জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে

7

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি এখন গলার কাঁটায় পরিনত হয়েছে। মানবিকতা দেখিয়ে বাংলাদেশের চরম মানবিক ও পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা নিয়ে গবেষণা করেন এমন একজন বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে লিখেছেন, রোহিঙ্গা সংকট যতই দিন যাচ্ছে ততই বাংলাদেশের জন্য একটার পর একটা সমস্যা সৃষ্টি করে চলছে। ক্যাম্পের চলমান অপরাধ কার্যক্রম, মানব পাচার, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, হত্যাকান্ড সংঘটিত করাসহ নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের সামাজিক, পরিবেশ এবং নিরাপত্তা হুমকির সৃষ্টি করছে। এর সাথে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার হওয়া তথা নাগরিকত্ব নেয়ার প্রবনতার খবরে স্বয়ং নির্বাচন কমিশন শঙ্কিত। তারা আশঙ্কা করছেন, বিভিন্ন জেলা উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া রোহিঙ্গারা নানা কৌশলে এবং দালালদের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা কাউন্সিলরদের প্রভাবিত করে ভোটার আইডি ও নাগরিকত্ব সনদ নিচ্ছে। গতকাল দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি ফটিকছড়িতে এক রোহিঙ্গা পরিবারের ভোটার হওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। জানা যায়, এক শ্রেণির দেশের স্বার্থ বিরোধী, অসাধু জনপ্রতিনিধি ও মানুষের যোগসাজসে রোহিঙ্গারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভোটার তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। তারা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশেও চলে যাচ্ছে যা আশঙ্কাজনক। কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোর নিবন্ধিত রোহিঙ্গারা বিভিন্ন উপায়ে বাংলাদেশের ভোটার হচ্ছে এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পেয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গারা যাতে ভোটার হতে না পারে সে জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও তা উপেক্ষা করে এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইসি’ও এখন উদ্বিগ্ন। রোহিঙ্গারা চট্টগ্রাম অঞ্চল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এই পরিচয়পত্র সংগ্রহ করছে।
মিয়ানমারে অত্যাচারের শিকার এই রোহিঙ্গারা দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছে এবং তাদের দেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে তারা কোন আশার আলো দেখছে না বিধায় অনেকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে স্থানীয়দের সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। অনেকে বিদেশে যাওয়ার জন্য সুযোগ পেলেই বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হলে স্থানীয় জনগণ এবং সমাজের সকল স্তরে দেশপ্রেম ও সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া কোন বিকল্প নেই। রোহিঙ্গাদের ভোটার হতে কেউ না কেউ সহযোগিতা করছে। কারণ, এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে জন্মসনদ ও চেয়ারম্যান-কাউন্সিলরের কাছ থেকে নাগরিক সনদ নিতে হয়। তাদের কারা, কেন, কীভাবে জন্ম ও নাগরিক সনদ এবং এনআইডি কার্ড সরবরাহ করছে সেটা খুঁজে বের করতে তদন্ত করা জরুরি।
আশার কথা, রোহিঙ্গাদের এনআইডি কার্ড সরবরাহ করছে সে বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে ইসি। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারি এবং কিছু প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির যোগসাজশে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা ভোটার হচ্ছে। সিন্ডিকেটটি রোহিঙ্গাদের জন্য ভোটার হতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির ব্যবস্থা করে। ইসির পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের বিশেষ ৩২ এলাকা ছাড়াও সারাদেশে রোহিঙ্গাদের ভোটার না করার ব্যাপারে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেয়া হয়। রোহিঙ্গারা নির্দেশনার বাইরের এলাকা থেকে বাংলাদেশি পরিচয়ে এখন ভোটার হচ্ছে, এতে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের ভোটার করতে এক থেকে দেড় লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে জানা যায়। রোহিঙ্গাদের এই অবৈধ সুযোগ দিয়ে সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতরা প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, যা উদ্বেগজনক। আমরা আশা করি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনায় জড়িত অপরাধী ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে দ্রæত বিচারের আওতায় নিয়ে আসবেন।
আমরা মনে করি, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বিষয়ক অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করতে প্রশাসনের সকল স্তরে এ বিষয়ে সচেতনতা ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকলে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাদের পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তাকারী সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশ একটা জনবহুল দেশ। রোহিঙ্গাদের মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। তা একেবারেই সাময়িক। বাংলাদেশের পক্ষে অনির্দিষ্টকাল এই সংকট টেনে নেয়া সম্ভব না। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ায় সৃষ্ট সমস্যা যেন বাংলাদেশের জন্য বোঝা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমরা মনে করি, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র সমাধান। এ বিষয়ে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদার হবে-এমনটি প্রত্যাশা দেশবাসীর।