
আলমগীর মোহাম্মদ
বেগম খালেদা জিয়া, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী, কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন, তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক অটল, অবিচল ব্যক্তিত্ব এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের উত্তরণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই মাহেন্দ্রক্ষণে তাঁর সুস্থ ও সক্রিয় উপস্থিতি কতটুকু জরুরি, তা বোঝার জন্য তাঁর রাজনৈতিক যাত্রাপথ এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
১৯৮০-এর দশকে যখন বাংলাদেশের রাজনীতি সামরিক স্বৈরতন্ত্রের কবলে পড়ে, তখন এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে তিনি দেশের মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং অচিরেই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করেন। তাঁর এই রাজনৈতিক জীবনের প্রারম্ভিক পর্বেই তাঁর আপোসহীন নেত্রী উপাধি লাভ অর্থবহ হয়ে ওঠে। জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারের সঙ্গে বহু দল আপোস করলেও, বেগম জিয়া তাঁর অটল, অবিচল ব্যক্তিত্বের কারণে কোনো প্রকার সমঝোতা বা চুক্তিতে যাননি। তাঁর এই দৃঢ়তা দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মধ্যে এক গভীর আস্থা ও প্রেরণা সৃষ্টি করেছিল। দীর্ঘ আট বছর ধরে চলা স্বৈরাচার বিরোধী গণ-আন্দোলনে তিনি সাত-দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন, যার ফলশ্রæতিতে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায় এবং বাংলাদেশে পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তাঁর দল বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সরকারের ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণ। এই লক্ষ্যে ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদে সংবিধানের ঐতিহাসিক দ্বাদশ সংশোধনী বিল পাস হয়। এই সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাত থেকে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদের কাছে ন্যস্ত হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় এক মৌলিক পরিবর্তন। বেগম খালেদা জিয়ার এই নেতৃত্বসুলভ সিদ্ধান্ত তাঁর দূরদর্শিতা ও দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধার পরিচায়ক। তাঁর প্রথম শাসনকালে সংসদ প্রচন্ড প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, যেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের আলোচনা-বিতর্কের মাধ্যমে প্রকৃত সংসদীয় চর্চার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এই সময়ে শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর সরকার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করে, যার মধ্যে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ও ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি প্রবর্তন অন্যতম।
পরবর্তীতে, ১৯৯৬ সালে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য তিনি স্বল্প সময়ের সরকারপ্রধান হিসেবে সংবিধানে তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। রাজনীতিতে তাঁর এই অবদান, তিনবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন এবং দুইবার প্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রীর ভূমিকা পালন সব মিলিয়ে তাঁকে দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক এবং এক সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ, বিশেষ করে সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর অবিচল সংগ্রাম, তাঁকে জনগণের হৃদয়ে ‘গণতন্ত্রের মা’ হিসেবে স্থান দিয়েছে। তাঁর এই মর্যাদা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও সমাদৃত।
কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিগত কয়েক বছর ধরে তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবন্দী থাকতে হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় গৃহবন্দী রয়েছেন। তাঁর এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেশের রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে যখন বাংলাদেশ এক গণতান্ত্রিক উত্তরণের সংকটময় সময় অতিক্রম করছে, তখন বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থ ও সক্রিয় উপস্থিতি একাধিক কারণে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, তিনি জাতীয়তাবাদী এবং গণতন্ত্রকামী শক্তির ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর অটল মনোবল ও অবিচল নেতৃত্ব এই বৃহৎ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের জন্য অপরিহার্য। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ এবং দলের নেতাকর্মীরা তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকেন দিকনির্দেশনার জন্য। এই মুহূর্তে যখন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র মেরামতের প্রক্রিয়া শুরু করার আহবান উঠেছে, তখন সুস্থ খালেদা জিয়ার সক্রিয় অংশগ্রহণ এই ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামকে আরও সুসংহত ও ইস্পাত কঠিন করবে। তাঁর নির্দেশনা ছাড়া এই শক্তিকে কার্যকরভাবে সংগঠিত করা কঠিন হতে পারে, যা গণতান্ত্রিক অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দেশের রাজনীতিতে সুষম ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁর উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী সরকার এবং কার্যকর বিরোধী দল উভয়ই প্রয়োজন। বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান নেত্রী। তাঁর মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে। দেশের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থন তাঁকে এমন একটি অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে, যেখান থেকে তিনি জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টিতে এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
তৃতীয়ত, ফ্যাসিবাদ পরবর্তী রাষ্ট্র মেরামতের জন্য তাঁর মূল্যবান রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা জাতির জন্য এক সম্পদ। বিশেষ করে, দুর্বল হয়ে পড়া গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর সুচিন্তিত পরামর্শ দেশের ভবিষ্যৎ পথচলায় অপরিহার্য। তিনি তাঁর সর্বশেষ ভার্চুয়াল বক্তব্যেও প্রতিহিংসা পরিহার করে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে দেশ পুনর্গঠনের আহবান জানিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে যে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন সর্বদা বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এই ধরনের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আহবান শুধুমাত্র একজন অবিচল নেত্রীর মুখেই মানায়, যার ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস দেশের মানুষ জানে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের উত্তরণে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। বর্তমানে যখন গণতন্ত্রের সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে, তখন তার সুস্থ উপস্থিতি দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করতে পারে। তিনি শুধু একটি দলের নেত্রী নন, তিনি গণতন্ত্রের প্রতীক। তাঁর সুস্থতা কামনা করা তাই কেবল তাঁর দলের নেতাকর্মীদের ব্যক্তিগত চাওয়া নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ ও জাতীয় ঐক্যের জন্য এক গভীর ও কৌশলগত প্রয়োজন। তাঁর সুস্থতা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে এক নতুন আশার আলো বয়ে আনবে, যা দেশকে একটি সত্যিকারের উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে। তাঁর অটল, অবিচল ব্যক্তিত্ব এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় অবস্থান দেশের এই ক্রান্তিকালে সবচেয়ে বেশি কাঙ্ক্ষিত। বেগম খালেদা জিয়া আপনি সুস্থ হয়ে উঠুন। বাংলাদেশ নীডস ইউ মোস্ট।
লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক










