ঠী যখন ক্ষমতায় যায় তখন সেই কর্মী ও জনগণকে ক্ষমতাবানরা তেমন আর চিনতে পারেন না। অতীতের কথা বাদ দিলেও আমরা বিগত বছরের গণ অভ্যুত্থানের কথা বলতে পারি। একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে রক্তঝরা আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের যে প্রত্যাশা তা কতটুকু পূরণ হয়েছে! এ অবস্থায় দেশের মানুষ এখন তিক্ত ও বিরক্ত-একথা বললে অত্যুক্তি হবে বলে মনে হয়না। গত ১৩ নভেম্বর বৃহস্পতিবার পতিত সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ‘লকডাউন’ কর্মসূচি পালন করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ। এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবারসহ গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতামূলক কর্মকান্ড, বিশেষ করে অগ্নিসংযোগ, যানবাহন পোড়ানো, ককটেল ফাটানো ও আতঙ্ক তৈরির ঘটনা ঘটেছে। বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এরই মধ্যে একজন নিহত হয়েছেন। বুধবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির উন্মুক্ত মঞ্চে যখন জুলাই বিপ্লবের ডকুমেন্টরি প্রদর্শন হচ্ছিল তখন কয়েকটা বোমা বিস্ফোরণ হতে দেখা গেছে। এতে অনুষ্ঠানটি পন্ড হয়ে গের আর এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহসহ কয়েকজনকে সাংবাদিকদের গাড়িতে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে দেখা গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ, র্যাবের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি কিন্তু লকডাউন কর্মসূচি একপ্রকার সফলভাবেই পালন করেছে। নানা ঘটনাপ্রবাহে পালিত এ লকডাউন দেশের রাজপথে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। আবারও সংঘাত ও সংঘর্ষেও রাজনীতির পদধ্বনি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। অপরদিকে সাধারণ মানুষ আবারও চরম নিরাপত্তা ও অস্বস্তিতে দিন কাটছে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় কবে হবে, সেটি ১৩ নভেম্বর নির্ধারণ করার কথা রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের। ট্রাইব্যুনাল গত ২৩ অক্টোবর এটি জানিয়েছিলেন। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঢাকা লকডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় এবং অনলাইনে ব্যাপকভাবে এই কর্মসূচির পক্ষে নানা রকম প্রচার চালানো হয়।
৮ নভেম্বর থেকে গত কয়েক দিনে ঢাকাসহ কিছু জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। গত সোমবার দিবাগত রাতে ময়মনসিংহে একটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়; এতে একজন মারা যান, দুজন গুরুতর আহত হন। এ ছাড়া ঢাকার একাধিক স্কুল এবং গ্রামীণ ব্যাংকে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এনসিপির কার্যালয় ও টিএসসিতেও ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এ উদ্ভুত পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়, রাস্তার মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসানো হয়। কিন্তু ককটেল নিক্ষেপ ও অগ্নি সংযোগের পর সরকারের অতি কড়াকড়িতে সাধারণ মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আমরা দেখেছি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ঠেকাতে ৯ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, লকডাউন ঠেকাতে সারা দেশে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের বেশ কিছু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সরকারের এসব অভিযান ও বিধিনিষেধের ফলে বুধবার রাত থেকে ঢাকার সড়কগুলোতে একধরনের নিস্তব্দতা চলে আসে। এখন অভিজ্ঞমহলের প্রশ্ন হচ্ছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা কোনো দল কীভাবে এমন কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারল? এই পরিস্থিতিতে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?
আমরা অতীতেও বলেছি, রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে সহিংস কার্যক্রম ও হুমকি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যেখানে অম্লধুর বহু অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে আমাদের। কিন্তু সহিংসতার মাধ্যমে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সংস্কৃতি যদি এখনো বজায় থাকে, তাহলে সেটা খুবই দুঃখজনক বিষয় হবে। সহিংস কর্মসূচিকে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। লকডাউন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, মানুষের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তা প্রশমনের দায়িত্ব সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। যারা অগ্নিসংযোগ বা ককটেল নিক্ষেপ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে নিরাপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন সেই দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে সরকারকে।











