
মুফতি শাহ্ ফাইজুল কাবির চৌধুরী
মানবাধিকার আজকের বিশ্বে মানবসমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা—এ চারটি স্তম্ভকে কেন্দ্র করেই আধুনিক মানবাধিকারের ধারণা গড়ে উঠেছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানবাধিকারের এই মূলনীতি আধুনিক কোন ধারণা নয়; বরং ইসলাম তার প্রাথমিক যুগেই মানবাধিকারের সর্বজনীন ভিত্তি স্থাপন করেছে। কুরআন ও হাদীসের আলোকে ইসলামের মানবাধিকার দর্শন শুধু ধর্মীয় নির্দেশনা নয়; এটি মানবতার জন্য আলোকবর্তিকা।
মানবমর্যাদা: ইসলামী মানবাধিকার ধারণার মূলসূত্র :
ইসলামের মানবাধিকার শুরুই হয়েছে মানুষের মর্যাদা ঘোষণা দিয়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন “আর নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।” (সুরা ইসরাঃ ৭০)।
এ মর্যাদা মানুষের জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রের ওপর নির্ভর করে নয়; কেবল মানুষ হওয়ার কারণেই সে মর্যাদাবান। ইসলামে মানবমর্যাদা লঙ্ঘন করা এক গুরুতর অপরাধ।
জীবনের নিরাপত্তা: ইসলামের
সর্বোচ্চ অধিকার :
ইসলামে জীবনের অধিকার সর্বাপেক্ষা পবিত্র। কুরআন ঘোষণা করে “যে ব্যক্তি একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল।” (সুরা মায়িদাঃ ৩২)। এ আয়াত শুধু হত্যার নিষেধাজ্ঞাই নয়, বরং মানবজীবনের মূল্যকে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরে। ধর্মীয় ভিন্নতা, জাতিগত পার্থক্য বা সামাজিক অবস্থান কোনোটিই নিরপরাধ হত্যার বৈধতা দিতে পারে না।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকার :
মানবসমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। কুরআনে বলা হয়েছে “ধর্মের ব্যাপারে জোরজবরদস্তি নেই।” (সুরা বাকারা: ২৫৬)। ইসলাম মানুষকে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা দেয়। নবী করীম ﷺ তাঁর পুরো জীবনে দ্বীনের দাওয়াতে যুক্তি, সহনশীলতা ও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কারো ধর্মান্তরিত হওয়া বা না হওয়া ইসলামে ব্যক্তিগত বিবেকের বিষয়।
সমতা, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক ন্যায়বিচার :
ইসলামে মানুষে মানুষে সমতা এক মৌলিক নীতি। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা) ঘোষণা করেন “কোনো আরব অ-আরবের ওপর শ্রেষ্ঠ নয়, অ-আরবও আরবের ওপর শ্রেষ্ঠ নয়; শ্রেষ্ঠতা কেবল তাকওয়ায়।” সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ইসলাম ধনী-গরিবের পার্থক্য দূর করতে জাকাত, সদকা, ফিতরা প্রবর্তন করেছে। দরিদ্র, এতিম, প্রতিবন্ধী, শ্রমিক সবাই সমাজের বৈধ অধিকারভুক্ত। আল্লাহ বলেন “তাদের সম্পদে ছিল অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক।” (সুরা যারিয়াত: ১৯)।
ন্যায়বিচার ও আইনি অধিকার :
ইসলামের ন্যায়বিচারের নীতি এতটাই শক্তিশালী যে নিজের বা আত্মীয়ের বিরুদ্ধে হলেও সত্য প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে “হে মুমিনগণ! ন্যায়বিচারে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে হয়।” (সুরা নিসা: ১৩৫)। ইসলামী বিচারব্যবস্থায় পক্ষপাত, ঘুষ, অত্যাচার ও মিথ্যা সাক্ষ্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
নারীর অধিকার ও পারিবারিক নিরাপত্তা :
ইসলাম নারীর মর্যাদাকে মানবাধিকার ঘোষণার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। জাহেলি যুগে নারীর প্রতি নির্যাতন, অবমাননা ও উত্তরাধিকার বঞ্চনার যে বর্বরতা ছিল, ইসলাম তা সমূলে উৎপাটন করেছে। কুরআন নির্দেশ করে
“তোমরা নারীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো।” (সুরা নিসা: ১৯)। নারীর শিক্ষা, সম্পদ মালিকানা, উত্তরাধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মান—সবই ইসলামে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত।
অমুসলিম ও সংখ্যালঘুদের অধিকার :
ইসলাম শুধু মুসলমানদেরই নয়, অমুসলিমদের অধিকার রক্ষায়ও সমান গুরুত্ব দিয়েছে। নবী করীম (সা) বলেন “যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিককে কষ্ট দেয়, সে আমাকে কষ্ট দেয়।” (মুসনাদ আহমদ)। ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে অমুসলিমরা জীবন, সম্পদ, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার পূর্ণ অধিকার ভোগ করে। এটি ইসলামী মানবাধিকারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।
মাবাধিকারের যে আলো আজ বিশ্বজুড়ে আলোচিত, তার ভিত্তিপ্রস্তর ইসলাম ১৪০০ বছর আগেই স্থাপন করেছে। কুরআন-সুন্নাহর ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষায় মানবমর্যাদা, স্বাধীনতা, সমতা, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার যে পরিপূর্ণ কাঠামো রয়েছে, তা বিশ্বমানবতার জন্য চূড়ান্ত কল্যাণকর ও চিরস্থায়ী নির্দেশনা। ইসলামের মানবাধিকার বাস্তবায়ন হলে পৃথিবী থেকে বৈষম্য, নিপীড়ন ও অশান্তি দূর হয়ে সার্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
লেখক : খতিব, শাহ্ আমানত হাউজিং সোসাইটি জামে মসজিদ, বাকলিয়া, চট্টগ্রাম
সাজ্জদানশীন, মানযারে আউলিয়া দরবার শরীফ, নীলফামারী










