চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় লেখক পরিষদ এর মনোরম আয়োজন

1

সুপ্রতিম বড়ুয়া

বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে যখন অশ্বারোহণের মতো সোনালি দিনগুলো অবদমিত হচ্ছিল, তখন নভেম্বর এর ২১ এবং ২২ তারিখ সারাদেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এবং নবীন কবি, লেখক, আবৃত্তিকার এবং গবেষকবৃন্দ উপস্থিত হন চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে। সে দুদিন ছিল চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউট ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। নতুন লেখক সংগঠন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় লেখক পরিষদ ছিল এই মনোরম আয়োজন এর আয়োজক। শিশুসাহিত্যিক সাংবাদিক সংগঠক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী রাশেদ রউফ এর নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যিক গবেষক নিয়ে এই সংগঠনটি যাত্রা শুরু হয়। এই দুই দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য প্রেমিকদের এক একটি পদচারণা যেন ছন্দ সুরের মূর্ছনা সৃষ্টি করেছিল। যেখানে কবিরা আবৃত্তি করছেন তাঁদের কবিতা; কেউ কেউ পাঠ করছেন নিজের সৃষ্ট কবিতার ব্যঞ্জনা, এর মাঝে কিছু আলোচনা, চিন্তা-ভাবনা, এবং বক্তব্য- সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক নান্দনিক সাহিত্য পরিবেশ। প্রথম দিনের অনুষ্ঠানটি তিনটি পর্বে বিভক্ত ছিল সকালের পর্বে ছিল লেখক প্রশিক্ষণ কর্মশালা যেখানে প্রশিক্ষক হিসাবে ছিলেন সাহিত্যিক প্রফেসর ড. মোহীত উল আলম, কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী, কবি ওমর কায়সার এবং ভ্রমণ সাহিত্যিক সেলিম সোলায়মান। একশত জন প্রশিক্ষণার্থী এই প্রশিক্ষণে উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনার এর সকল আলোচক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন এই লেখক সংগঠন যেন আরও অর্থবহ হয়ে উঠে এবং সাহিত্যঙ্গনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম যেন বিশ্বে ছড়িয়ে যায়। পুরো অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক আয়শা হক সিমু এবং শিশুসাহিত্যিক সাংবাদিক সংগঠক রাশেদ রউফ ছিলেন এক কথায় অসাধারণ। তাঁর নিপুণ হাতে ধারণ করেছিলেন সমগ্র আয়োজনটি। আয়োজনে কবিতা আবৃত্তি মিলেমিশে এক অপরূপ দৃশ্যের রচনা করেছিল। কবিরা তাদের স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছেন, যেটি অবিস্মরণীয় এক অনুভূতি সৃষ্টি করছিল। মাঝে মাঝে আলোচনা দিকনির্দেশনা আর আবৃত্তি সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে আগ্রহ জাগিয়েছে। অনুষ্ঠানে আনন্দ, ভালোবাসা এবং প্যাশনের এক অপূর্ব মিলনমেলা সৃষ্টি হয়েছিল। সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতায় আমি বিমোহিত হয়েছিলাম। তাদের সঙ্গে কাটানো সময় সত্যিই আমার লেখালেখির যাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে থাকবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য গুণীজন আমাদের মাঝে ছিলেন সেদিন। ঢাকা, রাজশাহী, ফরিদপুর, বগুড়া, নওগাঁ, সিলেট, দিনাজপুর, কুমিল্লা আরও অসংখ্য জেলার যাঁরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছিলেন তাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁদের শিল্পের মহিমা নিয়ে। দেশ বিদেশ থেকে আগত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন পড়ু লেখক, কবি ও সাংবাদিকরাও ছিলেন এই অনন্য সম্মেলনের অংশ হিসাবে। তাদের উপস্থিতি যেন সাহিত্যকর্মের বহুমাত্রিকতার পরিচয় তুলে ধরেছিল।বক্তব্যে তাদের চিন্তা ও যুক্তিবাদ যেন এক সেতুবন্ধন রচনা করেছিল, যা দেশের সাহিত্যাঙ্গনকে এক নতুন দৃষ্টিকোণে দেখতে সাহায্য করেছিল। কবি কণ্ঠে স্বরচিত কবিতার পাঠ, আলোচনা- সব কিছু মিলিয়ে এক অসাধারণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল দুই দিন। কবি আড্ডা ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় লেখক পরিষদ এর মহোৎসবের প্রাণভোমরা। এই আড্ডায় সবার মধ্যে যে বিশাল একটি সৃষ্টিশীল আলোচনার সেতুবন্ধন বয়ে চলেছিল, তা সত্যিই হৃদয়গ্রাহী। এই সুন্দর মিলনমেলায় সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষের সঙ্গে আলাপ করে হৃদয়ে এক অভ‚তপূর্ব অনুরণন বয়ে গেছে আমার। আসলে, সাহিত্য মানে শুধু লেখালেখি নয়, এটি মানুষের অন্তরের ভাষা।দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠান তারই নিখুঁত উদাহরণ। এই আনন্দ, ভালোবাসা এবং শক্তিশালী সৃষ্টিশীলতার মেলায় আলাপচারিতায় কাটানো সময়গুলো অত্যন্ত মূল্যবান। সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষের সঙ্গে আন্তরিক আলাপ করে মনে হলো, আমাদের জীবনের এই পর্যায়টি শুধু একটি মিলনমেলা নয়, বরং সভ্যতার যোগাযোগের একটি চিত্র। আশা করি, এই বন্ধন বজায় থাকবে এবং ভবিষ্যতে আরও উজ্জ্বল সৃষ্টির পথে এগিয়ে যাবে। প্রশিক্ষণার্থীরা ভাবছেন কবি ও লেখক পরিচয়ে সনদ পাওয়া যেন নিজেকে যেন আকাশে উড়তে লাগা। জীবনের প্রথম লেখক সনদ যেন তাঁদের শ্রম ও অধ্যবসায়ের এক স্বীকৃতি। অনেকেই বলেন, ‘পুরস্কার নয়, তারা ভালোবাসা চান।’ কিন্তু আমি মনে করি, তাঁদের পুরস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- এটি তাঁদের কাজের মর্যাদা ও স্বীকৃতির পরিচায়ক। পুরস্কার নতুন নতুন কাজের জন্য তুলে দেয় এক অনুপ্রেরণা। আমি মনেকরি তাঁদের সাথে সাহিত্যিকদের আলাপচারিতা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং তাদের সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে জানার সুযোগ একটি অপূর্ব মিলনমেলার সৃষ্টি। এই মুহূর্তগুলো বলছে, সাহিত্যের কোনো সীমানা নেই; কবিতা, গল্প, নাটক- সবকিছুর মাঝে একে অপরের পাশে হেঁটে চলা, একে অপরের সমর্থন করা- এটিই আমাদের লক্ষ্য। এসব অভিজ্ঞতার জন্য সবার প্রতি আমার অন্তর থেকে শুভ কামনা রইল। আসুন, আমরা সবাই একসঙ্গে সম্মিলিত হয়ে আরও অগ্রসর হই, সাহিত্যাঙ্গনে নতুন কিছু করতে, নতুন কিছু লিখতে এবং নতুন কিছু খুঁজে বের করতে। আমাদের সকল প্রচেষ্টা কেবলই আমাদের কবিতার, লেখার ও সৃষ্টির অগ্রগতিতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি আমরা যেন সকলে একটি সৃজনশীল ও মানবিক সমাজ গঠনে কাজ করে যেতে পারি।
লেখক : কলেজ শিক্ষক