ঘন ঘন ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে

1

মো. দিদারুল আলম

ঘন ঘন ছোট ভূমিকম্প একটি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে, তবে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, একটি বড় ভূমিকম্প হবেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টেকটোনিক প্লেটগুলোর ওপর সঞ্চিত শক্তি নির্গত হওয়ার একটি অংশ হিসেবে এমন ছোট ছোট কম্পন হতে পারে, যা পরবর্তীতে একটি বড় কম্পনের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে, কোনো নির্দিষ্ট মাত্রার ভূমিকম্প কখন হবে, তা আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা কঠিন। নরসিংদীকে কেন্দ্র করে গত ২১ নভেম্বর ৫.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে বাংলাদেশে ১০ জন নিহত হয়েছেন। প্রায় ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ, যার মধ্যে ১৬৭ জন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। গত কয়েক বছর ধরে দেশে ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এই কম্পন অনুভূত হয়। ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, ঘন ঘন হালকা কম্পন মূলত বড় শক্তির জমা হওয়ার প্রাথমিক ইঙ্গিত, আর বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ১৫০ বছরের ভ‚কম্পন চক্রের এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে যেকোনো সময় রিখটার স্কেলে ৮.২ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটতে পারে।
যে মাত্রায় ভূমিকম্প হয়েছে এবং যেভাবে ঝাঁকুনি হয়েছে, সে তুলনায় আল্লাহর রহমতে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। তবে অনেক ভবন দেবে গেছে। ঢাকা শহর এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে, অধিকাংশ এলাকায় কোনো ফাঁকা জায়গা নেই। যেগুলো ছিল, সেগুলোকে কনভার্ট করে ফেলা হয়েছে। ঢাকা শহরে ভূমিকম্প বা অন্য কোনো দুর্যোগে মানুষ যে খোলা জায়গায় দাঁড়াবে, সে সুযোগ নেই। ঢাকায় শত শত খোলা জায়গা তৈরি করা দরকার ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রের উদ্যোগ না থাকায় বেসরকারি উদ্যোগে কখনোই এটা করা হবে না। এই উদাসীনতা দুর্যোগের সময় ঢাকাবাসীর জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। খেলার মাঠগুলোকে শুধু খেলাধুলা নয়, দুর্যোগেও আশ্রয়ের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ভূমিকম্প কোনো আগাম বার্তা দেয় না। তাই ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে এখনই সতর্কতা ও প্রস্তুতি বৃদ্ধি করতে হবে। রাজধানীর ভবনগুলো পুনরায় পরীক্ষা করে ত্রুটিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলার দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি ভবন নির্মাণে জাতীয় নীতিমালা কঠোরভাবে মানার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের মূল ভূখন্ডে অবস্থিত সবচেয়ে লম্বা ফাটলটা হলো চট্টগ্রাম-আরাকান ফাটল যা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম উপকূল ও মিয়ানমারের উপক‚লে অবস্থিত। ৯১২ কিলোমিটার লম্বা এই ফাটল সর্বোচ্চ ৮.৮ – ৮.৯ মাত্রার ভূমিকম্প উৎপন্ন করতে পারে। ১৭৬২ সালে এই ফাটল থেকে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। সমস্ত শক্তি ছেড়ে দেওয়ায় তখন ৮.৫ – ৮.৮ মাত্রার ভূমিকম্প উৎপন্ন হয় যার ফলে ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ বদলে যমুনা নদীর জন্ম হয়। এই ফাটলের অবস্থান চট্টগ্রাম বিভাগে তাই এখান থেকে ভূমিকম্প তৈরি হলে সেখানেই ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হবে। ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পের মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে চট্টগ্রাম। যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পে বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ১২৭টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৮টির উৎপত্তিস্থল দেশের ভেতরেই ছিল। এর মধ্যে সিলেট বিভাগেই আটটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, যা সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, কুমিল্লা, শরীয়তপুর, টাঙ্গাইল, রাঙামাটি ও চুয়াডাঙ্গাতেও ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটে। শরীয়তপুর জেলার জাজিরায় হওয়া ভূমিকম্প ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১।
