খেলায় বিমুখ নতুন প্রজন্ম, ভয়ংকরভাবে আসক্ত হচ্ছে অনলাইন গেম ও স্মার্টফোনে

1

লায়ন এইচ এম ওসমান সরওয়ার

গ্রাম থেকে শহর দেশজুড়ে খেলাধুলায় আগ্রহ নেই নতুন প্রজন্মের। দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠও। একসময় বিকেল নামলেই ফুটবল, ক্রিকেট ও দড়িলাফ, কাবাড়ি ইত্যাদি খেলায় পাড়া-প্রতিবেশীরা মাঠে জীবন্ত হয়ে উঠতো। শিশু-কিশোরদের হাসি, দৌড়ঝাঁপ আর খেলাধুলার উচ্ছ¡াসিত থাকতো পড়ন্ত বিকালের পুরো সময়। খেলার মাঠ, খালি জায়গায় বা পাহাড়ের পাদদেশ যেখানেই খেলার জায়গা মিলতো সেখানেই শিশু থেকে বয়স্ক সবাই নেমে পড়তো বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলায়। আবার অনেককে দেখা যেতো খেলা উপভোগ করতে। কিন্তু বর্তমানে সেই দৃশ্যের আর দেখা মিলছে না। শিক্ষার্থীরা দুপুরের ছুটিতে স্কুল বা মাদ্রাসা থেকে পালাতো খেলা খেলতে বা দেখতে। এখন সে উৎসাহ কিংবা আগ্রহ কারোরই নেই। ভরদুপুর বা ঝড়বৃষ্টিতেও বিরত রাখতে পারতো না সেই দুরন্ত শিশু-কিশোরদের। তখনকার ফুটবল টুর্ণামেন্ট গুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভীড় দেখা যেতো।
বর্ষার পানিতে ঘর-বালি বানানো, শুকনো বালির (টালে) স্তুপে খেলা করা কিংবা চাঁদের আলোয় হাডুডুর লড়াই, কানামাছি বোঁ ও লুকোচুরির মত আনন্দের—যে দৃশ্যগুলো আমাদের সমাজে ছেলেবেলার পরিচয় তৈরি করেছিল, সেগুলো আজ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে ইতিহাসের পথে চলেছে। সময়ের স্রোতে কেবল বদলে যায়নি জীবনযাত্রা; হারিয়ে যাচ্ছে সেই মাঠ, সেই পরিবেশ, সেই স্বাধীন নন্দিত শৈশব ও কৈশোর।
বর্তমানে অপরিকল্পিত নগরায়ন, দখল, অবকাঠামো নির্মাণ আর পরিকল্পনার ঘাটতিতে শিশুদের শৈশব ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আটকা পড়ছে চার দেয়ালের মধ্যে। খেলাধুলার মুক্ত পরিবেশ হারিয়ে যাওয়ায় শিশুরা এখন ক্রমশ বেশি ঝুঁকছে ভিডিও গেম, অলনাইন জুয়া, সোশ্যাল মিডিয়া ও স্মার্টফোন এর মতো গুরুতর আসক্তির দিকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গায় খেলার মাঠ কমে যাওয়ায় শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আগে বিকেল হলেই পাড়া-প্রতিবেশীর বাচ্চারা মাঠে নেমে ফুটবল, ক্রিকেট বা দড়িলাফে মেতে উঠত। এখন সেই মাঠ হয় দখল হয়েছে, নয়তো নির্মাণাধীন কোনো স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। ফলে শিশুরা সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছে মোবাইল ফোনে।
শিশুমনোবিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মানসিক বিকাশ, শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শারীরিকভাবে দুর্বলতা, স্থূলতা, চোখের সমস্যা এবং ঘুমের ব্যাঘাতও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। মেজাজ হয়ে যাচ্ছে খিটখিটে। বিভিন্ন নেতিবাচক সিরিয়াল বা ভিডিও দেখে রপ্ত করেছে অপরাধ মূলক অপকৌশল।
অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী পরিবার নাই বললেই চলে। তাই শিশুরাও একা হয়ে পড়ছে। অভিভাবকেরাও ব্যস্ত জীবনে সন্তানদের মাঠে নিয়ে যাওয়ার মতো সময় পাচ্ছেন না। নিরাপদ খেলার জায়গা না থাকায় তারাও অনিচ্ছাসত্তে¡ শিশুদের হাতে তোলে দিচ্ছেন মোবাইল ফোন বা ট্যাব।
নগর পরিকল্পনাবিদদের দাবি, স্থানীয় সরকার ও সিটি কর্পোরেশন গুলোর উচিত আবাসিক এলাকায় বাধ্যতামূলক খেলার মাঠ সংরক্ষণ করা। প্রয়োজন নতুন খেলার মাঠ তৈরির পাশাপাশি দখল হয়ে যাওয়া মাঠ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মাঠ ফেরাতে পারলে শুধু শিশুদের সুস্থ শৈশবই ফিরবে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও হবে মানসিক এবং শারীরিকভাবে সুস্থ, সবল ও দক্ষ। খেলাধুলা শিশুদের সহযোগিতা, নেতৃত্ব, সহমর্মিতা ও আত্মবিশ্বাস গঠনে অপরিহার্য।
দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব মাঠ দখল হয়ে গেছে, সেগুলো পুনরুদ্ধার এবং নতুন মাঠ তৈরি এখনই জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। শিশুরা জন্মগতভাবে খেলাধুলা-প্রীতি নিয়ে পৃথিবীতে আসে। মাঠ কেড়ে নেওয়ায় তাদের সেই স্বাভাবিক প্রবণতা দমে যাচ্ছে। আজ মাঠ ফেরানোর লড়াই মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা, তাদের সুস্থ শৈশব ফিরিয়ে দেওয়া।
মাঠকে বাঁচান- শিশুদের বাঁচান ও খেলায় ফেরান।
নইলে স্মার্টফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনে হারিয়ে যাবে নতুন প্রজন্মের সোনালি শৈশব।

লেখক : শিক্ষা সংগঠক, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক