কাউছার আলম, পটিয়া
দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট ইউনিয়নের শান্ত-নিবিড় গৈড়লা গ্রাম। বাংলার ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবের ইতিহাসে এক অনালোচিত কিন্তু অতীব গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানেই তিন বছর আত্মগোপনে থাকার পর ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিলেন কিংবদন্তি বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন। ৯২ বছর পার হলেও এই গ্রামে নেই তাঁর কোনো স্মৃতি, স্মারক কিংবা সরকারি উদ্যোগ। এ নিয়ে আজও ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত তার উত্তরসূরি ও এলাকাবাসী।
চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে এই গ্রামটি একসময় ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম গোপন আশ্রয়স্থল। ১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর প্রায় তিন বছর ধরে এই গ্রামেই আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রæয়ারি রাতে বিশ্বাসঘাতকতায় গৈড়লা গ্রামেই শেষ হয়েছিল তার স্বাধীনতার স্বপ্ন।
সেই বাড়িটি ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়ি, যাকে এলাকার মানুষ এখনও বলেন ‘মাস্টারদার বাড়ি’। কিন্তু সেই বাড়িতে নেই কোনো স্মৃতিফলক, নেই কোনো সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ, এমনকি একটি ছোট্ট সাইনবোর্ডও নেই। ৯২ বছর পেরিয়ে গেলেও মাস্টারদা সূর্য সেনের নামে পটিয়ায় কোনো সরকারি স্মৃতিচিহ্ন নেই, এ আক্ষেপ এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন তার স্বজন ও এলাকাবাসী।
১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন অভিযানের পর মাস্টারদা সূর্য সেন পুরো অঞ্চলের ব্রিটিশ শাসনের চোখে প্রথম সারির ‘ওয়ান্টেড বিপ্লবী’। এর পরের দীর্ঘ তিন বছর তিনি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যান। খুব কম মানুষই জানতেন চট্টগ্রাম শহর থেকে কয়েক মাইল দক্ষিণেই পটিয়ার ধলঘাট ইউনিয়নের গৈড়লা গ্রামের ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে তিনি আত্মগোপনে আছেন। পরে সেখানেই ধরা পড়েছিলেন ব্রিটিশ শাসকদের প্রতিপক্ষ।
মাস্টারদার আত্মগোপনকালীন সেই বিশ্বাস পরিবারের বংশধররা আজও কষ্ট নিয়ে বলেন, এ গ্রাম বিপ্লবের ইতিহাস হলেও সরকার বা প্রশাসন কেউই গুরুত্ব দেয়নি। অথচ দেশের ইতিহাসের অংশ এটি।
বিপ্লবী ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের নাতি দীপক বিশ্বাস বলেন, আমাদের বাড়ি থেকেই মাস্টারদাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশ। আমার দাদি ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাস জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাস্টারদাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ এই বাড়িতে কোনো স্মৃতিফলক নেই। আমরা চাই, অন্তত একটা স্মৃতিস্তম্ভ হোক, যাতে আগামী প্রজন্ম জানতে পারে এখানে কী ঘটেছিল।
আরেক নাতি অশোক বিশ্বাস নিপু বলেন, এটা শুধু আমাদের পরিবারের নয়, এটা পুরো বাংলাদেশের ইতিহাস। যে মানুষটি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন করে ব্রিটিশদের কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, তার শেষ আশ্রয়স্থলের এ অবহেলা আমাদের কষ্ট দেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাস্টারদার প্রপুত্রী রিয়া বিশ্বাস বলেন, আমরা তরুণ প্রজন্ম চাই, এই জায়গাটিকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক।
১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ রাউজানের নোয়াপাড়ায় দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া সূর্য সেন শৈশবেই বাবা-মা হারান। শিক্ষকতাকালিন করতে করতেই যুগান্তর বিপ্লবী দলে যোগ দেন, গড়ে তোলেন সশস্ত্র আন্দোলন। নানা অভিযান শেষে মাস্টারদা শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নেন পটিয়ার ওই দূর গ্রামেই।
কিন্তু এলাকাবাসীর মনের প্রশ্ন- বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের এই অমূল্য প্রতীক কি কোনোদিন তার প্রাপ্য সম্মান পাবে না?
গৈড়লায় ক্ষীরোদ প্রভার বাড়িতে আত্মগোপনে থাকার সময় ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রæয়ারি ব্রজেন সেনের সহোদর নেত্র সেন গোপনে পুলিশকে জানিয়ে দেন যে মাস্টারদা ওই রাতে বৈঠকে বসবেন গৈড়লা গ্রামের বিশ্বাস বাড়িতে।
এরপর রাত ১০টার দিকে পুলিশ ও সেনাবাহিনী পুরো বাড়িটি ঘিরে ফেলে। এক পর্যায়ে গুলি বিনিময় হয়। কল্পনা দত্তসহ চারজন পালিয়ে গেলেও, রাত ২টার দিকে অস্ত্রসহ মাস্টারদা সূর্য সেন ও ব্রজেন সেন ধরা পড়েন। এরপর শুরু হয় বিশেষ আদালতে বিচার। সূর্য সেন, তারকেশ্বর দস্তিদার ও কল্পনা দত্তের।
১৯৩৩ সালের ১৪ আগস্ট মাস্টারদা ও তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি ঘোষণা করা হয়। কল্পনার সাজা হয় যাবজ্জীবন কারাদন্ড।
১২ জানুয়ারি ১৯৩৪ চট্টগ্রাম কারাগারে তাঁদের ফাঁসি কার্যকর হয়। হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সৎকার তো নয়ই ফাঁসির পর দুই বিপ্লবীর দেহ লোহার টুকরা বেঁধে ব্রিটিশ জাহাজ থেকে বঙ্গোপসাগর-ভারত মহাসাগরের গভীরে ফেলে দেওয়া হয়।
এলাকাবাসী ও মাস্টারদার স্বজনদের দাবি একটাই, গৈড়লার ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িটিকে ‘মাস্টারদা স্মৃতি ভবন’ হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক, একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হোক, যাতে আগামী প্রজন্ম জানতে পাওে একজন দেশপ্রেমিকের ইতিহাস।










