চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ৩ স্থানে অবরোধ

4

চকরিয়া, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া প্রতিনিধি

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেন করার দাবিতে চকরিয়া, লোহাগাড়া ও সাতকানিয়ায় অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে অংশ নেন। গতকাল রবিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া কর্মসূচি চলে দুপুর পর্যন্ত। এ সময় সড়কে অসংখ্য গাড়ি আটকা পড়ে। দুর্ভোগ পোহাতে হয় যাত্রীদের। তবে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, বিমানবন্দরমুখী গাড়ি, পরীক্ষার্থী, চিকিৎসাসেবাসহ জরুরি সরকারি যানবাহন কর্মসূচির আওতামুক্ত ছিল।
চকরিয়া : গতকাল সকাল ১০ টায় শুরু হয়ে কর্মসূচি চলে দুপুর ১ টা পর্যন্ত। এ সময় সড়কে অসংখ্য গাড়ি আটকা পড়ে। মহাসড়ক ও মাতামুহুরী সেতুর দুইপাশে কর্মসূচি পালনকালে শত শত মানুষ অংশ নেন।
চকরিয়া থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ারের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সরে যেতে বললে তারা ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ’ স্লোগান দেন। আন্দোলনকারীরা কর্তৃপক্ষের আশ্বাস ছাড়া মহাসড়ক ছাড়বেন না বলে জানিয়ে দেন। এরপর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়।
দুপুর পৌনে একটার দিকে আসেন চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আতিকুর রহমান। তিনি আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলেন। এক পর্যায়ে ইউএনও আন্দোলনকারীদের মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করার সর্বশেষ প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করার পর দুপুর ১ টার দিকে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন আন্দোলনকারীরা।
ইউএনও সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর বরাত দিয়ে বলেন, মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। এখন ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রণয়নের কাজ চলছে। দ্রুত সময়ে যাতে ৬ লেন হয় আমরা সবাই সচেতন থাকব।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পটি বছরের পর বছর অনুমোদনের অপেক্ষায় ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা ও টেন্ডার সংক্রান্ত নানা সমস্যায় এখনে সিকি পরিমাণও কাজ হয়নি।
তারা আরও বলেন, গত ১১ মাসে চকরিয়ায় ২৭টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে অন্তত ৩০ জনের। তারপরও সড়কটি ৬ লেন করার ব্যাপারে সরকার নির্বিকার।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চকরিয়া উপজেলার সমন্বয়ক সায়েদ হাসান বলেন, ইউএনও’র আশ্বাসের প্রেক্ষিতে আমরা আজ আন্দোলন প্রত্যাহার করলাম। যদি কোন গড়িমসি হয়, তাহলে কঠোর কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামবো।
সংগঠক আনিসুল ইসলাম ফারুকী বলেন, এটি মহাসড়ক উন্নয়নের দাবি নয়, এটি আমাদের বাঁচা-মরার লড়াই। অপেক্ষা করার সময় শেষ। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই আমরা এ গণদাবি আদায় করবো। আমাদের সাথে ৩ জেলার কোটি মানুষের সমর্থন রয়েছে।
লোহাগাড়া : চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেন করার দাবিতে লোহাগাড়ায় অবরোধ কর্মসূচি সকাল ৯ টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত পালিত হয়। লোহাগাড়া উপজেলায় মহাসড়ক সংলগ্ন বটতলী স্টেশনে পুলিশ বক্সের সামনে কর্মসূচি পালন করেছে ৬ লেন বাস্তবায়ন কমিটির সংগঠকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সকল ৯ টা থেকে লোহাগাড়ার বিভিন্ন অংশে যান চলাচল পুরাপুরি বন্ধ করে দেন আন্দোলনকারীরা। যান চলাচল বন্ধ থাকায় দীর্ঘ যানজন সৃষ্টি হয়। তাই যাত্রীদের পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে।
ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়া এক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মহাসড়কটি মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়েছে। সরকারের উচিৎ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
কর্মসূচিকালে বক্তারা বলেন, এ মহাসড়ক আমাদের এ অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ পথ হলেও প্রতিদিনের যানজট, দুর্ঘটনা এবং সড়কের অপ্রতুল ধারণক্ষমতার কারণে মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। ৬ লেন সম্প্রসারণের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়ায় সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে আন্দোলনে নামছেন।
৬ লেন বাস্তবায়ন কমিটির সংগঠক আজাদ শেখ বলেন, এ কর্মসূচি প্রমাণ করে লোহাগাড়ার জনগণ ৬ লেন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবে না।
আরেক সংগঠক তামিম মির্জা বলেন, আমরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে বার বার জানানোর পরও দূশ্যমান কাজ হয়নি। তাই আজকের কর্মসূচি।
তিনি জানান, উপদেষ্টা, ডিসি, সড়ক ও জনপদ বিভাগের সাথে কথা হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মাধ্যে মহাসড়ক ৬ লেন করার কাজ শুর হবে। এই আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে দুপুর সাডে ১২ টায় কর্মসূচি প্রত্যহার করা হয়। পরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেন, জনদুর্ভোগ কমাতে কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন। আমি এ মহাসড়ক সম্পর্কে মন্ত্রণালায়কে অবহিত করব।
স্থানীয়রা জানান, সড়কটি ৬ লেনে উন্নীত হলে শুধু যানজটই কমবে তা নয়, বাড়বে পর্যটন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম। যা পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
সাতকানিয়া : গতকাল রবিবার সকাল ১০টা থেকে সাতকানিয়ার কেরানীহাট এলাকায় অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়। ‘মহাসড়ক উন্নয়ন আন্দোলনে’র ব্যানারে অবরোধ কর্মসূচির কারণে সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘মরণফাঁদ মহাসড়ক’ নামে পরিচিত এই পথে প্রতিদিনের দুর্ঘটনা, যানজট ও জনদুর্ভোগের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিরাও এক কাতারে দাঁড়ান।
আন্দোলনকারীরা বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবান- এ তিন জেলার কোটি মানুষের জীবনরেখা এ সড়ক। অথচ অব্যাহত দেরি, অনুমোদন জটিলতা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার সমস্যার কারণে উন্নয়ন এগোচ্ছে না।
আন্দোলনকারীদের পক্ষে তামিম মির্জা জানান, উপদেষ্টা, ডিসি, এসপি এবং স্থানীয় প্রশাসন ও সাবেক সাংসদ শাহজাহান চৌধুরীর অনুরোধে ১৫ দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।
তিনি জানান, ১৫ দিনের মধ্যে প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত হবে। তাই জনগণের কষ্টের কথা চিন্তা করে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু দাবির বিষয়ে কোন ছাড় নেই। সময়মতো সাড়া না পেলে লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এরপর কেরানীহাট এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রশাসনের অনুরোধে আন্দোলনকারীরা মহাসড়ক থেকে সরে গেছেন। বর্তমানে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। দাবিগুলো নিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।