সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আযহারী
ভূমিকম্প পৃথিবীর ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি, যা মুহূর্তেই মানুষের জীবন, সম্পদ ও সভ্যতা ধ্বংস করে দেয়। বিজ্ঞান এটিকে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া ও ভূগর্ভস্থ শক্তির মুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তবে ইসলামী দৃষ্টিতে ভূমিকম্প নিছক প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা, সতর্কতা, তাওবার আহবান এবং তাঁর শক্তিমত্তার নিদর্শন। কোরআন ও সুন্নাহ এ ধরনের বিপদকে মানুষের ঈমান, আখলাক ও সমাজ সংস্কারের জন্য শিক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছে। ইতিহাসে বহু জাতি গুনাহ ও অবাধ্যতার কারণে ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়েছে। তাই ইসলাম ভূমিকম্পকে আল্লাহর কুদরত, সতর্কবার্তা, পরীক্ষা এবং কখনো শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
কোরআন, হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্যে ভূমিকম্প:
কোরআন ভূমিকম্পকে আল্লাহর নিদর্শন, সতর্কবার্তা এবং কখনো শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ বলেন: “আমি নিদর্শনসমূহ প্রেরণ করি কেবল ভীতি প্রদর্শনের জন্য” (সূরা ইসরা: ৫৯)। আবার বলেন: “আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাব আকাশমন্ডলীতে ও তাদের নিজেদের মধ্যে” (সূরা ফুসসিলাত: ৫৩)। আরেক স্থানে তিনি বলেন: “তিনি সক্ষম তোমাদের উপর তোমাদের উপর থেকে অথবা তোমাদের পায়ের নিচ থেকে শাস্তি পাঠাতে” (সূরা আন’আম: ৬৫)।
এসব আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে আল্লাহ তাঁর নিদর্শনসমূহের মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করেন। ভূমিকম্প হতে পারে মানুষের জন্য ভীতি প্রদর্শন, সতর্কবার্তা কিংবা শাস্তি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবাদের বক্তব্যেও ভূমিকম্পকে আল্লাহর শাস্তি ও সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হয়েছে। জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, যখন আয়াত নাযিল হলো-“তিনি সক্ষম তোমাদের উপর তোমাদের উপর থেকে শাস্তি পাঠাতে”-তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: হে আল্লাহ !“আমি আপনার আশ্রয় চাই” (সহিহ বুখারি)। মুজাহিদ (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “উপর থেকে শাস্তি” অর্থ আসমান থেকে ভয়ঙ্কর আওয়াজ, পাথর বর্ষণ ও ঝড়; আর “পায়ের নিচ থেকে শাস্তি” অর্থ ভূমিকম্প ও ভূমিধস।
এভাবে হাদিস ও তাফসীর থেকে বোঝা যায়, ভূমিকম্প আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা, যা মানুষের গুনাহ ও অবাধ্যতার কারণে নাযিল হতে পারে, আবার মুমিনদের জন্য পরীক্ষা হিসেবেও আসতে পারে।
ভূমিকম্প: আল্লাহর হিকমত ও নিদর্শন :
ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগ নিছক প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; বরং আল্লাহর হিকমত ও নিদর্শন। আল্লাহ বান্দাদের ভয় প্রদর্শন করেন, তাঁর হক আদায়ের কথা স্মরণ করান এবং শিরক ও গুনাহ থেকে সতর্ক করেন। কোরআনে বলা হয়েছে: “আমি নিদর্শনসমূহ প্রেরণ করি কেবল ভীতি প্রদর্শনের জন্য” (ইসরা: ৫৯), “আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাব আকাশমন্ডলীতে ও তাদের নিজেদের মধ্যে” (ফুসসিলাত: ৫৩)। সাহাবারা ভূমিকম্পকে আল্লাহর সতর্কবার্তা হিসেবে দেখেছেন, যা মানুষকে তওবা, খোদাভীতি ও গুনাহ থেকে বিরত হওয়ার দিকে আহবান করে।
অতএব, ভূমিকম্প, ঝড়, বন্যা ইত্যাদি আল্লাহর নিদর্শন, যা আমাদেরকে তওবা, দোয়া, ইস্তিগফার, সদকা এবং নেক আমল বৃদ্ধির শিক্ষা দেয়। একজন মু’মিনের জন্য এগুলো আত্মসমালোচনা, সংশোধন এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক মহামূল্যবান সুযোগ।
ভূমিকম্প অতীত জাতির শাস্তি, এ উম্মতের পরীক্ষা এবং কিয়ামতের আলামত :
ভূমিকম্প অতীত জাতির জন্য আল্লাহর শাস্তি ছিল, যেমন আদ, সামুদ, মাদইয়ান ও ফেরাউনÑযারা শিরক ও অবাধ্যতার কারণে ধ্বংস হয়েছিল। কোরআনে বলা হয়েছে: “আমি প্রত্যেককে তার গুনাহের কারণে পাকড়াও করেছি।” (আনকাবুত: ৪০)। এসব ঘটনা আমাদের জন্য শিক্ষা ও সতর্কবার্তা।
আল্লাহ বলেন: “তোমাদের উপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের নিজেদের কাজের কারণে; আর তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।” (শূরা: ৩০)। অর্থাৎ বিপর্যয় মানুষের গুনাহের ফল, তবে আল্লাহর রহমত বিপদকে তওবার সুযোগে রূপান্তরিত করে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আমার উম্মত রহমতপ্রাপ্ত উম্মত। তাদের আখিরাতে সাধারণ শাস্তি নেই; তাদের শাস্তি দুনিয়াতে-ফিতনা, ভূমিকম্প ও হত্যা।” (আবু দাউদ, আহমাদ)। অর্থাৎ এ উম্মতের জন্য বিপদগুলো পরীক্ষা ও সতর্কবার্তা।
ভূমিকম্প কিয়ামতের অন্যতম আলামত: ভূমিকম্প কিয়ামতের অন্যতম আলামতও। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না ভূমিকম্প ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।” (বুখারি)। অন্য হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের আগে ব্যাপক মৃত্যুর পর ধারাবাহিক ভূমিকম্পের বছর আসবে এবং মাহদীর আগমনের সময় বিরোধ ও ভূমিকম্প দেখা দেবে।
ভূমিকম্প অতীত জাতির শাস্তি, এ উম্মতের জন্য পরীক্ষা এবং কিয়ামতের আলামত। এগুলো মানুষকে মনে করিয়ে দেয়-মানুষ দুর্বল, আল্লাহ সর্বশক্তিমান, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী এবং মৃত্যু হঠাৎ আসতে পারে। তাই প্রতিটি বিপর্যয়কে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
ভূমিকম্প: গুনাহর কারণ, আল্লাহ তাআলার পরীক্ষা ও পাপ মোচনের কারণ :
ভূমিকম্প ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ইসলাম নিছক প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখেনি; বরং এগুলোকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য সতর্কবার্তা, পরীক্ষা এবং কখনো শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে আল্লাহর প্রতি সচেতন করে তোলে, তওবার দিকে আহবান জানায় এবং মুমিনদের জন্য আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করে। একজন মু’মিন যখন বিপদের মুখোমুখি হয় এবং ধৈর্য ধারণ করে, তখন তা তার পাপ মোচনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কোরআনে আল্লাহ বলেন: “তোমাদের উপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের কাজের কারণে; আর তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।” (সূরা আশ-শূরা: ৩০)। আবার বলেন: “তোমার কাছে যে কল্যাণ আসে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে; আর যে অকল্যাণ আসে, তা তোমার নিজের পক্ষ থেকে।” (সূরা নিসা: ৭৯)।
অতীত জাতির ধ্বংসের প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: “আমি প্রত্যেককে তার গুনাহের কারণে পাকড়াও করেছি। তাদের কেউ ছিল যাদের উপর আমি ঝড় পাঠিয়েছি, কেউ ছিল যাদেরকে ভয়ঙ্কর আওয়াজ গ্রাস করেছে, কেউ ছিল যাদেরকে আমি ভূমিধসে ধ্বংস করেছি, আর কেউ ছিল যাদেরকে আমি পানিতে ডুবিয়েছি। আল্লাহ তাদের প্রতি জুলুম করেননি; বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছে।” (সূরা আনকাবুত: ৪০)। এসব আয়াত স্পষ্ট করে যে বিপর্যয় মানুষের গুনাহ, শিরক ও অবাধ্যতার কারণে নাযিল হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “এক মুসলিমের উপর যা কষ্ট, দুঃখ, শোক বা আঘাত আসে-এমনকি কাঁটা পর্যন্ত-তাও আল্লাহ তার পাপ মোচন করেন।” (সহিহ বুখারি)। অর্থাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মুমিনের জন্য পরীক্ষা, আর ধৈর্য ধারণ করলে তা পাপ মোচনের মাধ্যম হয়ে যায়। অন্য এক হাদিসে তিনি সতর্ক করেছেন: “কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না ভূমিকম্প ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।” (সহিহ বুখারি)।
