চালকরা মানবে না, মানাতে হবে

8

সড়ক দুর্ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে বহুল আলোচিত বিষয়। দেশের সড়কে বহু মূল্যবান প্রাণ অকালে ঝরে গেছে। সড়কে গাড়ির ড্রাইভাররা বে-পরোয়া। যেমন খুশি দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানো আর ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন চালকদের বদঅভ্যাসে পরিণত। লাগামহীন তাদের স্বভাব। অবশেষে দেশের সড়কে গাড়ি চালানোর গতিসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সড়ক যোগাযোগে চালকদের বেপরোয়া কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ট্রাফিক বিভাগ বরাবরই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। পরিবহন চালক-শ্রমিকরা সরকারি কোন নির্দেশই মানতে দেখা যায়নি। যাত্রীসাধারণ মনে করছে গাড়ির গতি নির্ধারণের ফলটাও হতে পারে ‘যথাপূর্বং তথাপরং’। আইন মানতে কঠোর হাতে বাধ্য করা ছাড়া এদের জন্য কোনও বিকল্প নেই।
গত এক যুগে দেশের সড়ক যোগাযোগ খাতে আমূল পরিবর্তন হলেও চালক-শ্রমিকদের মানসিকতা পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভ্রাম্যমাণ আদালত, হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশ যতটুকু পারছে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আবার গত বুধবার বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার স্বাক্ষরিত ‘মোটরযানের গতিসীমা সংক্রান্ত নির্দেশিকা ২০২৪’ জারি করা হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এ গতিসীমা কতটুকু মানবে চালকরা?
তবে বিআরটিএ বলছে, দেশে উন্নত যোগাযোগ নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি ঘটেছে। ফলে সড়ক-মহাসড়কে যাত্রী ও পণ্যবাহী দ্রæতগতির পরিবহনের সংখ্যাও দ্রæত বাড়ছে। এতে প্রায়শই অনাকাক্সিক্ষত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়াভাবে মোটরযান চালানোই বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ। গত শুক্রবার নগরীর বেশ কয়েকজন চালক ও পরিবহন নেতাদের সাথে কথা বলে নানা তথ্য পাওয়া যায়। অপরদিকে বিআরটিএ বলছে, এটি ব্যাপকভাবে বাস্তবায়নে সময় লাগবে। নতুন নির্দেশিকা সম্পর্কে জনগণকে জানানোর জন্য প্রচারণা কর্মসূচি চালানো হবে। এই অন্তর্র্বর্তী সময়কালে গতিসীমা লঙ্ঘন প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবহার করা হবে। এর উদ্দেশ্য চালকদের নতুন গতিসীমা সম্পর্কে জানানো।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারাদেশে বহু নতুন সড়ক যেমন নির্মাণ হয়েছে, আবার পুরোনো অনেক সড়ক সংস্কারও করা হয়েছে। ফলে দেশের যে কোনো প্রান্তে চলাচলের ক্ষেত্রে এখন সড়কের দুর্ভোগ অপেক্ষাকৃত অনেকটাই কমে এসেছে। এতে জনমনেও ফিরেছে স্বস্তি। তবে সড়ক যোগাযোগে দৃশ্যমান অনেক অগ্রগতি হলেও এ খাতের অব্যবস্থাপনা এখনো রয়ে গেছে। ব্যবস্থাপনাগত ত্রæটি কাটাতে বা সড়ক আইনের যথাযথ বাস্তবায়নে নেই পরিকল্পিত উদ্যোগও। প্রতিনিয়ত যার প্রতিফলন ঘটছে সড়কপথে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে মানুষ। প্রতিদিনই সড়কে ঝরছে প্রাণ। বাংলাদেশ যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দীন চৌধুরী পূর্বদেশকে বলেন, নতুন এ নীতিমালা উপযুক্ত হয়েছে বলে আমি মনে করি না। মহাসড়কে বাসের গতির চেয়েও মোটরসাইকেলের গতি কমিয়ে আনা হয়েছে। এতে দুর্ঘটনা আরও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। দেশের সব শহরকে একই গতিসীমার মধ্যে আনা হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরে যানবাহনের গতি আর ঢাকা শহরের যানবাহনের গতি এক নয়। এটি একটি আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত, কারিগরি সিদ্ধান্ত নয় বলে আমরা মনে করি। দেখুন, এক মন্ত্রণালয় মোটরসাইকেলের সিসি বাড়াচ্ছে। অন্য মন্ত্রণালয় ৩০ কিলোমিটার গতিতে চালাতে বলছে। এতে বোঝা যায়, নিজেদের মধ্যে সমন্বয় নেই। একই লেনে যদি সব ধরনের যানবাহন চলে, তা হলে কোনোভাবেই যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। গতিসীমা ঠিক করার উদ্দেশ্য হলো সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো। কিন্তু যেভাবে গতি নির্ধারণ হয়েছে, তা মোটেই বিজ্ঞানসম্মত নয়, তেমনি অবকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটা মানানো যাবে না। এতে সড়কে আরও বেশি বিশৃঙ্খলা বাড়বে। মামলা বাড়বে। কারণ একই লেনে সব ধরনের যানবাহন চললে দুর্ঘটনাও বাড়বে।
বাস চালকরা বলে- ‘দেশে আইন হয় ঠিকই, কিন্তু তার বাস্তবায়ন হতে সময় লাগে। বিআরটিএ ও পুলিশ কয়জনকেই বা আটকাতে পারে? আর যারা ক্ষমতাশীল, তারাই বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। আমাদেরকে যদি নির্দেশনার বিষয়ে জানানো হয়, তবে আমরা তা শতভাগ মেনে চলব।’ নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, দেশের এক্সপ্রেসওয়ে, মহাসড়কে যানবাহন চলাচলের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার আর নগর-মহানগরে সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ৪০ কিলোমিটার। জাতীয় মহাসড়কে (ক্যাটাগরি ‘এ’) প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস, মিনিবাসসহ অন্য হালকা যানবাহনগুলোর সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করতে পারবে। সেসব সড়কে ট্রাক, মোটরসাইকেল এবং আর্টিকুলেটেড লরির গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার। একই সঙ্গে জাতীয় সড়কে (ক্যাটাগরি ‘বি’) প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস ও মিনিবাসের গতিবেগ হবে ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার। আর মোটরসাইকেলের জন্য ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার এবং ট্রাক ও আর্টিকুলেটেড লরি চলবে ৪৫ কিলোমিটার গতিতে। পাশাপাশি আন্তঃজেলা সড়কে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস ও মিনিবাসের ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার, মোটরসাইকেল ৫০ কিলোমিটার এবং ট্রাক ও আর্টিকুলেটেড লরি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪৫ কিলোমিটার গতিবেগে চলতে পারবে।
এছাড়া সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও জেলা শহরের ভেতরের রাস্তায় প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, বাস ও মিনিবাসের সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার এবং ট্রাক, মোটরসাইকেল ও আর্টিকুলেটেড লরির গতিসীমা হবে ৩০ কিলোমিটার। ওই নির্দেশনায় উপজেলা ও গ্রামের রাস্তার গতিসীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার ও আবাসিক এলাকার কাছাকাছি সড়কে যানবাহনের গতিসীমা নির্ধারণ করবে স্থানীয় প্রশাসন। তা কোনোভাবেই জাতীয় মহাসড়কের ক্ষেত্রে ৪০ কিলোমিটার এবং আঞ্চলিক মহাসড়কের ক্ষেত্রে ৩০ কিলোমিটারের বেশি হবে না। তবে অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি পরিসেবায় নিয়োজিত যানবাহনের গতিসীমা এক্ষেত্রে শিথিল থাকবে।
আসল কথা হচ্ছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, ট্রাফিক বিভাগ, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্টদের আইনটি যথাযথ কার্যকর করা সম্ভব হলেই নতুন আইন বাস্তবায়িত হবে এমন ধারণা দেশের যাত্রীসাধারণের। সংশ্লিষ্টদে দুর্নীতি দমনের মাধ্যমে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই হবে।