চট্টগ্রামে গত ৩০ বছর ধরে বিভিন্ন সময় মৃদু থেকে মাঝারি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভূমিকম্পের হার বাড়ছে। শক্তিশালী ভ‚মিকম্পে চট্টগ্রামের বেশিরভাগ ভবনই ধসে যেতে পারে। চট্টগ্রাম নগরীতে বেশি মাত্রার বড় ভূমিকম্পে বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সূত্র জানায়, নগরীতে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে এক তলা ভবন ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫টি, দুই থেকে ৫ তলা ভবন ৯০ হাজার ৪৪৪টি। ৬ থেকে ১০ তলার ভবন আছে ১৩ হাজার ১৩৫টি। ১০ তলার বেশি ভবন আছে ৫২৭টি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, ভূমিকম্প এড়ানোর উপায় নেই। তিনটি বড় প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত-ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মিজ প্লেট। সেই সঙ্গে দেশের মাটি নরম প্রকৃতির হওয়ায় কম্পনের প্রভাব বেশি পড়ে। ছোট ভূমিকম্পগুলো স্বাভাবিক ঘটনা হলেও সচেতনতা ও প্রস্তুতি ছাড়া বড় বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব নয়।
ঢাকা শহরের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ফাটল হলো মধুপুর ফাটল যার দক্ষিণভাগ সরাসরি ঢাকা শহরের মধ্যে পড়ে। ১১৮ কিলোমিটার এই ফাটল দেশের সবচেয়ে ছোট ফাটলগুলোর একটা। তবু এটা সর্বোচ্চ ৭.৮ – ৭.৯ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে যেহেতু দেশের ভেতরে ও আশেপাশে বড় বড় ফাটল আছে এবং তারা যথেষ্ট বড় ভূমিকম্প তৈরি করতে পারে তাই বাংলাদেশে যে বড় ভূমিকম্প একদিন হবে সেটা খুবই স্বাভাবিক। তবে কবে হবে, কোন ফাটল থেকে হবে, কত বড় ভূমিকম্প হবে এসব একমাত্র আল্লাহই জানেন ।
ভূমিকম্পের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হচ্ছে, এটি কোনো পূর্বাভাস দেয় না। হঠাৎ করে এসে একটা মারাত্মক ঝাঁকুনি মেরে সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে চলে যায়। যেহেতু এটার পূর্বাভাস আগে থেকে জানা যায় না। তাই বিল্ডিং কোড মেনে ইমারত নির্মাণ করতে হবে। আর আবাসিক ও নন-আবাসিক এলাকাগুলোতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারে মত ব্যবস্থা রাখতে হবে। অন্যথায় ভূমিকম্পের কারণে যদি কোথা আগুন বা ঘর-বাড়ি ধ্বসে পড়ে সেক্ষেত্রে উদ্ধারকারী গাড়ি যেতে না পারে কী ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে কল্পনা করা যায় না। তাই আমাদের সরকারের উচিৎ ভূমিকম্পের ভয়াবহতা মোকাবেলার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করা এবং যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করা। বড় ধরনের ভূমিকম্প যে কোনো সময় ঘটতে পারে এবং যথাযথ প্রস্তুতি না থাকলে তার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।
বাংলাদেশে ভূমিকম্প হবে কিন্তু বড় ক্ষতির আশঙ্কা তখনই বাড়বে, যখন সচেতনতা ও প্রস্তুতির অভাব থাকবে। আজ ছোট কম্পন, আগামীকাল তার চেয়েও বড় কিছু। প্রস্তুতি না থাকলে বিপর্যয় সময় নেয় না আসতে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসে বছরে অন্তত ২ বার ভূমিকম্প মহড়া হওয়া উচিত। বাংলাদেশের মানুষ এক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলতে, ঘূর্ণিঝড়-বন্যাকে ভাবত। এখন যুক্ত হয়েছে ভূমিকম্প। আমরা কিন্তু প্রস্তুত হইনি। বলা ভালো প্রস্তুত করা হয়নি। যদিও পরিকল্পনা আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। উদ্যোগ আছে, পরিপূর্ণতা নেই। গতকালের কম্পন বড় হয়নি, তাই আমরা রেহাই পেয়েছি। কিন্তু ভবিষ্যৎ সবসময় এমন হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। এই ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক সতর্কবার্তা। যেটি আমাদের বলেছে প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও সচেতনতা ঘাটতির কথা। যদি এখনই ব্যবস্থা না নিই, ভবিষ্যতে একটি বড় ভ‚মিকম্প বাংলাদেশকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি কম্পন অনুভব করেই ভয়ে থেমে যাব, নাকি সেই কম্পন মোকাবিলায় নিজেকে প্রস্তুত করব? নিরাপদ আগামীর জন্য যেন আমরা প্রস্তুত হই। মানুষকে বাঁচাই। জীবন ও সম্পদ রক্ষাই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।
লেখক : শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনাট্যলেখক