কোয়েল খামার দিয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয়

1

এম সাইফুল্লাহ চৌধুরী, লোহাগাড়া

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামিয়া পাড়ার এক তরুণ জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী মোহাম্মদ মুরাদ প্রমাণ করলেন কোনো বাধাই জীবনের অগ্রযাত্রা থামাতে পারে না। মুরাদের বাবা জসিম উদ্দিন পেশায় একজন লেগুনা চালক। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় মুরাদ ছোটবেলা থেকেই দুটি পায়ের সমস্যায় ভুগছেন। পা না থাকায় বা চলাফেরা করতে না পারায় অনেকেই যেখানে জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সেখানে মুরাদ হাতের ওপর ভর করে নিজ গতিতে এগিয়ে গেছেন। কিন্তু শারীরিক সমস্যাকে তিনি শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। বর্তমানে তিনি আলহাজ্ব মোস্তফিজুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের একাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। নিয়মিত ক্লাস করা থেকে শুরু করে পড়ালেখায় মনোযোগ, সবকিছুতেই মুরাদের দৃঢ়তা প্রশংসনীয়।
পড়ালেখার পাশাপাশি নিজের প্রয়োজন মেটাতে এবং পরিবারের পাশে দাঁড়াতে মুরাদ ঘরে বসেই শুরু করেছেন কোয়েল পাখির খামার। কারো কাছে হাত না পেতে নিজের প্রতিভা দিয়ে ২০২৩ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকে তার বাড়ির পাশে ১২ দিনের হাইব্রিড জাতের ৫০পিস কোয়েল পাখি সংগ্রহ করে শখের বশে গড়ে তুলেন খামার। পরবর্তীতে ৪০ দিনের মধ্যে এ পাখি ডিম দিতে শুরু করল। আস্তে আস্তে তার কঠোর পরিশ্রমের ফলে ব্যবসায় রূপ দিলেন মুরাদ। পরবর্তীতে সে ৩ হাজার কোয়েল পাখি (মাদার পাখি) নিয়ে ব্যবসা যাত্রা শুরু হয়। সমৃদ্ধি আর সফলতা শুরু হয় তার। মাদার পাখি প্রতিদিন ২ হাজার ৭ শ টির মত ডিম দিয়ে থাকে। যাতে বাণিজ্যিকভাবে তার কোয়েল পাখির ব্যবসা স¤প্রসারণ হয়েছে। কোয়েলের ডিম বিক্রি করে লাভের মুখ দেখেন এ উদ্যোক্তা। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির পাশেই পড়ালেখার পাশাপাশি মুরাদ কোয়েল ফার্ম এন্ড হ্যাচারি নামে তার টিনসেড ঘর রয়েছে। সেখানে প্রায় ৩ হাজার কোয়েল পাখি রয়েছে। তিনি ও তার পরিবারের লোকজন এগুলোর দেখাশুনা করছেন। এছাড়াও তিনজনের মত কর্মচারী রয়েছে তার খামার পরিচালনার জন্য।
যার ফলে তাদেরও তৈরি হয়েছে একটি কর্মসংস্থান। প্রতিনিয়ত এ খামার থেকে সংগ্রহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৭ শত ডিম। ৪০ দিনের মধ্যে ডিম দেয় ৪০০ গ্রাম করে। ১০০ গ্রাম কোয়েল পাখি পাইকারি দরে বিক্রি ৩৫ টাকায় এবং প্রতি পিস ডিম পাইকারি বিক্রি করছেন ৩ টাকা দরে। খামারটি পাখির কিচিরমিচির ডাকে মুখরিত থাকে। মালিক দেখেখাবার আশায় ছোটাছুটি করে পাখিগুলো। এছাড়াও খুচরা বিক্রি করার ও ব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে কোয়েল পাখির ডিম, কোয়েল পাখি পাওয়া যায়। খরচ বাদে এতে তার মাসে আয় হচ্ছে লাখ টাকার মত।
সফল কোয়েল খামারি, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মোঃ মুরাদ জানান, ২০২৩ সালে বাড়ির পার্শ্বে ১২ দিনের হাইব্রিড জাতের ৫০ পিস কোয়েল পাখি সংগ্রহ করে শখের বসত গড়ে তুলেছিলাম খামার। ডিমের চাহিদা এবং মাংসের চাহিদা বেশি থাকায় পরিবারের সহায়তায় পরবর্তীতে বাণিজ্যিকভাবে কোয়েল খামার গড়ে তুলি। এ খামারে প্রতিদিন পাখির জন্য চার বেলা খাবার দেয়া লাগে। দিনে ২ বার ও রাতে ২ বার করে মোট ৪ বার স্টাটার ফিড ও কোয়েল ফিড দিয়ে থাকি।
মুরাদের মা-বাবা জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে ছেলের জন্য মন খারাপ লাগলেও তার ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম দেখে আজ আমরা গর্বিত। প্রতিবেশীরাও মুরাদকে সমর্থন করে এবং তার খামারের কোয়েল ও ডিম কিনে সহযোগিতা করেন।
মুরাদ বলেন, “আমি কখনো নিজেকে দুর্বল ভাবিনি। চলাফেরা করতে কষ্ট হয় ঠিকই, কিন্তু স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। পরিশ্রম করলে নিজের পায়ে দাঁড়ানো যায়,আমি সেটা প্রমাণ করতে চাই।”
আলহাজ্ব মোস্তফিজুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ ইলিয়াছ জানান, শারিরিক প্রতিবন্ধী হয়েও কঠোর পরিশ্রম ও তার প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে কোয়েল পাখির খামার করে মুরাদ লাভবান হয়েছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সেতু ভ‚ষণ দাশ জানান, মুরাদ কোয়েল পাখির পালন করে সফল হয়েছেন। তার ফার্মে প্রথমে ৫০ টি দিয়ে শুরু করেছিল এখন তার ফার্মে প্রায় ৩ হাজারের মতো কোয়েল পাখি রয়েছে। কোয়েল পাখির খামার একটি লাভজনক ব্যবসা। সম্প্রতি তিনি প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনীতে পোল্ট্রি ক্যাটাগরিতে ১ম পুরস্কার পেয়েছিলেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার(ইউএনও) মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, মুরাদ আমাদের সকলের অনুপ্রেরণা। পড়ালেখার পাশাপাশি একজন সফল খামারি তিনি।