সাহাবা ও তাবেঈনরাও ভূমিকম্পকে গুনাহের ফল এবং আল্লাহর সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। হযরত উমর (রাঃ) মদীনায় ভূমিকম্প হলে বলেছিলেন: “এটি যদি আবার ঘটে, আমি তোমাদের সাথে এখানে বসবাস করবো না।” তিনি মনে করতেন এটি মানুষের নতুন গুনাহের কারণে হয়েছে। কাআব আল-আহবার (রহ.) বলেন: “যখন জমিনে গোনাহ বাড়ে, তখন পৃথিবী কাঁপে এবং ভয় পায় যে আল্লাহ তার উপর তাকিয়ে আছেন।” হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেছেন, যখন মানুষ ব্যভিচারকে বৈধ করে নেয়, মদ পান করে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজায়, তখন আল্লাহ আসমানে ক্রুদ্ধ হন এবং পৃথিবীকে বলেন: তাদেরকে কাঁপিয়ে দাও। যদি তারা তওবা করে ও বিরত হয়, তবে রক্ষা পাবে; অন্যথায় ধ্বংস হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার যুগেও পৃথিবী কেঁপে উঠেছিল। তিনি হাত রেখে বলেছিলেন: “শান্ত হও, এখনো তোমার সময় আসেনি।”
তাবেঈনদের মধ্যে উমর ইবন আবদুল আজিজ (রহ.) ভ‚মিকম্পকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বিভিন্ন শহরে লিখে পাঠিয়েছিলেন যে এ ধরনের বিপর্যয়ের সময় মুসলিমদের উচিত সদকা করা, সালাত আদায় করা এবং দোয়া-দূরুদ পাঠ করা।
অতএব, আজকের যুগে যে ভূমিকম্প বিভিন্ন স্থানে ঘটছে, তা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো বান্দাদের ভয় প্রদর্শনের জন্য, যাতে তারা গুনাহ থেকে বিরত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।
মুসলিম ও অমুসলিম সকলেরই উচিত আল্লাহর দিকে তওবা করা, তাঁর দ্বীনে দৃঢ় থাকা এবং শিরক ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। আল্লাহ বলেন: “যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের উপর আকাশ ও পৃথিবী থেকে বরকত বর্ষণ করতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা বলল, ফলে আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কারণে পাকড়াও করলাম।” (সূরা আ’রাফ: ৯৬)।
ভূমিকম্প ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ আল্লাহর নিদর্শন। এগুলো মানুষের গুনাহ, শিরক ও অবাধ্যতার কারণে নাযিল হয়। মুমিনদের জন্য এগুলো সতর্কবার্তা ও তওবার আহবান, আর কাফিরদের জন্য শাস্তি। ধৈর্য, তাওবা, ইস্তিগফার ও সদকার মাধ্যমে এ পরীক্ষাকে পাপমুক্তির সুযোগে রূপান্তরিত করা যায়। অতএব, প্রতিটি বিপর্যয়কে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
ভূমিকম্প নিছক প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; বরং আল্লাহর নিদর্শন, তাঁর কুদরতের প্রকাশ, সতর্কবার্তা এবং কখনো পরীক্ষা বা শাস্তি। কোরআন ও সুন্নাহ জানায়-মানুষের গুনাহ, শিরক ও অবাধ্যতার কারণে বিপর্যয় নাযিল হয়। তবে মুমিনের জন্য এগুলো আত্মসমালোচনা ও তওবার সুযোগ, আর ধৈর্য ধারণ করলে তা পাপ মোচনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
ভূমিকম্পের সময় মুসলিমদের করণীয় :
ভূমিকম্পের সময় মুসলিমদের করণীয় হলো-তওবা করা, দোয়া করা, গুনাহ থেকে বিরত থাকা, সদকা করা, নেক আমল বৃদ্ধি করা এবং বেশি বেশি জিকির করা। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো, পুনর্গঠন ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করা, দুর্বলদের সাহায্য করা এবং বৈজ্ঞানিক সতর্কতা গ্রহণ করা জরুরি। ধসে মারা গেলে শহীদের মর্যাদা পাওয়া যায়।
অতএব, ভূমিকম্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষ দুর্বল, আল্লাহ সর্বশক্তিমান, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী এবং মৃত্যু হঠাৎ আসতে পারে। তাই প্রতিটি বিপর্যয়কে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তওবা, ইস্তিগফার, নামাজ, দোয়া ও সদকার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত আহবান করা যায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা লাভ করা সম্ভব।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হিফাজত করুন, ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ বানান, এবং বিপদকে আখিরাতের মুক্তির পথ বানিয়ে দিন। আমিন।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ,
সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় খতীব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ










