গ্রীষ্মকালে স্থায়ীভাবে মর্নিং স্কুল চালুর প্রয়োজনীয়তা

6

কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম

এবারের গ্রীষ্মে তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে। রাজধানী ঢাকায় তাপমাত্রা ৪০ এর ঘরে পৌঁছে। চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রার পারদ রেকর্ড ৪৩ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়। তীব্র তাপদাহে পুড়েছে সারাদেশ। সাধারণ মানুষের মধ্যে ত্রাহি অবস্থা, হাঁসফাঁস করে পশু-পাখি। একটু শীতল পরশের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে প্রকৃতি। এর সাথে যোগ হয় অসহনীয় লোডশেডিং। ফলে জনজীবনে নেমে আসে এক ধরণের অস্বস্তি। একটু বৃষ্টির আশায় মানুষ তীর্থের কাকের মতো আকাশপানে চেয়ে থাকে। যদিও আবহাওয়া অফিস থেকে সারাদেশে বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রামে বজ্রসহবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি হয়েছে, হচ্ছে। সিলেটে নিয়মিত ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। দেশের অন্যান্য স্থানেও বৃষ্টির দেখা মিলছে। প্রচন্ড গরমের কারণে দেশের কেমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে কয়েকদিন সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ রাখা হয়। বন্ধ ঘোষণা করা হয় হাইস্কুল, কলেজের ক্লাসও। অবশ্য প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সাময়িকভাবে মর্নিং স্কুল চালু হয়। এমনিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকায় গ্রীষ্মকালীন অবকাশ রয়েছে। কিন্তু প্রতিবছর গ্রীষ্মে যেভাবে তাপমাত্রা বেড়ে চলেছে তা এই অবকাশ দিয়ে পূরণ হবার নয়! তাছাড়া, গ্রীষ্মের ছুটির সময় বর্ষা নামে প্রকৃতিতে!। সেজন্য ছুটির তালিকাও সমন্বয় করা দরকার। এসব কারণে গ্রীস্মকালে (এপ্রিল-জুন) স্থায়ীভাবে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মর্নিং স্কুল চালু করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছি। এটা হলে দুপুরের তপ্ত রোদ আসার আগেই শিক্ষার্থীরা ক্লাস করে ঘরে ফিরতে পারবে। পাশাপাশি গরমের তীব্রতায় মানসিক পীড়াদায়ক অবস্থা থেকে মুক্ত থেকে একটি সফল ও কার্যকর ক্লাস করা সম্ভব হবে। এতে শিখন পুরোপুরি সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যায়। তাছাড়া, শিক্ষক-অভিভাবকসহ সকলে গ্রীষ্মকালে প্রচন্ড তাপদাহ থেকে রক্ষা পেতে স্কুল, কলেজে মর্নিং স্কুল করার কথা বলছেন। গ্রীষ্মে মর্নিং স্কুল হলে শিক্ষার্থীরা বেঁচে যাবে শারীরিক সব ধরণের অসুস্থতার সম্ভাবনা থেকে। লোডশেডিং কমাতে এটি কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারে। ঋতুবৈচিত্র্যের এদেশে এমনিতে এখন সুনির্দিষ্ট ঋতুর দেখা পাওয়াই কষ্টকর! এখানে বছরের বেশিরভাগ অংশ জুড়েই যেন গ্রীষ্মের আবহ! আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আগামী বছরগুলোতে তাপদাহের তীব্রতা আরো বাড়তে পারে। বাড়বে পৃথিবীর উষ্ণতা।
প্রচন্ড তাপদাহের কারণে শিশু, বৃদ্ধসহ অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বাদ যায়নি শিক্ষক-শিক্ষার্থীও। গরমে ইতিমধ্যে দুএকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং অনেকের অসুস্থতার খবর পাওয়া গেছে। তীব্র তাপদাহে মৃত্যু ও অসুস্থদের দায়ভার কে বহন করবে? মর্নিং শিফটের ক্লাস মূলত: শিক্ষার্থীদের সুস্থতার কথা চিন্তা করেই করা প্রয়োজন। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে লাখ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। বিশাল এই শিক্ষার্থী সমাজকে বাঁচানোই লক্ষ্য। এর আগে মহামারী করোনা থেকে বাঁচতে দীর্ঘসময় স্কুল, কলেজ বন্ধ ছিল। যে সুস্থতার কথা মাথায় রেখে করোনার সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয় ঠিক সেই সুস্থতার কথা চিন্তা করেই প্রতিবছর গ্রীষ্মের সময় মর্নিং ক্লাস চালু করা যেতে পারে। যা একেবারে একটি যৌক্তিক ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করি। এটি হলে বছর বছর গ্রীষ্মকালে স্কুল, কলেজ বন্ধ রাখা না রাখা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকতে হবেনা।
এবারের তীব্র তাপদাহের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচি ও এ সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বিভিন্ন মতামত প্রদান করেন অনেকেই। তুলে ধরেন নানা যুক্তি। এসব মতামত ও যুক্তি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত হলে হয়তো তারা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতেও পারেন। এরপরও আমি মনে করি, তাদের সেই মতামত বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। দরকার হলে এ বিষয়ে আরো চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারলে শিক্ষার্থীদের জন্য উপকার হবে। অবশ্য দুই শিফট চালু থাকা স্কুলগুলোর জন্য সাময়িক অসুবিধা হলেও তা যেকোনভাবে ম্যানেজ করার চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবার আগে শিক্ষার্থী। তাই তাদের সুবিধা-অসুবিধার কথা মাথায় রাখতে হবে। তাদের সুস্থতা, অসুস্থতার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের প্রবল বিশ্বাস নিয়ে স্কুলে পাঠান। পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুস্থতার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। এসব কারণে, গ্রীষ্মকালে মর্নিং শিফটে ক্লাস চালু করতে নতুন সময়সূচি প্রণয়ন করা দরকার। গরমের কারণে অসুস্থ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মর্নিং শিফট চালুর কোন বিকল্প দেখছিনা। পৃথিবীর অনেক দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রীষ্মে মর্নিং ক্লাস চালু করা হয় অথবা দীর্ঘমেয়াদে স্কুল, কলেজ বন্ধ রাখা হয়। আমাদের এখানে যেহেতু নানা কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা সম্ভব নয় সেহেতু সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে শিখন ঘাটতি পূরণ ও শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্যের জন্য গ্রীষ্মের সময় (এপ্রিল-জুন) স্থায়ীভাবে মর্নিং স্কুল করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ রইলো। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট