সোহেল মো. ফখরুদ-দীন
চট্টগ্রামের আদি আঞ্চলিক বা চাটগাঁইয়া ভাষায় “ভুছাল” একটি প্রাচীন, স্বকীয় ও গভীর অর্থবহ শব্দ। ভূমিকম্প, মাটির কাঁপন বা আকস্মিক ভূ-দোলন বোঝাতে শত শত বছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষ “ভুছাল” শব্দটি ব্যবহার করে আসছে। ভূমিকম্প অনুভূত হলেই গ্রামের মানুষের মুখে আজও শোনা যায়— “ভুছাল আইল”, অর্থাৎ ভূমিকম্প হলো।
ভাষাতাত্তি¡ক বিশ্লেষণে দেখা যায়, “ভুছাল” শব্দটি দুটি ধ্বনি-অংশে গঠিত— “ভূ”, অর্থ ভূমি বা মাটি; আর “ছাল” বা “ছালা”, যার অর্থ ঝাঁকুনি, দোলন বা আকস্মিক নড়াচড়া। দুই অংশ মিলিয়ে “ভুছাল” অর্থ দাঁড়ায়— মাটির আকস্মিক দুলুনি, যা মূলত ভূমিকম্পের স্বাভাবিক বর্ণনা। শব্দটি সম্পূর্ণ দেশজ; কোনো বাইরের ভাষা থেকে আসেনি। এটি আমাদের মাটির সঙ্গে জড়ানো শব্দ— আমাদের নিজস্ব কথ্যভাষার এক জীবন্ত চিহ্ন।
চট্টগ্রামের ভূপ্রকৃতি পাহাড়, টিলা, নদী ও উপক‚লবেষ্টিত হওয়ায় অতীতে বহুবার স্বল্পমাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই স্থানীয় মানুষের ভাষায় এমন নিজস্ব ও অভিজ্ঞতানির্ভর শব্দের জন্ম। “ভুছাল” এ অঞ্চলের মানুষের বাস্তব অনুভূতি, ভয়, বিস্ময় এবং প্রাকৃতিক পরিস্থিতির সরাসরি রূপান্তর। চাটগাঁইয়া ভাষা তার জীবন্ত শব্দভান্ডার, ধ্বনিগত স্বতন্ত্রতা ও অভিব্যক্তির শক্তির জন্য যে সমৃদ্ধ “ভুছাল” তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
আধুনিক বাংলায় “ভূমিকম্প” ব্যবহৃত হলেও চট্টগ্রামে “ভুছাল” এখনো দৈনন্দিন ও পরিচিত শব্দ। এই শব্দটি শুধু একটি আঞ্চলিক প্রতিশব্দ নয়; বরং চট্টগ্রামের ভাষাগত ঐতিহ্য, প্রাচীন কথ্যরীতি এবং স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতীক। মনে রাখা প্রয়োজন প্রাচীন চর্যাপদের বহু কবি-পন্ডিতের জন্মভূমি ছিল চট্টগ্রাম, এবং আদি বাংলা ভাষার বহুমাত্রিক বিকাশে এ অঞ্চলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ধারাবাহিকতায় “ভুছাল” শব্দটির ঐতিহ্যিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
স¤প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক ভূকম্পনের ঘটনায় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে; কিছু স্থানে ভবন ধসে প্রাণহানিও ঘটেছে। জাতীয়ভাবে যখন ভূমিকম্পন নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন “ভুছাল” শব্দটির কথাও নতুন করে মনে করিয়ে দিতে ইচ্ছে হলো কারণ এটি শুধু একটি ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক ঘটনার নাম নয়; এটি চট্টগ্রামের আদি ভাষা, অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির গভীর শিকড়বদ্ধ এক ঐতিহ্যবাহী শব্দ।
লেখক : পরিচালক ও সম্পাদক, দি একাডেমি অব হিস্ট্রি বাংলাদেশ (ইতিহাসের পাঠশালা)










