চট্টগ্রাম কলেজের পুরোনো ফটকটি পুনর্নির্মাণ করা হোক

1

রশীদ এনাম

প্রফেসর শিল্পী সবিহ্ উল আলমের জন্ম ৮ নভেম্বর ১৯৪০ সালে পটিয়া চট্টগ্রামে। বাবা ছিলেন তৎকালীন পটিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার ও পটিয়া ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক- কথাশিল্পী মাহাবুব্ উল আলম, মাতা রাহেলা খাতুন, স্ত্রী প্রয়াত সেলিমা সবিহ্ (টইটম্বুরের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক)। সবিহ্ উল আলম বাবার চাকুরীর সুবাধে পটিয়ায় ৬ বৎসর বয়স পর্যন্ত পটিয়ায় অতিবাহিত করেন। তাঁদের আদি নিবাস হাটহাজারী উপজেলার ফতেয়াবাদ গ্রামে। বর্তমানে তিনি ঢাকা শান্তিনগরে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করেন। সবিহ্ উল আলমের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম সমিতি ভবনে। প্রথম পরিচয়ে আমি খুব মুগ্ধ হলাম । মানুষকে যে খুব সহযে ভালোবেসে পরম মমতায় খুব কাছের করে নিতে পারতেন। পটিয়া আমার বাড়ি জানতে তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বললেন, রশীদ এনাম তুমি আমাকে স্যার বলে কখনও সম্বোধন করবে না। চাচা বলে ডাকবে। পরম আত্মার আত্মীয় হয়ে গেলেন। সেই সুত্র ধরে টইটম্বুরে এবং আলম পরিবারে নিয়মিত যাতায়াত।
গত ২০১৬ সালে বলাকা প্রকাশন থেকে আমার লেখা প্রথম প্রকাশিত, একাত্তরের শহীদ ছবুর বইটি মোড়ক উন্মোচন হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে সবিহ্ চাচার সাথে যাওয়ার পথে হঠাৎ দেখি গাড়িতে বসে হাই মাউ করে কাঁদছেন । আমি একটু নার্ভাস হয়ে গেলাম। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলা শুরু করলেন, ২০০৮ সালে ১২ জানুয়ারি তাঁর জীবন সঙ্গিনী সেলিমা সবিহ্ চাচীর কথা বলে কাঁদতে শুরু করলেন, আমি যাওয়ার কথা ছিল আগে, আমাকে একা ফেলে রেখে সে কেন চলে গেলেন না ফেরার দেশে আমি আজও এটা মেনে নিতে পারিনি। দুজন দুজনার ছিলেন, দুজনে দুজনের মনের যতœ নিতেন। প্রকৃত ও পবিত্র প্রেম ছিল দুজনের মধ্যে। দুজনে নাকি খুনসুটি করে বলতেন, একে অপরকে, আমি আগে চলে যাব। সৃষ্টিকর্তা আগে ডাক দিলেন সেলিমা সবিহ্ চাচীকে, আল্লাহ চাচীকে জান্নাতের বাগানের ফুল ফুটিয়ে রাখুন।
বিনয়ী সবিহ্ উল আলম চাচা প্রিয়জন হারিয়ে দেড়যুগ একাকী কাটিয়ে দিলেন ছেলে মেয়ে ও নাতী নাতনীদের সাথে। আমি জানিনা পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর ও পবিত্র বন্ধন আর দ্বিতীয়টা আছে কিনা। একান্নবর্তী পরিবারের বন্ধন তিনি ধরে রেখেছেন। আলম পরিবার সত্যি বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী পরিবারের মধ্যে আইডল বলা যায়। সবিহ্ উল আলম চাচাকে আমাকে বলেন আমি প্রতি মাসে তোমার চাচী মাকে দেখতে যায়, প্রতিমাসে সেলিমা সবিহ্-র কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রিয়তাম স্ত্রীর জন্য দোয়া করে জেয়ারত করেন। চাচা আওর বলেন, ‘জীবন সঙ্গিনীর আত্না আমাকে দেখতে পাই। তাঁরার যেন উভয় উভয়কে কে অদৃশ্যভালোবাসার বন্ধনে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমাকে কেন একা রেখে চলে গেলে সেলিমা আমার যাওয়ার কথা ছিল আগে কেন তুমি এত তাড়াতাড়ি প্রস্থান করলে ? দুই হাত তুলে প্রিয়জনের জন্য দোয়া করেন, আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করেন। চোখ মুছতে মুছতে কবরে সালাম দিয়ে আবার ছুটে যান যান্ত্রিক নগরে টইটম্বুরের টানে। প্রকৃত ও পবিত্র ভালোবাসার উদাহরন এর চেয়ে কি হতে পারে আমার জানা নেই। গত ২০১৯ সালে হঠাৎ একদিন আমাকে বলেন রশীদ এনাম আমি পটিয়া যেতে চাই আমার নিজভূমে তুমি নিয়ে যাবে আমাকে ?
আমি রাজি হয়ে গেলাম। মনে মনে পরিকল্পনা করলাম সবিহ্ চাচার জন্য কিছু একটা করতে হবে, যাতে পটিয়ায় তাঁর স্মৃতি যেন অনন্তকাল থাকে। নিজের পরিকল্পনায় টইটম্বুরের সহযোগিতায় একটা শিশুতোষ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করলাম। আমার মা জাহেদা আহমেদের নামে একটি মায়ের বাগান করার পরিকল্পনা করলাম। সবিহ্ উল আলম চাচাকে পরিকল্পনার কথা বলাতে তিনি খুশি হলেন। বাগানের নাম রাখতে বললেন, ‘মায়ের বাগান’। সবিহ্ চাচাকে সাথে নিয়ে ২৭ মার্চ বিকেল বেলা টইটম্বুর সম্পাদক কবিতা আপার ছেলে ভাগিনা জাররাফ সহ মার্চ সুবর্ণ এক্সপ্রেসে রওনা দিলাম, পটিয়ার মাটিতে প্রায় ৭২ বছর পা রাখলেন শিল্পী সবিহ্ চাচা। ২৮ মার্চ উদ্ধোধন করলেন, আমার বিদ্যাপিঠ পটিয়া পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড-র পশ্চিম পটিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ ছবুর শিশুতোষ পাঠাগার। সবিহ্ উল আলম চাচা পটিয়ায় গিয়ে প্রকৃতি দেখে মুগ্ধ। সকাল বেলা আমার পরিবারের সাথে “মায়ের বাগান বাড়ির” ছাদে প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে গল্প আর সকালের নাস্থা সারলেন। বাগান বাড়িতে গাছের ডাব পেরে খাওয়া, পুকুর থেকে জাল পেতে মাছ ধরা উপভোগ করলেন। সবিহ্ চাচা মন্ত্রমুগ্ধতা দেখে আমি খুব খুশি হলাম। মনে হচ্ছিল কতদিন পর যেন ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছেন মায়ের কাছে । তিনদিন ছিলেন পটিয়ায়। ঘুরে দেখালাম, সুচক্রদন্ডী গ্রামের সাহিত্যবিশারদ বাড়ি, দলঘাটের প্রীতিলতার বাড়ি, মাস্টার দা স্মৃতিবিজড়িত গৈড়লা গ্রামসহ আরও অনেক জায়গায়। তিনদিন আমাদের বাড়িটি ছিল যেন এক আনন্দ আর হাসি খুশিতে ভরা। পটিয়া থেকে ঢাকা চলে আসার সময় আমার পরিবার পরিজনদের বুকে জড়িয়ে চাচাজী খুব কাঁদলেন। আমার বাবা ও চাচার সাথে পাল্লা দিয়ে চোখের জল জড়ালেন । আমার বাবার কোন ভাই নেই। সে তিন দিনে খুব আপন করে পেয়েছিলেন তাঁর আত্মার আত্মীয় ভাই শিল্পী সবিহ্ উল আলম চাচাকে। গত এপ্রিল ২০২৫ ঈদুল ফিতরের তিনদিন পর স্বপরিবারে চলে আসেন পটিয়া মায়ের বাগানে।
শিল্পী সবিহ্ উল আলম একধারে লেখক, শিল্পী, মডেল, শিশু ও প্রকৃতিপ্রেমী। তাঁর কীর্তির মধ্যে ইসলামিক ক্যালিওগ্রাফি ফেনীর বল্লবপুরে জোসনে আরা কাশেম মসজিদ এবং নোয়াখালী বাইতুশ শরিফ মসজিদের নকশা সবিহ্ উল আলমের হাতে গড়া। চট্টগ্রাম বন্দররের লোগো, ইসলামী ব্যাংকের লোগো, ইবনেসিনার লোগোসহ নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লোগো ও ফটকের নকশা করেছেন। একদা শিল্পী জয়নুল আবেদিন চট্টগ্রামে বেড়াতে গেলে প্রফেসর শিল্পী সবিহ্ উল আলমকে পরামর্শ দেন, চট্টগ্রামে যাতে একটা আর্ট ইনস্টিটিউট করেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কথা রেখেছিলেন শিল্পী সবিহ্ উল আলম। ১৯৭৬ সালে তাঁর শুভাকাক্সক্ষীদের নিয়ে চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। সবিহ্ উল আলম ছিলেন চারুকলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ।
চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ছিল মূল ফটকের ইংরেজি আদ্যক্ষর ‘এ’ এবং কে এর আদলে তৈরী পুরোনো ফটকটি। AK (Acquired Knowledge) নকশা ও দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী প্রফেসর সবিহ্ উল আলমের করা। ১৯৬৫ সালের কথা চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ(ইংরেজি বিভাগ) একদিন মোজাফফর আহমদ স্যার শিল্পী সবিহ্ উল আলম স্যারকে ডেকে বলেন, চট্টগ্রাম কলেজের জন্য যাতে একটা ফটকের নকশা করেন অর্থবহ হতে হবে। শিল্পী সবিহ্ উল আলম মনের মাধুরী মিশিয়ে AK (Acquired Knowledge) আকৃতির একটি নকশা করেন। অধ্যক্ষ সাহেবের খুব পছন্দ হয়। ফটকটি ১৯৬৫ সালে স্থাপিত হয়। শিল্পী সবিহ্ উল আলম বলেন, ‘নকশাটি যখন করছিলাম বার বার মনে পড়ছিল সুন্দর রেইনট্রিগুলোর কথা। গাছগুলোকে যে করে হোক বাঁচাতে হবে। গাছগুলো বাঁচাতে গিয়ে নকশাটি কিছুটা ছোট করে ফেলি। বর্ষিয়ান বৃক্ষগুলোতে পাখি আসে, গাছের ফুল পাতা ছায়া এবং অক্সিজেন সবকিছুর কথাভেবে নকশাটি করেছি’। বাংলাদেশে যত শতবর্ষী কলেজের ফটক রয়েছে তন্মধ্যে এটি বেশ নান্দনিক।
২০১৩ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) দৃষ্টিনন্দন ফটকটি পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের নামে করা হয়েছে বলে ভিত্তিহীন কথা বলে ফটকটি ভেঙ্গে ফেলে। ১৯৬৫ সালে নির্মিত একজন গুণী শিল্পীর নিজ হাতে গড়া দৃষ্টিদন্দন ফটকটি ভেঙ্গে রাতারাতি নতুন ফটক স্থাপন করা হয়েছে। সবিহ্ উল আলমের মতো একজন দেশবরেণ্য শিল্পীর নকশাকে ভেঙ্গে অবমাননা করা হয়েছে। এবং এটি গর্হিত অপরাধ এবং দৃষ্টিকটুও বটে। ফটকটি ভাঙ্গার পূর্বে শিল্পীর সাথে কথা বলা উচিত ছিল এবং শিল্পীর কীর্তি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন ছিল কোন সুস্পষ্ট তথ্য ছাড়া ৪৮ বছর পরে এসে কলেজের নান্দনিক ফটকটিতে কুন্তি কোদালের আঘাতে চোখের পলকে ভেঙ্গে ফেলা এটা মেনে নেয়া যায় না।
একাত্তরের শিল্পী সবিহ্ উল আলমের নিজ হাতে করা চট্টগ্রাম কলেজের পুরোনো ফটকটি পুনণির্মাণ করার জন্য চট্টগ্রাম সিটি মেয়র মহোদয় ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সু দৃষ্টি কামনা করছি।শিল্পী সবিহ্ উল আলমের ৮৫তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক : প্রাবন্ধিক