কেমন করে এমন হলাম

3

শিবুকান্তি দাশ

আমার লেখালেখি জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল, সম্ভবত ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কাছে থেকে দেখা । সের্বা আমার জন্মভূমি পটিয়া হাই স্কুলের মাঠেই মনে হয় বঙ্গবন্ধু শেষ বারের মতো এসেছিলেন। আমাকে কে নিয়ে গিয়েছিল আমার মনে নেই। আমার বয়স তখন ৫ কি ৬। আর ৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে যখন নির্মম ভাবে হত্যা করা হয় সেদিনের কথা গুলো আমার আজো মনে আছে। আমাদের ঘরে একটা সোনালী ফ্রেমে বাধা বঙ্গবন্ধুর ছবি ছিল। সেসময় ছবিটা খুলে ছাদের ঘরে নিয়ে রাখা হয়েছিল। এরপর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডের কথা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি ও রাজিব গান্ধি হত্যার দৃশ্য টিভিতে দেখেছি। এ হত্যাকান্ড গুলো নিয়ে মানুষের মুখে নানা কথা শুনেছি এবং সেদিনকার পরিস্থিতি দেখেছি। একদিন পড়তে বসে মনে পড়ল বঙ্গবন্ধুর সোনালী ফ্রেমের ছবিটার কথা। ঘরে কেউ সেই ছবির কথা বলে না। সেই ছবি নাকি কারো ঘরে থাকলে তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। ওমা সেকি কথা। আমার ভেতর হঠাৎ গুমড়ে কান্নার মতো জেগে উঠল। আমার মনের অজান্তে তখন খাতায় লিখেছি, বঙ্গবন্ধু তোমায় আমি দেখেছি তুমি নাকি আর নেই আমাদের মাঝেতা কি করে হয়, আমি যে তোমাকে দেখেছি স্কুলের মাঠে ভাষণ দিতে তোমার ছবিটাও আমাদের ঘরে নেই। তুমি কি দোষ করেছো যে তোমার ছবিটাও রাখা যাবে না। তোমার ছবি টা না দেখলে আমার ঘুম আসে না পড়তে ইচ্ছে করে না। খেতেও পারি না তুমি আসো আবার আমাদের স্কুলের মাঠে কথা দাও বঙ্গবন্ধু, আবার তোমায় দেখতে যাবো ধুলামাখা পথ মাড়িয়ে।আমার লেখালেখির শুরুটা মূলত হাই স্কুল থেকে। তখন ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়ি । একদিন আমার মামার বাড়ি থেকে আমার ঠাকুমা আসে আমাদের বাড়িতে। কি জন্যে আমাকে খুব বকাবকি করে। এতে করে আমার খুব খারাপ লাগছিল। আমার পড়ার ঘরের দরজা বন্ধ করে মন খারাপ করে বসি থাকি । কিছুক্ষণ পর আমার মাথায় কি এলো আমি এ ঘটনা নিয়ে একটা গল্প লিখে ফেলি। লেখাটা কখন কোথায় হারিয়েছি মনে পড়ে না। তবে তারপর থেকে পড়ার ফাঁকে ছড়ার মতো, কবিতার মতো লিখছি । তারপরের বছর আমার লেখালেখির যেন আসল জানালা খুঁজে পেলাম । দুপুরে প্রায়দিন আমি বাবার জন্য দোকানে খাবার নিয়ে যেতাম। বাবা দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার পাঠক সেই পাকিস্তান থেকে। দুপুরে বাবার ঘুমুবার অভ্যাস। এ সময় আমি বসে বসে পত্রিকায় চোখ বুলাতাম। পড়ার চেষ্টা করতাম। একদিন বাবার বন্ধু প্রয়াত বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক কবিয়াল এস এম নুরুল আলম আমার পত্রিকা পড়া দেখে বললেন, আমি পড়তে পারি কিনা। তিনি পত্রিকার বড় বড় অক্ষরে লেখা নিউজের হেডিং গুলো পড়তে বলতেন। এভাবে আমার