পূর্বদেশ ডেস্ক
কোনো দলীয় স্বার্থ বাস্তবায়ন নয়, নির্বাচন আয়োজন করাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কর্তব্য বলে মন্তব্য করেছেন তারেক রহমান। গতকাল শনিবার বিকালে মতুয়া সম্প্রদায়ের এক প্রতিনিধি সম্মেলনে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এমন মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে একটি জনগণের ভোটের মাধ্যমে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠাই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। অবশ্যই কারো দলীয় স্বার্থ বাস্তবায়ন করা এই সরকারের কাজ নয়। এবং এ কারণেই বিএনপি সরকারের প্রতি কোনোরকম চাপ প্রয়োগ করার পরিবর্তে বরং ভিন্ন মতের জায়গাগুলোতে নোট ডিসেন্ট দিয়েছে; এটাকেই বিএনপি ‘ডিসেন্ট ওয়ে’ বলে মনে করে’। খবর বিডিনিউজের
ফার্মগেইটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ‘মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের’ উদ্যোগে হিন্দু প্রতিনিধিদের এ সম্মেলন হয়। সম্মেলনে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি তারেক রহমান যুক্ত হলে মিলনায়তনে উপস্থিত হিন্দু স¤প্রদায়ে সদস্যরা উলু ধ্বনি দিয়ে তাকে স্বাগত জানান।
সম্মেলনে কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উচ্চারণ না করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারমান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী বিরোধী আন্দোলনে আমাদের রাজপথের আন্দোলনের সঙ্গী কারো কারো ভ‚মিকা দেশে আপনার-আমার-আমাদের বহু মানুষের অধিকার এবং সুযোগকে বিনষ্ট করার হয়ত একটি পরিস্থিতি তৈরি করছে। দেশ যদি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে তাহলে অতীতে পরাজিত, পলাতক ফ্যাসিবাদী অপশক্তির পুনর্বাসনের পথ সুগম হতে পারে বা হয়। ফ্যাসিবাদ শাসন আমলে ফ্যাসিবাদের রোষানল থেকে বাঁচতে ফ্যাসিবাদবিরোধীদের কেউ কেউ যে উপায়- গুপ্ত কৌশল অবলম্বন করেছিল, পতিত পরাজিত ফ্যাসিবাদী অপশক্তিও বর্তমানে একইভাবে গুপ্ত কৌশল অবলম্বন করে দেশকে গণতন্ত্রের উত্তোলনের পথকে বাধাগ্রস্ত করে তুলছে কিনা সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখার জন্য আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ফ্যাসিবাদীবিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর প্রতি বিশেষভাবে আহবান জানাতে চাই’।
তিনি বলেন, ‘২৪ সালের ৫ আগস্টের পতিত পরাজিত পলাতক অপশক্তি কোনো দলের আড়ালে গুপ্ত কৌশলে ভ‚মিকা রেখে যাতে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার সুযোগ না পায়, গুপ্ত বাহিনীর সেই অপকৌশল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অন্যতম প্রধান কৌশল হচ্ছে একটি ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য বজায় এবং বহাল রাখা। এ কারণেই বিএনপি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের রাজপথের সঙ্গীদের সাথে সহযোগিতা এবং সমঝোতার দৃষ্টিভঙ্গি সমুন্নত রেখেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি বরাবরই একটি শান্তিকামী সহনশীল গণমুখী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। ভিন্ন দল ভিন্ন মতের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা এটি বিএনপির রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ, দেশের জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার স্বার্থেই বিএনপির রাজনীতি’।
‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য পরিকল্পনা’
সম্মেলনে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশকে একটি সম্প্রীতি এবং সমৃদ্ধির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপি ইতিমধ্যেই দেশের জনগণের সামনে একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। আপনাদের রায় তথা দেশের জনগণের রায়। বিএনপি আগামি দিনে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে সরকার থেকে সহযোগিতা করার জন্য অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ পরিবারের নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করার পরিকল্পনা করছে। ঠিক একইভাবে প্রান্তিক ক্ষুদ্র মাঝারি কৃষক যারা আছেন সেই কৃষকদেরকে সহযোগিতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে যাতে তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারেন সেজন্য তাদেরকে ‘ফার্মাস কার্ড’ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে’।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের একটি বড় বিশাল সমস্যা দেশের বিশাল যুব সমাজের বেকারত্ব। এই বেকারত্ব সমস্যাকে অ্যাড্রেস করার জন্য, বেকার তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য তাদেরকে বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং একই সাথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভাষা শিক্ষা দিয়ে দক্ষ জনশক্তি রূপান্তর করতে দেশে এবং বিদেশে কাজের ব্যবস্থার পরিকল্পনা আমরা এরই ভেতরে হাতে নিয়েছি’।
