চন্দনাইশ শঙ্খ নদীর বুকে জেগে উঠছে অজস্র চর

134

দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৮টি উপজেলায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় অধিকাংশ নদ-নদী অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, আনোয়ারা, বোয়ালখালী, পটিয়া, কর্ণফুলী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালীর ১৫টি খর¯্রােতা নদী তার শাখা-প্রশাখাসহ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। প্রতি বর্ষা মৌসুম শেষ হতেই পাহাড়ি ঢলে পলিমাটি এসে নদী ভরাট হয়ে যায়। নদীমাতৃক বাংলাদেশে যাতায়াত ও পণ্য বহনের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, পটিয়া, কর্ণফুলী, বাঁশখালী, আনোয়ারা এ সকল উপজেলার মানুষ নদী পথে বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করত নৌপথে। কালের বিবর্তনে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন ঘটায় এখন সে চিত্র আর চোখে পড়ে না। তাপরও নদীমাতৃক এদেশে চন্দনাইশের শঙ্খ নদীতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ড্রেজিং ব্যবস্থা চালু না থাকায় অসংখ্য চর-ডুবোচর শঙ্খ নদীতে। এ সকল নদীর পাশে কৃষি কাজে ব্যবহৃত কিটনাশক মিশ্রিত পানিগুলো কোথাও যেতে না পারায় হারিয়ে গেছে মিটা পানির ১৫/১৬ প্রজাতির মাছ। নদীতে ড্রেজিং, পানি প্রবাহে বাঁধা, অপরিকল্পিত রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, যত্রতত্র মাটি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করার ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকা করছে পরিবেশবাদীরা। তাছাড়া জীববৈচিত্রেও নানা বিপর্যয়ের মুখে ধাবিত হচ্ছে। পানি সরবরাহ বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসহ জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য জরুরী ভিত্তিতে প্রকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরী বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেন। নদীমাতৃক বাংলাদেশে যাতায়াত ও পণ্য বহনের প্রধান নৌপথ আর নেই। নদী পথে চলাচলের সময় নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছিল ব্যবসায়িক মোকাম, পত্তন ঘটে শহরের। এদেশের প্রায় প্রতিটি বড় শহরই কোন না কোন নদীর তীরে অবস্থিত। বড় নদীর সাথে যেমন ছিল বহু বিচিত্র মনোহর নামের শাখা, উপনদীর সংযোগ, তেমনি ছিল অসংখ্য, খাল, হাউর-বাউর, বিল-ঝিল। খাল ও বিলের সাথে নদীর যোগ ছিল। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে এখনো নদীর সংখ্যা ৭শ’র অধিক। অতীতে আমাদের ছোট-বড় মিলে নদী ছিল আরো অনেক বেশি। নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার। অপরিকল্পিত নগরায়ন, নির্বিচারে পাহাড় কর্তনসহ বিভিন্ন কারণে মারাত্মক নাব্যতা সংকটে পড়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শঙ্খ নদী। বান্দরবান পার্বত্য জেলা থেকে শুরু হয়ে বয়ে যাওয়া শঙ্খ নদীর বুকজুড়ে এখন অসংখ্য চর-ডুবোচর। ফলে ভয়াবহ দূষণসহ নানা ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বদলে গেছে নদীর প্রাকৃতিক রূপ। হারিয়ে যাচ্ছে শংখনদী কেন্দ্রিক নানা জৈববৈচিত্র্য। সংকটে পড়েছে নদীপথে ব্যবসা-বাণিজ্য, বেকার হয়ে পড়েছে জেলেসহ কয়েক হাজার মানুষ। নাব্যতা সংকটের কারণে শঙ্খ নদী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির সুস্বাদু মাছ। জানা যায়, বান্দরবান পার্বত্য জেলার গহীন অরণ্য পাহাড়ি উপজেলা থানছির মুরুং সম্প্রদায় অধ্যুষিত রেমাক্রি এলাকায় প্রায় আড়াই হাজার ফুট উঁচু প্রবাহমান ঝর্ণাধারা থেকে এ শঙ্খ নদীর যাত্রা শুরু হয়। উৎপত্তি স্থলে একটি ডিঙি নৌকা চলাচলের সমপরিমাণ পানির দ্বারা প্রবাহিত হলেও ধীরে ধীরে সর্র্পিল গতিতে উঁচু-নিচু অসংখ্য পাহাড়ি বুক ছিড়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এ শঙ্খ নদী মিলিত হয়েছে চাঁনখালী নদীর সাথে। প্রমত্ত¡া এ শঙ্খ নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় নৌ চলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। নদীতে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর-ডুবোচর। নদীর মাঝে জেগে উঠা বিশাল আকৃতির চরে গ্রামের কিশোরেরা খেলায় মেতে উঠে প্রতিদিন। একটি প্রভাবশালী মহল শঙ্খ ব্রিজের দু’পাশে ড্রেজার বসিয়ে স্কেভেটরের মাধ্যমে অবৈধভাবে নির্বিচারে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে। এতে নদী তার অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দেখার যেন কেউ নাই। আবার অনেকে নদীর বুকে আবাদ করছে নানান জাতের সবজি। ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি সেচ বিপর্যয়সহ নদীপথে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজ সংকটাপন্ন। ইতিমধ্যে বালির আস্তরণে ঢাকা পড়েছে নদীর তীরবর্তী অনেক ফসলি জমি। বেকার হয়ে পড়েছে জেলে, নৌকার মাঝিসহ কয়েক হাজার মানুষ। শঙ্খ নদীর তীরবর্তী বাসিন্দারা জানালেন, শঙ্খকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনেক হাট-বাজার, জনবসতি। শুধুমাত্র নদীকে ঘিরে চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী ছাড়াও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অনেক হাট-বাজার। এক সময় শঙ্খ নদী দিয়ে নৌকা ও ইঞ্জিন চালিত বোটের মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামের হাট-বাজার ও বান্দরবানের ব্যবসায়ীদের মালামাল নৌ-পরিহনে যেত চট্টগ্রামে। সে সাথে বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকা ও শঙ্খ নদীর তীরবর্তী এলাকার উৎপাদিত মৌসুমী শাকসবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন পণ্য নৌপথে যাতায়াত করত। যা সড়ক পথে বহন করতে খরচের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যেত। তাছাড়া শঙ্খ নদীর দু’পাড়ে গড়ে উঠেছে অনেক জেলে পল্লী। যারা মাছ ধরে তাদের জীবিকা নির্বাহ করত। শঙ্খ নদীর নাব্যতা সংকটের ফলে প্রতি বছর এ মৌসুমে জেলে ও বোট চালকেরা বেকার হয়ে পড়ে। তাদের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। বিগত কয়েক যুগ ধরে রাক্ষুসী শঙ্খ নদীর করালগ্রাসে নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে কয়েক হাজার পরিবার। এখন শঙ্খ নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় নৌ চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। স্থানীয়দের মতে শঙ্খ নদীতে এক সময় তিন হাজারের অধিক নৌকা ও ইঞ্জিন চালিত বোট চালিয়ে ৫ হাজার লোকের সংসার চলত। এছাড়া নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত অনেক জেলে পরিবার। নদীতে পানি কমে যাওয়ায় আগের মত মাছ ধরতে পারছে না জেলেরা। বেকার হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। নদীর পানির সাথে সম্পৃক্ত এসব পরিবারগুলো বর্তমানে খুব কষ্টে দিনযাপন করছে। পটিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ জানান, পাহাড়ি ঢল ও নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনের ফলে ভরাট হয়ে গেছে শঙ্খ নদী। নদীর বুকে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। কিন্তু নদী ড্রেজিং করার মত কোন প্রকল্প তাদের হাতে নাই। সে ধরনের কোন পরিকল্পনাও নাই। কারণ নদীর ড্রেজিং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ জন্য সরকারেরও এ ধরনের কোন পরিকল্পনা নাই বলে তিনি জানান। সে হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন ড্রেজিং এর উদ্যোগ নেয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের শঙ্খ নদী তীরবর্তী অঞ্চলে শীতকালীন সবজি চাষ বিলম্বিত হয়ে পড়েছে। শঙ্খনদীর তীরবর্তী এলাকার বেশিরভাগ সময় শীতকালীন শাকসবজির জন্য অত্যন্ত উপযোগী স্থান। এখানকার উৎপাদিত শাকসবজি দক্ষিণ চট্টগ্রামের চাহিদা পূরণসহ চট্টগ্রাম শহরের চাহিদা পূরণ করে থাকে। কয়েক বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাবের কারণে বর্ষাকাল শেষে হেমন্তে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সবজি উৎপাদনও পিছিয়ে পড়েছে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি না থাকার কারণে কৃষকেরা সবজি চাষে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বলে জানান। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোশারফ হোসাইন বলেছেন, জলবায়ু প্রভাবের কারনে সময়মত বৃষ্টি হচ্ছে না। আবার একসময় অতিরিক্ত বৃষ্টির কারনে দেশের জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। এখন গবেষণা করে বের করতে হবে, কখন বৃষ্টি হবে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। সে পরিকল্পনা কৃষকদের মাঝে পৌঁছে দিতে হবে। অন্যথায় দেশের কৃষক সমাজ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ফসল উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিবে। সময়মত বৃষ্টি না হওয়ার কারনে রোগবালাই বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি মশা ও বিভিন্ন জাতীয় প্রাণি, উদ্ভিদ জন্মাবে। এদের প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে। ফলে দেশের স্বাভাবিক প্রাণি ও উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এ ধরনের আবাহাওয়ার সাথে আমাদের দেশের মানুষ অভ্যস্ত নয়। ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সরকারের সদিচ্ছার কারনে এ বিষয়ে বার বার সচেতনতা মূলক কাজ করে যাচ্ছে। এক সময় আমাদের দেশে একাশি বা আকাশমণি গাছকে যে সকল জায়গায় উদ্ভিদ জন্মাত না সেখানে চাষ করা হত। এখন তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারনে যেখানে আকাশমণি গাছের বিচি পড়ছে সেখানে গাছ উঠছে। এ সকল গাছ প্রাধান্য বিস্তার করবে। ফলে আমাদের দেশের সেগুন, গামারী, গর্জনসহ আবহাওয়ার সাথে সম্পৃক্ত উদ্ভিদ দিন দিন বিলুপ্ত হবে। এর প্রভাব পড়বে আমাদের জীব বৈচিত্রের উপর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আল আমিন বলেছেন, এক সময় পাশ্ববর্তী ভারত, চাইনাতে কার্বন নিঃস্বরন হত। পরবর্তীতে আমেরিকা, ইউরোপ উন্নত দেশগুলোতে কার্বন নিঃস্বরনের প্রভাব আমাদের দেশে আসার কারনে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। ষড়ঋতুর দেশ হিসেবে বাংলাদেশে আর সময়মত বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারনে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি। এ আবহাওয়ার সাথে আমাদের এলাকার মানুষ অভ্যস্ত নয় বিধায় রোগবালাই বাড়ছে। এক সময় নিয়মানুযায়ী বৃষ্টিপাত হওয়ার কারনে জলাবদ্ধতা হত না। এখন যে সময় বৃষ্টি হওয়ার কথা, সে সময় হচ্ছে না। আবার এক সময় যা বৃষ্টি হওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি বৃষ্টি হবে। ৩-৪ ঘন্টা মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ার কারনে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে। পরিবেশের উপর প্রভাব পড়বে। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য আবহাওয়াবিদ ও বিজ্ঞানীদের পূর্ব থেকে পরিকল্পনা গ্রহণ করে যথাযথ স্থানে উপস্থাপন করতে হবে। সে অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।