পত্রিকা পড়ার অভ্যাস। তার কিছু দিন পর আমার হাতে এনে দিলেন ‘ইন্দিরাকে লেখা চিঠি’ একটি বই। লেখক মহত্না গান্ধী। বইটি পড়ে আমার নেশা জেগে উঠল। এস এম চাচা কয়েকদিন পর আমাকে আরেকটা বই এনে দিলেন। আমার নেশা আর থামে না। এরমধ্যে স্কুলে একদিন নোটিস দিয়ে জানানো হলো টিপিন ছুটিতে ছাত্ররা যেন স্কুলের লাইব্রেরীতে পত্রিকা ও বই পড়ে । বাড়িতে বই নেয়ারও সুযোগ দিলেন। আর কি। প্রথম দিন আমি বাড়িতে বই নিলাম সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘চাচা কাহিনী’। আমাদের হুজুর স্যার লাইব্রেরীর দায়িত্ব পালন করতেন। ক্লাস টেনে পড়ার মাঝামাঝি সময় একদিন এস এম চাচা পটিয়া ক্লাবে অবস্থিত মোস্তাফিজুর রহমান পাবলিক লাইব্রেরীর একটা সদস্য ফরম এনে আমার বাবার হাতে দিয়ে বললেন ৩০ টাকা দিয়ে আমাকে যেন ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। সামনে আমার এস এস সি পরীক্ষা বিধায় বাবা লাইব্রেরীতে ভর্তির বিষয়ে একটু নাখোশ হলেও আমাকে পরদিন ফরম ও টাকা দিয়েছেন। তারপর তো আমার বই পড়ার পৃথিবী অনেক বড় হয়ে গেলো। প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় লাইব্রেরী খুলে। অনেক সময় তার আগে গিয়ে হাজির হতাম । তখন দৈনিক সংবাদ ছিলো লাইব্রেরীর পাঠকদের কাছে কোপ্তা পোলায়ের চেয়েও মজার । বৃহস্পতিবার সাহিত্যপাতায় সৈয়দ শামসুল হকের দ কলামের টানে’ কলাম গিলতাম গো গ্রাসে । এক সময় জানলাম সেখানে সৃজনশীল সাহিত্য গোষ্ঠী মালঞ্চের সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হয়। তারপর তো কথায় নেই। প্রতিমাসে লেখা নিয়ে হাজির হচ্ছি। রাশিদুল হক মিজান ভাই, অধ্যাপক আবদুল আলীম স্যার সহ অনেকে মালঞ্চের সভায় উপস্থিত হচ্ছেন,যাদের সাথে আমার আগেই পরিচয়। তা ছাড়া স্কুলের সহপাটি জাফর আহমদ রাশেদ, জামাল ভাই, আকতার সহ অনেকে নিয়মিত লিখিয়ে। ভালোই লাগতেছিল। চট্রগ্রাম শহর থেকে অতিথি হয়ে আসতেন কবি রাশেদ রউফ, রহীম শাহ, ওমর কায়সার, অনিল চক্রবর্তী সহ অনেক সাহিত্যিক। তাদের সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে চট্রগ্রাম শহলে স্বকাল সাহিত্যাসর, ছড়া সাহিত্য পরিষদ, কচিহাতসহ নানা সাহিত্য সংগঠনের লেখাপাঠে অংশ নিতে শহরে যাতায়াত করতাম বাড়ির লোকজনকে ফাকি দিয়ে কিংবা মিথ্যা বলে। সেখানেও অগ্রজ লেখকদের মুখে নিজের লেখার আলোচনা সমালোচনা শুনে লেখালেখির চর্চ্চাকে এগিয়ে নেয়ার নিরন্তর চেষ্ঠা করছি। এখনো তাদের পরামর্শ নিয়ে আমার লেখালেখিকে এগিয়ে নিচ্ছি। লেখালেখির নেশা থেকেই মূলত ঢাকায় এসে পেশাগত জীবন শুরু করেছি। মাঠের খেলোয়ার থেকে কবে যে আমি বইয়ের পোকা আর কবিতার ছেলেপুলে হয়ে গেছি আমি নিজেও জানি না। আমার প্রতিষ্ঠিত পাড়ার ’কিশোর সংঘ’এ নিজের বিভিন্ন বই দিয়ে লাইব্রেরী চালু করার চেষ্ঠা করেছি । পরে অবশ্য মালঞ্চ গণপাঠাগার প্রতিষ্ঠা করে সেদিনের কিছুটা হলেও তৃপ্তি নিয়েছি। কিশোর সংঘের আমি প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। এ সময় আমি খাজা বাবা, বড়পীর সাহেবের বার্ষিক ওরশ উপলক্ষে মিলাদ মাহফিল ও শিন্নির ব্যবস্থা করতাম। শুধু তাই নয় আমির ভান্ডার দরবার শরীফের সাপ্তাহিক জিকিরেও যেতাম। দরবারের হুজুরদের কয়েকজন ছেলে আমার সহপাটি ছিল প্রাইমারি স্কুলে। মূলত তাদের আমন্ত্রনে যাওয়া হতো। এছাড়াও শ্রাবণ মাসে পুরো মাস জুড়ে মনসা মঙ্গল পুঁথি পড়া হতো ঘরে ঘরে। আয়োজন হতো পাল্টা মনসা পুঁথির বড় আয়োজন। গায়কদের যুক্তি র্তক গুলো আমাকে খুব দোলা দিত। একবার তো ভাটিখাইন এক জায়গায় পাল্টা পুঁথি দেখতে গিয়ে এক জ্বীনের দেখা পেয়েছিলাম। সে অনেক কথা । ১৯৮৫ সালে পটিয়া হাইস্কুলের ১৪০ বছর পূর্তিতে তিন দিন ব্যাপি অনুষ্ঠানের বিশাল আয়োজন। আবছার স্যারের পরিচালনায় নাটক ‘আপট্রেন ’মঞ্চস্থ হয় । নাটকে অভিনয় করতে না পেরে আমার মন খারাপ। পরে আমাকে বিজ্ঞান মেলায় ‘দূরবীন’ প্রদর্শন করতে দেয়া হয়েছিল। স্কুলের এ বিশাল আয়োজনে একটি দেয়াল পত্রিকাও প্রকাশ করা হয়। সম্ভবত এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন আমাদের পিযুষ দেওয়ানজী স্যার। সেখানে আমার প্রথম একটি ছড়া ছাপা হয় । সে লেখাটা যে কত জনকে দেখিয়েছি। তারপর থেকে দৈনিক নয়া বাংলা, আজাদীর আগামীদের আসরের নিয়মিত পাঠক । ১৯৮৯ এ দৈনিক আজাদীতে আমার ‘হেমন্তের ছড়া’ নামে একটি ছড়া ছাপে। এরপর থেকে পত্রিকায় লেখালেখি শুরু। কখনো ভাবি নাই লেখালেখি করবো, বই বেরুবে আমার এবং বইয়ের জন্য পুরস্কারও পাবো। আমার প্রথম পুরস্কার ‘রোদের কণা রূপোর সিকি’ গ্রন্থের জন্য পেলাম এম নূরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০০৭, দ্বিতীয় পুরস্কার ২০১৩ সালে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেলাম আমার মুক্তিযুদ্ধের কিশোর উপন্যাস ‘ যুদ্ধদিনের গল্প’ গ্রন্থের জন্য। তৃতীয় পুরস্কার পেলাম ২০১৭ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পরিচালিত ‘অগ্রণী ব্যাংক -শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার ও চট্রগ্রাম সিটি কর্পোরেশন একুশে সম্মাননা পদক ও পুরস্কার ২০২৩। কথা আছে না, ‘যা চাই তা পায় না ,যা পায় তা ভূল করে পায়’। লেখালেখি করব কখনো ভাবি নাই স্বপ্নও দেখি নাই।
আমার বইয়ের সংখ্যা ৩৩। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলো হচ্ছে, মাঠ পেরুলেই বাড়ি,রোদের কণা রূপোর সিকি, একটি ছড়া আকঁব বলে, আমাদের ছুটি আজ, রানী পুকুরের দুষ্ট ভুত, যুদ্ধদিনের গল্প, মিলিটারি এলো গ্রামে, আমার বঙ্গবন্ধু আমার স্বাধীনতা,নদীর মতো মা এবং আমাদের গুডবয়। বাপ দাদারা ব্যবস্যা করতেন। আমারও চিন্তা ছিল হয়ত ব্যবসা করবো। কিন্তু হলাম সাংবাদিক ও লেখক। সবাই আমার জন্য আর্শিবাদ ও দোয়া করবেন আগামী দিনগুলোতে যেন আরো সুন্দর কিছু অর্জন করতে পারি।সবার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই।

অনুলিখনঃ অপু বড়–য়া