‘আপনারা কেউ সংখ্যালঘু নন’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনাদের ধর্মীয় পরিচয়কে কেউ যেন নিজেদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে সে ব্যাপারে আপনারা দয়া করে সজাগ এবং সতর্ক থাকবেন নিজেদেরকে অবশ্যই সংখ্যালঘু ভাববেন না। একজন বাংলাদেশি হিসেবে এই স্বাধীন বাংলাদেশে আপনার আমার আমাদের সবার অধিকার সমান। ব্যক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থ নয়, বিএনপির কাছে অবশ্যই দেশ এবং জনগণের স্বার্থে সবচেয়ে অগ্রাধিকার। এজন্য আমরা একটি কথা বলি সেই কথাটি হলো- ‘আমার আগে আমরা, আমাদের আগের দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্বাত্মক সহযোগিতা ও সমর্থন চান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে সেইভাবে গড়ে তুলতে চাই যেখানে সকল ধর্মের সকল গোত্রের মানুষের সমান মর্যাদা থাকবে। আমি একটা কথা বলতে চাই, এদেশটা আপনার, এই মাটি আপনার। একাত্তর সালে যখন আমরা যুদ্ধ করি সেই যুদ্ধের সময়ে কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না, আমরা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান, পাহাড়ি সবাই একসাথে আমরা দেশকে স্বাধীন করতে লড়াই করেছিলাম। আজকে আবার সেই মন্ত্রে উদীপ্ত হয়ে আসুন সবাই সকলের মানুষের বসবাস উপযোগী দেশে রূপান্তরিত করতে এক হই’।
মতুয়া সম্প্রদায়ের দাবিগুলোর বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘আসুন সবাই বিএনপিকে বিজয়ী করুন। আপনাদের দাবি-দাওয়া তখনই সম্ভব হবে যখন আপনারা আমাদের নেতাকে রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্ব দিতে পারবেন। আপনারা আজকে কী আমাদেরকে কথা দিচ্ছেন’।
এসময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপস্থিতরা ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দিলে বিএনপির মহাসচিব স্লোগান ধরেন- ‘হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই, ধানের শীষের ভোট চাই’, মতুয়া মুসলমান ভাই ভাই, ধানের শীষে ভোট চাই’।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘মুসলমানদের দল তো বিএনপি না। এটা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সকল ধর্মের সম অধিকার নিয়ে গড়া দল, ‘নো সংখ্যালঘু’, ‘নো সংখ্যাগুরু’ সংবিধান অনুযায়ী সকল নাগরিকের সমান অধিকার। সেটাকে ভিত্তি ধরে আমরা আত্বীয়তা করতে চাই’।
সম্মেলনে হরি গুরুচাঁদ মতুয়া মিশনের সভাপতি সূবর্ণা রানী ঠাকুর বলেন, ‘আমরা গোপালগঞ্জের মানুষ হয়েও আজ পর্যন্ত সেই গোপালগঞ্জের প্রধানমন্ত্রীর একটু পদধুলি শ্রীধামের মাটিতে বহুবার আশা করেও পাইনি। আজকে আমি সেই মমতাময়ী মা খালেদা জিয়ার যেন সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসতে পারেন (সেই আশা করি)’।
মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সদস্য সচিব কোপিল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, ‘আজকে সারাদেশ থেকে হিন্দু সম্প্রদায়েরর মানুষজন এই অনুষ্ঠানে এসে প্রমাণ করে দিচ্ছে, হিন্দু সম্প্রদায় কারও ব্যক্তিগত ভোট বাক্স নয়, হিন্দু সম্প্রদায় যেকোনো দিকে মুভ করতে পারে। হিন্দু মানে আওয়ামী লীগ নয়। কয়েকজন চাটুকার মন্ত্রী-এমপি হয়েছে। কিন্তু ওরা হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো কাজে আসেনি’।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এই ক্রান্তি লগ্নে আপনি তারেক রহমান আমাদের এখন আশা-ভরসার প্রতীক। আমরা মতুয়া সম্প্রদায় রয়েছি, এই স¤প্রদায়ের মন্দির প্রণাম করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রে মোদী পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ ভোট ব্যাংক হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছিলেন। শুধুমাত্র তিনি ওড়নাকান্দি ঠাকুরবাড়িতে একটি পূজা দিয়েছিলেন- সেই পূজার সুবাদে ভারতের পশ্চিম বাংলায় ১৬টি এমপি পদ তিনি দখল করতে পেরেছিলেন; একটি মাত্র পূজার কারণে। আমরাও চাই, এই মতুয়া সম্প্রদায় আপনার ভোট ব্যাংক হোক। সেই ধরনের কিছু প্রত্যাশা বা ঘোষণা আশা করব’।
১৯৯০ সাল থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের ঘটনা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করা, আওয়ামী লীগের নেতাদের দখলে থাকা হিন্দুদের অর্পিত ও দেবোত্তর সম্পত্তি তাদের উত্তরসুরীতে কাছে ফেরত প্রদান, ‘হিন্দু সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন, মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন প্রদান, আরাধ্য দেবতার শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ও শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকীর দিনে সরকারি ছুটি ঘোষণার দাবি তুলে ধরেন তিনি।
মতুয়া বহুজন ঐক্যজোটের আহব্বায়ক সোমনাত দে’র সভাপতিত্বে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের সভাপতি বিজন কান্তি সরকার, হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ্র চন্দ্র প্রামাণিক, মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সমেন সাহা, বিদুর কান্তি বিশ্বাস, রমেন্দ্র নাথ সরকার বক্তব্য রাখেন।










