চট্টগ্রামে লেবু উৎপাদন ৭ বছরে বেড়েছে ৬ গুণ

6

আসহাব আরমান

বছর বছর বাড়ছে লেবুর চাহিদা। সে কারণে চট্টগ্রামে লেবু উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সরকারি উদ্যোগের কারণে গত ৭ বছরে লেবু উৎপাদন বেড়েছে ৬ গুণ। গত বছরের তুলনায় এই বছরও উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণ। কিন্তু দামের কোনো হেরফের নেই। উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে দামও বেড়েই চলেছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে বাজারে দাম কমে না বলে অভিযোগ। কারণ কৃষক পর্যায় থেকে শুরু করে বাজার পর্যন্ত দামের ফারাক বেশি। কৃষকরা যেখানে প্রতিপিস লেবু ৩ টাকায় বিক্রি করেন সেটি শহরে এসে খুচরা পর্যায়ে ৮-১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে- চট্টগ্রাম জেলায় মোট লেবুর উৎপাদন ৪৮ হাজার ২০০ টন। বছরের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণ। চাহিদা বাড়ায় এই অঞ্চলে লেবুর উৎপাদন বাড়াতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। লেবু চাষ ও উৎপাদন বাড়লেও লেবুর দাম কমে না। মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের দাবি, লেবু তারা আড়ৎদারদের কাছে গড়ে ৩ টাকা পিস হিসেবে বিক্রি করে। কিন্তু খুচরা বাজারে সেই লেবু বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০ টাকার বেশী। রমজানে মাসে একটি লেবুর ২০ টাকায়ও বিক্রি হয়। মাঠ পর্যায়ের চাষীদের দাবি, ন্যায্য দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের দামের সাথে কৃষকদের পাওয়া দামের যে পার্থক্য সেটা বিস্তার ফাঁরাক। সরাসরি কৃষক যদি লেবু বাজারে বিক্রি করতে পারতো তাহলে ভালো দাম পেতেন ও চাষাবাদ বৃদ্ধিতে আরো আগ্রহী হয়ে উঠতো কৃষকেরা বলে মনে করেন তারা।
চট্টগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম জেলায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৮০৭ হেক্টর হেক্টর জমিতে লেবু আবাদ হয়। এই জমিতে লেবুর হয়ে উৎপাদন ৪৮ হাজার ২০০ টন। যদিও ২০২১-২২ অর্থবছরে এই জেলায় ১ হাজার ৮৯৫ হেক্টরে লেবুর উৎপাদন ছিলো ২৪ হাজার ১১৪ টন। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে আবাদ ৮৮ হেক্টর কমলেও উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণ বা ২৪ হাজার ৮৬ টন বেশী। একইভাবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মাত্র ৬২০ হেক্টর জমিতে লেবু আবাদ করা হয়। উৎপাদন ছিলো ৭ হাজার ৭৫৪ টন। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে চট্টগ্রামে আবাদ হয় এক হাজার ৮০৭ হেক্টরে। উৎপাদন হয় ৪৮ হাজার ২০০ টনে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দেশব্যাপী লেবুর উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ৩০ জেলার ১২৩টি উপজেলায় ‘লেবু জাতীয় ফসলের সস্প্রসারণ, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয়। এই প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের ৬টি উপজেলায় প্রকল্পের কাজ করা হয়। এই প্রকল্প ২০১৯ সালে শুরু হয়ে ২০২৩ এ শেষ হয়। চট্টগ্রাম জেলায় ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে লেবু চাষ করে উৎপাদন হয় ২৪ হাজার ১১৪ টন। সেখানে তার পরের বছরে আবাদ কমে ১ হাজার ৮০৭ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ৪৮ হাজার ২০০ টন। অর্থাৎ প্রকল্পটির কারণে এই জেলায় এক বছরের ব্যবধানে লেবুর উৎপাদন দ্বিগুণ।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. নাছির উদ্দিন জানান, চট্টগ্রামে লেবু উৎপাদন বাড়ছে। পাহাড়ী লেবুর চাহিদা বেশী। এক দশক আগেও লেবুর উৎপাদন সেভাবে ছিলো না। কিন্তু গাছের পরিপক্কতা বাড়ার কারণে লেবুর উৎপাদন প্রতিবছর এখন বাড়ছে। লেবুর উৎপাদন বাড়ানোর জন্য একটি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। এত লেবু জাতীয় ফসল উৎপাদন বেড়েছে। লেবু জাতীয় ফলের আবাদ বাড়ানোর জন্য কাজ চলছে। লেবুর উৎপাদন আরো বাড়বে।
কৃষকরা বলছেন, লেবু উৎপাদনের জন্য কৃষকদের খরচ বেশী। সময়মতো পানি দেওয়া, কীটনাশক ব্যবহার করাসহ অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ করাসহ বিভিন্ন খরচ আছে। লেবু গাড়ি ভাড়া করে আড়ৎদারের কাছে বিক্রি করতে হয়। পরিবহন খরচসহ বিভিন্ন খরচ আছে। কিন্তু বিক্রির সময় আড়ৎদাররা দাম কম দেন। এতে লাভ হয় সামান্যই। বাজারে সেই লেবু বিক্রি হচ্ছে দ্বিগুণ বা তারও বেশী হয়। কৃষক যদি ভালো দাম না পায় তাহলে তারা ফসল উৎপাদনে আগ্রহী হবেন না বলে মনে করেন তারা।
বোয়ালখালী উপজেলার কড়লডেঙ্গা ইউনিয়নের প্রায় ১৫ কানি (এক কানি = ৪০ শতক) জমিতে লেবু চাষ করেন মো. রাশেদ। তিনি পূর্বদেশকে বলেন, আমি প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর এই লেবু চাষের সাথে যুক্ত। আমার ইউনিয়নে পাহাড়ী এলাকায় বেশী লেবুর চাষ হয়। সারা বছর লেবু পাওয়া গেলেও গত দেড় বছর ধরে লেবুর উৎপাদন বেড়েছে। বস্তাপ্রতি লেবু আড়ৎদারদের কাছে ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকায় এখন বিক্রি করছি। এক বস্তায় গড়ে লেবু থাকে ৩০০ থেকে ৩৫০ পিস। একটা লেবুর দাম গড়ে আড়াই থেকে ৩ টাকা পাই। কিন্তু বাজারে এই লেবুর দাম আরো বেশী। মাঠে লেবু উৎপাদন বাড়লেও দাম নিয়ে অসন্তুষ্ট চাষীরা।