ঘূর্ণিঝড় রেমাল এ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান

3

কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম

প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’ বাংলাদেশ উপকূলে তান্ডব চালিয়ে গভীর স্থল নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করেছে। এ পর্যন্ত রেমালের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০৭ উপজেলা। বিধ্বস্ত হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ঘরবাড়ি, ভেসে গেছে বহু মাছের ঘের। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে ফসলের। রেমালের প্রভাবে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৬। জনের প্রাণ গেছে বহু গবাদিপশুরও। এছাড়া বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ গ্রাহক। সুন্দরবনের হরিণসহ নানা প্রাণীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আসলে এই সুন্দরবনই প্রায়সময় ঘূর্ণিঝড় থেকে উপকূলের মানুষের জানমাল রক্ষায় দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়!
গত ২২ মে পূর্বমধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়। এ লঘুচাপ ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করে প্রথমে রূপ নেয় সুস্পষ্ট লঘুচাপে। এরপর নিম্নচাপ ও গভীর নিম্নচাপ দশা পেরিয়ে শনিবার সন্ধ্যায় পরিণত হয় ঘূর্ণিঝড়ে। ঘূর্ণিঝড় হওয়ার পর এর নাম হয় রেমাল। রোববার সকালে শক্তি বাড়িয়ে রেমাল পরিণত হয় প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে।
প্রবল এ ঘূর্ণিঝড় রোববার রাত ৮টার দিকে পশ্চিমবঙ্গ উপকূল ও বাংলাদেশের খেপুপাড়া উপকূল অতিক্রম শুরু করে। এর আগে বিকাল থেকেই উপকূলীয় অঞ্চলের নদ-নদীতে পানি বেড়ে যায় পাঁচ-সাত ফুট। উপকূলে আঘাত হানার সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৯০-১২০ কিলোমিটার। ঘূর্ণিঝড়টি উপকূল থেকে পুরোপুরি স্থলভাগে উঠে আসতে সময় নেয় ৫-৭ ঘণ্টা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ বাংলাদেশ। প্রায় প্রতিবছরই এদেশের উপকূলবাসীকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মোকাবেলা করে বেঁচে থাকতে হয়। শুধু ঘূর্ণিঝড় নয় এদেশে বন্যা, খরাও হয় নিয়মিতই। এবারতো তীব্র তাপদাহে মানুষ অস্বস্তিতে ভোগে অনেকদিন। বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অবস্থায় আমাদেরকে জরুরি ভিত্তিতে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। নিতে হবে মহাপরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিষয়ে সচেতন হতে হবে সকলকে। পরিবেশ নষ্ট হয় এমন কাজ থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। যা বলছিলাম, ঘূর্ণিঝড় রেমালে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এখন অসহায়। খোলা আকাশের নিচে থাকছেন অনেকেই। তাদের জন্য উপযুক্ত সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। মিডিয়া ঘূর্ণিঝড় রেমালের যে ব্যাপক প্রভাব ও মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখকষ্টের কথা প্রচার করছে তার চেয়েও আমি মনে করি ঐ অঞ্চল তথা উপকূলের মানুষ বেশি কষ্টের মুখোমুখি। তাদের এই কষ্ট লাঘবে সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে উদারচিত্তে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি পুণনির্মাণ, খাবার, কর্মসংস্থান ও প্রয়োজনীয় সকল প্রকার সহযোগীতা করতে হবে। এমনিতে তারা বছর বছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে নিজের সহায়সম্বল হারান। এমতাবস্থায় কেবল মিডিয়া কভারেজের দিকে না তাকিয়ে প্রকৃত অর্থেই এসব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। ঘূর্ণিঝড়ে বিদ্যুতকেন্দ্র নষ্ট, মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্নের কারণে এ অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরণের বিপর্যয় ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যে কারণে উপদ্রত এলাকার জনসাধারণকে সর্বাত্মক সহযোগীতা করে যেতে হবে। অন্তত মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বলছেন, পানির এমন ভংকরভাবে ফুঁসে উঠা তারা এর আগে দেখেননি। জলোচ্ছ্বাসের পানি যেভাবে মানুষের ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, চিংড়িঘেরসহ ফসল সবকিছুকে টেনে নিয়ে গেছে তাতে মানুষের অসহায়ত্ব চরমে পৌঁছে। এজন্য যেভাবেই হোক ঘুর্ণিঝড় পরবর্তি পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং বছর বছর ঘূর্ণিঝড়সহ বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাংগন থেকে উত্তোরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাহস দিতে হবে। পরিস্থিতি থেকে উৎরে যেতে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সাধারণ মানুষকে অবারো ঘুরে দাঁড়াতে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই। দুর্ভোগে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ান। সাহায্যের হাত বাড়ান।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট