কোটি টাকার ‘ওয়াসা নাইট’ নিয়ে মাতোয়ারা কর্মকর্তারা

138

নগরবাসীর পানির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেই জন্ম চট্টগ্রাম ওয়াসার। নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ করার কথা থাকলেও নানা সমস্যায় এখনো পর্যন্ত সে লক্ষ্যের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। রেশনিং পদ্ধতিতেও (কোনো একটা নির্দিষ্ট সময়ে) পানির চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এমন চরম অবস্থায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোরঞ্জনের জন্য কোটি টাকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ওয়াসা।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোরঞ্জনের জন্য ‘ওয়াসা নাইট’ নামের এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে নগরীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন হলে। আজ (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হবে অনুষ্ঠান। এতে চিত্রনায়ক ফেরদৌস, মিস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্স বাংলাদেশ ২০১৭’ প্রতিযোগিতার বিজয়ী তাহমিনা অথৈ থাকছে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে। ‘ওরে সাম্পানওয়ালা’ গানটিতে চিএনায়ক ফেরদৌসের সাথে জুটি হয়ে মঞ্চ মাতাবেন অথৈ। তাছাড়া ঢাকার শিল্পি তুহিন ও আনিকা পরিবেশন করবেন গান। থাকবে মীরাক্কেল পারফরমারদের উপস্থাপনা। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করতে যাচ্ছে ওয়াসা। সাংস্কৃতিক এ সন্ধ্যায় ওয়াসার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নির্ধারিত কিছু রাজনৈতিক নেতা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, কর্পোরেট হাউসের কর্মকর্তা, বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি ও কিছু সাংবাদিকদের দাওয়াত করা হয়েছে। রাখা হয়েছে রাতে ভুড়িভোজের ব্যবস্থাও। পুরো অনুষ্ঠানের খরচ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করছেন ওয়াসার কর্মকর্তারাই। তবে এ বাজেটের প্রকৃত পরিমান ও উৎস সম্পর্কে জানেন না তারাও।
‘ওয়াসা নাইট’ সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ বলেন, এটা স্টাফদের একটা অনুষ্ঠান, গেট টুগেটার। আরো অনেক আগে একবার হয়েছে। অফিসের মধ্যে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করি। এবার একটু বড় আকারে করতেছি।
নগরবাসী পানি কষ্টে থাকা অবস্থায় এমন মনোরঞ্জনমূলক আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পানি ইনশাআল্লাহ পাবে। দুই-এক জায়গায় না পাওয়ার সম্ভাবনা সবসময় থাকে। ৯০ শতাংশ মানুষ পানি পাবে। একটা সমস্যা ছিলো সেটা সমাধান করা হয়েছে। আস্তে আস্তে পানি পাবে। প্রেসার দিতে পারছি না, পাইপ ফেটে যাবে। প্রেসার দিলে পানি নিয়মিত যাইতো। পানি দেওয়ার জন্য আমরা কমিটেড। অনুষ্ঠানের সাথে এটার কোনো সম্পর্ক আছে মনে হয় না।
অনুষ্ঠানের বাজেটের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রকৌশলী ফজলুল্লাহ বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান।
ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, মদুনঘাট পানি সরবরাহ প্রকল্প উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকেই ‘ওয়াসা নাইট’ করার পরিকল্পনা নেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সে অনুযায়ী আরো তিনমাস আগেই ওয়াসা নাইট হওয়ার কথা ছিলো।
কিন্তু নির্বাচনসহ নানা কারণে সে পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে নতুন প্রকল্পের পানি আসায় নগরবাসীর সাথে একটি মেজবানের আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তীতে সেটাকে শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোরঞ্জনের অনুষ্ঠানের রূপ দেওয়া হয়। কোটি টাকা বাজেটের এতো বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও এ সম্পর্কে অবগত নন ওয়াসার অনেক কর্মকর্তারাও। শুধু সিনিয়র কয়েকজন কর্মকর্তাই জানেন এ অনুষ্ঠান সম্পর্কে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার একজন কর্মকর্তা বলেন, মঙ্গলবার একটা অফিস আদেশের মাধ্যমেই ওয়াসা নাইটের কথা জানি। সেখানে ৩৫ জনের একটি কমিটি ও কয়েকটি উপকমিটি রাখা হয়েছে। কি হচ্ছে না হচ্ছে সেটা বলতে পারবো না। তবে বিশাল বাজেটের কিছু একটা হতে যাচ্ছে এমনটা শুধু জেনেছি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সকল সংস্থাকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। ওয়াসার নিজস্ব ও আউটসোর্সিং মিলে জনবল আছে প্রায় ১১শ জন। সব মিলিয়ে ৫ হাজারের অধিক লোকজনের আয়োজন থাকছে বলে জেনেছি।
এদিকে ওয়াসা যখন আজ সন্ধ্যায় মনোরঞ্জনে ব্যস্ত থাকবে তখন নগরীর এক তৃতীয়াংশ মানুষ পানি সংকটে থাকবেন। বাকলিয়া, পাথরঘাটা, ফিরিঙ্গিবাজার, হালিশহর, আগ্রাবাদ, রামপুরা, দেওয়ান বাজারসহ অনেক এলাকায় গত কিছু দিন ধরে পানি নেই। নগরবাসীকে পানির কষ্টে রেখে ওয়াসার এমন ভুড়িভোজের আয়োজন নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
গতকাল ওয়াসা ভবনের সামনে কথা হলে দেওয়ান বাজার মৌসুমি আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সাইফুর রহমান বলেন, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মৌসুমি আবাসিক এলাকায় পানি নেই। ঘরের দৈনন্দিন কাজ পর্যন্ত করা যাচ্ছে না। ওয়াসায় বারবার যোগাযোগ করেও কোনো কাজ হয়নি। এসেছিলাম, কখন পানি পাওয়া যাবে সেটা জানার জন্য। দেখি, সবাই অনুষ্ঠানের কাজে ব্যস্ত। আমরা পানির কষ্টে ভুগতেছি আর ওনারা আছেন আনন্দে।