চিকিৎসা পেশায় নারীরা

530

সম্প্রতি তেঁতুল হুজুর নামে পরিচয় পাওয়া মাওলানা শফি মেয়েদের বেশি না পড়ানোর ওয়াদা আদায় করেছিলেন এক মাহফিলে। পরে অবশ্য বরাবরের মতো বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানালেন, তাঁর বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আমরা জানি না আসল সত্য কোনটি ? পরের সপ্তাহে জুম্মা পড়ার জন্য স্থানীয় মসজিদে যাই। সে মসজিদে সম্প্রতি ইমাম সাহেবের খুতবার বাংলা তরজমা লিফলেট আকারে ছাপিয়ে মুসলিমদের সরবরাহ করা হয়ে থাকে। যাইহোক, সেদিনের খুতবার ইসলাম ধর্মে মুসলিম নারীদের শিক্ষাদীক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ প্রাধান্য পায়। ইমাম সাহেব কোরান ও হাদিসের সুত্র দিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা দেন। সেখানে একটি হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে জানান যে, মহানবী (স.) এরশাদ করেন, ‘জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন যাত্রা করো’। এখানে জ্ঞানার্জনের জন্য শুধু পুরুষ বা মেয়েদের কথা বলা হয়নি। আবার ইসলাম ধর্ম শিক্ষাগ্রহণে যথার্থ পর্দা পুশিদার কথা গুরুত্বের সাথে বলা হয়েছে। যেহেতু লজ্জা ইমানের অঙ্গ। তাই মুসলিম নারীদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে পর্দার গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইমমা সাহেব উক্ত খুদবায় আরও উল্লেখ করেন, আমাদের মাজহাবের ইমাম আবু হানিফা (র.) নারীদের চিকিৎসা বিজ্ঞান পাঠের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। যেহেতু সমাজে এখন নারী পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান সমান। নারীদের রোগ বালাই হলে তারা যেন নারী চিকিৎসকের কাছে স্মরণাপন্ন হতে পারেন এবং স্বাচ্ছন্দে তাদের সমস্যার কথা শেয়ার করতে সমর্থ হন। যেহেতু লজ্জাপ্রবণ এবং পর্দানশীল।
এখানে একটি বাস্তবতার কথা উল্লেখ করতে চাই। কিছুদিন আগে আমি বিশেষ প্রয়োজনে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে প্রায়শ ভ্রমণ করতে হয়েছে। অর্থাৎ আনোয়ারা, বোয়ালখালী, বাঁশখালী, পেকুয়া, কক্সবাজার, মহেশখালী, চকোরিয়া ইত্যাদি অঞ্চল। যেহেতু আমাকে কাজের উদ্দেশ্যে প্রায়শ সকালের দিকে যাত্রা করতে হয়। সে সময়টা ছাত্র-ছাত্রীদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময়। আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, ছেলে মেয়েরা লাইন ধরে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন প্রতিটি যাত্রায় দেখলাম, ছাত্রের চেয়ে মেয়েদের অর্থাৎ ছাত্রীর সংখ্যা বেশি। সেই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহর তলীর সর্বত্র। ওদিকের বেশির ভাগ ছাত্রীদের স্কুল ড্রেস হচ্ছে নীল কিম্বা খয়েরি। আমি ঘটনাটির সত্যতা যাচাই করার জন্য বাঁশখালী এবং পেকুয়ার দুটি স্কুলে দুই যাত্রা বিলম্ব করি। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের সময় দেখলাম ছাত্রীদের লাইন বা সারি অনেক দীর্ঘ ছেলেদের তুলনায়। আমি অবাক হয়ে গেলাম বাংলাদেশে নারী শিক্ষা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। আমাদের সময়ে ঝিয়েরা মেয়েদের স্কুলে আনা নেওয়া করতো। আর এখন মেয়েরা স্বাবলম্বী। তাঁরা নিজেরা দলবেঁধে স্কুলে আসা যাওয়া করছেন। সাবাস বাংলাদেশ।
সাম্প্রতিক এক তথ্যে দেখা যায় যে চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবার ক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যা পুরুষকে ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে মোট মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ১১১টি। তার মধ্যে সরকারি ৩৬টি, বেসরকারী ৬৯টি, আর্মি মেডিকেল কলেজ ৫টি, আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ ১টি। শুধু ছাত্রী ভর্তি করার জন্য রয়েছে ৫টি মেডিকেল কলেজ। উদাহরণত বলা যায়, জেডএইচ শিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ, উত্তরা উইমেন মেডিকেল কলেজ, কুমুদিনী মেডিকেল কলেজ, সিলেট উইমেন মেডিকেল কলেজ এবং আদ-দ্বীন উইমেন মেডিকেল কলেজ। নারী চিকিৎসকদের ৯৬ শতাংশের বিশেষ দক্ষতা স্ত্রী ও প্রসূতিরোগে। অন্য দিকে পুরুষ চিকিৎসকদের মেডিসেন ও সার্জারী বিষয়ে দক্ষতা বেশি। এক্ষেত্রেও নারীদের এগিয়ে আসতে হবে। নতুন স্বাস্থ্য জনশক্তি কর্মপরিকল্পনায় এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক। আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য হচ্ছে, এটাই চিকিৎসা শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার চিত্র। এ বছর দেশের মেডিকেল কলেজগুলোতে ১০ হাজার ২২৩ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। তাদের প্রায় ৬০ শতাংশ ছাত্রী এবং বাকী ৪০ শতাংশ ছাত্র। তথ্য বলছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের চলতি শিক্ষাবর্ষে ২২০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৩৬ জন ছাত্রী এবং ৮৪ জন ছাত্র। গত ১০ বছরের চিত্র হলো পুরুষের তুলনায় এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জনকারী নারীর সংখ্যাও প্রায় ৩ হাজার বেশি।
তথ্যানুযায়ী ২০০৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মেডিকেল কলেজে ভর্তি ও এমবিবিএস পাশের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মেডিকেলে এখন ছাত্রী ভর্তি বেশি হচ্ছে। আবার ছাত্রীরা পাশও করছেন বেশি। সংশ্লিষ্ট ও নীতিনির্ধারকদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এই পরিবর্তন ও প্রভাবের প্রতি দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক। এটা একটা গুণগত পরিবর্তন। ( প্রথশ আলো ১৮ জানুয়ারি ২০১৯)। এখন এমবিবিএস পরীক্ষা পাশের ক্ষেত্রে ছাত্রীরা শুধু সংখ্যায় বেশি তাই নয়, শীর্ষ স্থানগুলোও তারা দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করা শীর্ষ ১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮ জনই ঢাকা মেডিকেল কলেজের। ঢাকা মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষের বরাতে জানা যায় যে, ৮ জনের মধ্যে ৭ জনই ছাত্রী। তাঁর মতে এই ধারা বেশ কয়েক বছর ধরে চলছে।
২০০৭ সাল থেকে মেডিকেলে ভর্তির ক্ষেত্রে ছাত্রীদের সংখ্যা ছাত্রদের তুলনায় বাড়ছে। তখন শিক্ষাবর্ষে ছাত্রী ও ছাত্রের হার ছিল যথাক্রমে ৫১ ও ৪৯ শতাংশ। আর বর্তমান শিক্ষাবর্ষে তা দাঁড়ায় ৬০ ও ৪০ শতাংশে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এর তথ্যে দেখা যায় গত দশ বছরে (২০০৭-২০১৭) মেডিকেল কলেজগুলো থেকে ৩৯ হাজার ২৮৫ জন বাংলাদেশি এমবিবিএস ডিগ্রী পাশ করেন। তাদের মধ্যে ২১ হাজার ১২৩ জন ছাত্রী এবং ১৮ হাজার ১৬২ জন ছাত্র। অর্থাৎ পুরুষের চেয়ে দুই হাজার ৯৬১ জন নারী চিকিৎসক হিসাবে ডিগ্রী নিয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, আগামী বছরগুলোতে এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৬-২০২৭ সাল নাগাদ প্রতি বছর পুরুষ চিকিৎসকের দ্বিগুণ নারী চিকিৎসক ডিগ্রী নিয়ে বের হবেন।
মেডিকেল কলেজে নারীরা কেন বেশি ভর্তি হয় ? এ ধরনের এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ জানান, মেধার জোরে মেয়েরা বেশি সংখ্যায় ভর্তি হচ্ছেন। এবং বেশি হারে পাশ করে বেরুচ্ছেন। প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার ভিত্তিতে জাতীয় মেধাক্রম তৈরী হচ্ছে। এই মেধাক্রমে ছাত্রীদের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। এছাড়া যে পাঁচটি বেসরকারি কলেজে শুধু মাত্র ছাত্রী ভর্তি করা হয়, সেখানে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ জন ছাত্রী ভর্তি হয়ে থাকে। ছাত্রী ভর্তির হার বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটিও একটি কারণ।
এক গবেষণায় দেখা যায় যে, ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) নিবন্ধিত ৩৪ হাজার ৬৯৭ জন চিকিৎসকের মধ্যে ৪৮ শতাংশ পুরুষ এবং ৫২ শতাংশ নারী চিকিৎসক। গবেষণায় দেখা যায় যে, এমবিবিএস সরকারি মেডিকেলের ২০৭ জন এবং বেসরকারি মেডিকেলের ১০৭ জন ছাত্রী উপর জরিপ চালানো হয়। জরিপে অংশ নেওয়া ছাত্রীদের ৯৩ শতাংশ ছিলেন শহরের। ছাত্রীদের ৯৪ শতাংশ বলেছিলেন, সামাজিক মর্যাদার কারণে তারা চিকিৎসাকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন। তাঁদের ৪২ শতাংশ এও বলেন যে, এই পেশা বেছে নেওয়ার পেছনে মা-বাবার চাপ ছিল। ১৭ শতাংশ অবশ্য বলেছেন, আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বিয়ের বাজারে এই পেশার দাম আছে। তবে গবেষকদের সাথে দলগত আলোচনায় ছাত্রীরা পেশা চর্চার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন। তারা বলেন বিয়ের পর পরিস্থিতি নাটকীয় ভাবে পাল্টে যায়। স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মনে করেন, চিকিৎসা পেশা চর্চার চেয়ে পারিবারিক দায়িত্ব পালন অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
আবার প্রায় সব ছাত্রী চিকিৎসা পেশায় কিছু বৈষম্যের কথাও উল্লেখ করেছেন। তারা পর্যবেক্ষণে দেখেছেন, রোগীদের একটি ধারণা আছে যে, নারী চিকিৎসকদের তুলনায় পুরুষ চিকিৎসক অনেক বেশি দক্ষ। এমন কি প্রতিযোগিতামূলক পড়া লেখায় পিছিয়ে থাকা পুরুষ সহকর্মীরাও মনে করেন, নারী চিকিৎসকরা তুলনামূলকভাবে কম সফল। আমাদের সামাজিক অবস্থা এবং নারীদের দৃঢ়তার অভাবে এধরনের ধারনার বিকাশ বলে অনেকে মনে করেন। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার একটি সমস্যা বিদ্যমান। যার ফলে অধিকাংশ নারী চিকিৎসক শহর বা শহরতলী কর্মক্ষেত্রকে বেশি পছন্দ করে থাকেন। সরকারি চাকুরি হলেও তারা শহরে থাকতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে থাকেন এবং চেষ্টাও করেন শহর বা শহরতলীতে পোস্টিং নেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। গ্রামে আবাসন, নিরাপত্তা ও সামাজিক আচরণ নারীদের জন্য অনুক‚ল নয়। যার প্রেক্ষিতে অনেকে চিকিৎসা বিষয়ে পড়াশোনার পর চিকিৎসা পেশা থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েন বা ছেড়ে দেন। তাই যে হারে ছাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে সে হারে নারী চিকিৎসক নাও বাড়তে পারে। প্রতিবেশি দেশে ভারতে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
তবে মেডিকেল শিক্ষা ও পেশায় নারীদের এই আধিক্যকে সুশীল সমাজ ইতিবাচক বলে মনে করেন। এটা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। মেডিকেল শিক্ষা ও পেশা চর্চার ক্ষেত্রে মেয়েরা অনেক বেশি নিবেদিতচিত্ত ও আন্তরিক। পরিবারের অনেক দায়িত্ব পালন শেষে তাঁরা ক্লাশে আসেন কিংবা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন। কাজে ফাঁকি দেয়ার অভ্যাস তাঁদের কম। বর্তমানে সমাজে মেয়েদের চিকিৎসা পেশায় আসার জন্য অনেকে উৎসাহিত করে থাকেন। আমরাও চাই মেয়েরা চিকিৎসা পেশায় আরও বেশি পরিমাণে এসে দেশ ও জাতির সেবায় নিজেদের নিবেদিত রাখুক।
সর্বশেষে বলা যায় চিকিৎসা পেশায় নারীর সংখ্যা বাড়ছে এটা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে বেশি সংখ্যক নারীদের এই পেশায় সম্পৃক্ত করার জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও অবকাঠামো আমাদের গড়ে তুলতে হবে। দেশের প্রায় ১ কোটি রোগী চিকিৎসার জন্য ভারত সহ অন্যান্য দেশে প্রতিদিন পাড়ি জমাচ্ছে। আমাদের দক্ষ ও উন্নত চিকিৎসক সৃষ্টির বিকল্প নেই। ভারতের প্রায় সকর বেসরকারী হাসপাতালগুলি বাংলাদেশি রোগীদের উপর নির্ভরশীল। তাই দেশে চিকিৎসা পেশায় উন্নতর ডিগ্রী অর্জনের জন্য এবং উন্নতর সেবা প্রদানের জন্য আমাদের নীতি নির্ধারকদের নজর দেয়া অতি জরুরী। বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার জন্য রোগীর গমনের সাথে সাথে চলে যাচ্ছে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা। আর যদি আমরা দক্ষ চিকিৎসক এবং উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে পারি তবে এখানে বৈদেশিক মুদ্রা আসার সম্ভাবনা প্রচুর। তাই চিকিৎসা পেশায় নারীদের আগমনকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

লেখক : কবি, নিসর্গী ও ব্যাংক নির্বাহী (অব.)