কষ্ট নিয়ে এসে স্বস্তি নিয়ে ফিরলেন সেবাপ্রার্থীরা

11

মনিরুল ইসলাম মুন্না

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গতকাল বুধবার সকাল থেকেই উপচেপড়া ভিড়। কারও চোখে দুঃশ্চিন্তার ছাপ, কারও মুখে দীর্ঘদিনের জটিলতার ক্লান্তি। বুকভরা কষ্ট নিয়ে মহানগর ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা এসব মানুষ গণশুনানিতে হাজির হয়েছিলেন একটি লক্ষ্য নিয়েই- তা হচ্ছে সমাধান। আর তাদের সে প্রত্যাশার প্রতিফলনও মিলেছে দিনের শেষে।
নবাগত জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় দিনেই সরাসরি মানুষের আবেদন-অভিযোগ শুনে দ্রুত পদক্ষেপ নেন। গতকাল সকাল ১০টা থেকেই বিভিন্ন বয়স ও পেশার সেবাপ্রার্থীরা ভিড় করতে থাকেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের হলরুমে।
সরেজমিন দেখা যায়, গণশুনানিতে মোট ২৫টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ছিল- ভুয়া ওয়ারিশ সনদ দিয়ে নামজারি খতিয়ান বাতিলের আবেদনের অনুরোধ, মসজিদের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন, জিআর চাল প্রাপ্তি, কাবিখা থেকে অনুদান, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, বসতভিটা দখল সংক্রান্ত অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণ মামলার ক্ষতিপূরণের টাকা স্থগিত থাকা, ক্যান্সার রোগীর ওষুধ সহায়তা, স্কুলের বেতন মওকুফসহ নানা মানবিক আবেদন।
জেলা প্রশাসক প্রতিটি আবেদন মনোযোগ দিয়ে শুনে কিছু সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দেন। আর যেসব বিষয়ে প্রশাসনিক যাচাই বা আইনি প্রক্রিয়া প্রয়োজন, সেগুলোতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ফলাফল দ্রুততম সময়ের মধ্যে আবেদনকারীকে জানাতে বলেন।
গণশুনানিতে উপস্থিত সেবাপ্রার্থীদের অনেকেই জানান, দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিয়ে এলেও প্রশাসনের আন্তরিকতা ও দ্রæত পদক্ষেপে তারা স্বস্তি ও আশার আলো নিয়ে ফিরেছেন।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা থেকে এসেছেন এমরান হোসেন। তিনি পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমাদের পরিবারের বহির্ভূত একজন ভুয়া ওয়ারিশ সনদ দিয়ে খতিয়ান করে নেন। যার ফলে আমাদের মাঝে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। আমরা এ খতিয়ান বাতিলের জন্য জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে এসেছি। তিনি তাৎক্ষণিক আমাদের এসি ল্যান্ডকে জানিয়ে দ্রুত সমাধান করে দিতে বলে দেন।’
বাঁশখালী উপজেলা থেকে গভীর নলকূপের আবেদন নিয়ে আসেন জাফর আহমদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির অভাব দেখা গেছে। অনেক দুর থেকে পানি সংগ্রহ করে আনতে হচ্ছে এলাকাবাসীর। তাই জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে একটা গভীর নলকূপের আবেদন নিয়ে এসেছি। তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাকে বলে নলকূপ প্রদানের আশ্বস্ত করেন।’
এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আসেন পড়ালেখার সহযোগিতার জন্য। তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে নিজের পড়ালেখার খরচ যোগানো এবং আপন ছোট বোনের স্কুলের বেতন মওকুফের আবেদন করেন। জেলা প্রশাসক তাদের আবেদন দেখে বেতন মওকুফের সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিমাসে পড়ালেখার জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করে দেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘পরিবারের মধ্যে আমি, আমার ছোট বোন এবং আমার মা থাকি। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক কষ্ট করে পড়ালেখা করি। কিন্তু আমার ছোট বোন নবম শ্রেণিতে পড়ে। এ সময়ে আর্থিক সহযোগিতা খুব প্রয়োজন। তাই জেলা প্রশাসকের কাছে এসে কাক্সিক্ষত সেবা পেয়েছি। আমি জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে কৃতজ্ঞ।’
তবে যারা মলিন চেহারা নিয়ে জেলা প্রশাসকের সাথে সাক্ষাত করতে কক্ষে ঢুকেছেন, তারা ডিসির কথা শুনে এবং সমাধান পেয়ে হাসিমুখে স্বস্তি নিয়ে বের হয়েছেন। অনেকে আবার এ জেলা প্রশাসককে মানবিক ডিসি বলতেও শোনা গেছে।
গণশুনানির বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘সাধারণ মানুষ আশা নিয়ে সেবা নিতে আমাদের অফিসে আসেন। আমরাও তাদের কাক্সিক্ষত সেবা দেয়ার চেষ্টা করি। অনেক সেবাপ্রার্থী এমন কিছু আবেদন নিয়ে আসেন, যেটি আমি সমাধান করতে পারবো না। তাদেরকেও আমার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করার চেষ্টা করি। সকলের সহযোগিতা, আন্তরিকতা পেলে আরও ভাল সেবা প্রদান করতে পারবো বলে আমি বিশ্বাস করি। এখানে দুস্থ, গরীব, বয়োবৃদ্ধ বা যে কেউ আসুক না কেন, আমার অফিস সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আমি মনে করি, নিয়মিত গণশুনানি মানুষের সমস্যাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান করার পাশাপাশি প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা ও সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে।