কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে

4

দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বের কাছে রোল মডেল হয়ে উঠা বাংলাদেশের হঠাৎ উল্টোযাত্রা দেশের মানুষকে নয় শুধু, বিশ্বসম্প্রদায়কেও হতবাক করেছে। অর্থনীতির অগ্রযাত্রায় উদিয়মান শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল দারিদ্র্যের হার হ্রাস পাওয়া। কিন্তু বিগত সরকারের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা নিয়ে এযাবৎ কেউ বিরোপ মন্তব্য না করলেও গণতন্ত্র ও সুশাসনের ক্ষেত্রে সরকারের অনাগ্রহ, একচ্ছত্র ক্ষমতার চর্চা, স্বেচ্ছাচারিতা ও বিরোধী পক্ষের প্রতি দমনপীড়ন সরকারের সব অর্জনকে মুহূর্তে ম্লান করে দেয়। ২৪ এর জুলাই এ ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনের মুখে আওয়ামীলীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর দেশ শাসনের দায়িত্ব পড়ে দারিদ্র্য বিমোচনের কারিগর হিসেবে পরিচিত মাইক্রো ক্রেডিড লোন ব্যবস্থার প্রবর্তক, নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনুসের হাতে। আশা করা হয়েছিল, অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূস বিশ্বব্যাপী তার খ্যাতি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে দেশ শামন করবে, দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নেবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ষোল মাসের মাথায় এসে দেশের অর্থনীতি ও দারিদ্র্য মোচনের যে প্রতিবেদন বিশ্বব্যাংক দিয়েছে, তাতে দেশবাসী চরম হতাশ হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ পোভার্টি অ্যান্ড ইকুইটি অ্যাসেসমেন্ট ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে, বলতে দ্বিধা নেই. তা বাংলাদেশের অর্থনীতির এক কঠিন বাস্তবতা। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ছয় কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। গত দুই দশকে দারিদ্র্য হ্রাসে আমাদের যে অসাধারণ অর্জন ছিল, কভিড-১৯ মহামারি এবং এর পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কায় তা আজ গুরুতর হুমকির মুখে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অনিশ্চিত দারিদ্র্যফাঁদ থেকে রক্ষা করতে প্রথমে দরকার বেকারত্ব হ্রাস বা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এছাড়া গতানুগতিক ‘ব্যবসা-যথারীতি’ নীতি পরিহার করে জরুরি ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য।
​প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই ঝুঁকির মূল কারণ বহুমুখী হলেও মূল্যস্ফীতি এ ক্ষেত্রে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। খাদ্য ও জ্বালানির লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের প্রকৃত আয়কে মারাত্মকভাবে ক্ষয় করেছে। মাসিক আয় সীমিত বা স্থির থাকায় এসব পরিবার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক যাদের ‘নতুন দরিদ্র’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তারা অর্থনৈতিক অস্থিরতার শিকার।
দেশের কর্মসংস্থানে ব্যবস্থাপনাগুলো সংকির্ণ হয়ে আসছে। শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, ব্যাংকের জনবল ছাঁটাই এর ফলে দারিদ্র্যেও খাত দীর্ঘ হচ্ছে। বেশিরভাগ শ্রমিক, গ্রামীণ কৃষক এবং বিশেষত নারীরা, যারা পোশাকশিল্প বা ছোট ব্যবসায় যুক্ত, তাদের ওপরই সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার ধীর হওয়ায় নারীরাও কাজ হারিয়ে পিছিয়ে পড়ছেন। শহরে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় দারিদ্র্য সংকটকে আরো তীব্র করেছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বিস্তৃত হলেও তা অকার্যকর টার্গেটিং, রাজনৈতিক প্রভাব ও সমন্বয়হীনতায় ভুগছে। ফলে প্রকৃত দরিদ্র, বিশেষ করে নগর দরিদ্র ও বস্তি বাসীরা প্রায়ই এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান অভিঘাত। উপকূলীয়, চরাঞ্চল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষ বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্ব হারাচ্ছে। সম্পদ ও জীবিকা হারিয়ে তারা বারবার দারিদ্র্যফাঁদে আটকে যাচ্ছে।
আমরা মনে করি, সরকারের এ মুহূর্তে উচিৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মনোযোগ দেওয়া, রপ্তানিবাজার বৈচিত্র্যকরণ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ, বিশেষ করে রাজস্ব আহরণ জোরদার করা ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে এবং সামাজিক সুরক্ষাকে তথ্যভিত্তিক, সমন্বিত ও নগর দরিদ্রদের লক্ষ্য করে ঢেলে সাজাতে হবে।
​বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, ছয়কোটি ২০ লাখ মানুষের দারিদ্র্যঝুঁকি মানে আমাদের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সমতার ভিত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া। এখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে অর্থনৈতিক প্রবাহের গতি বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে বাস্তবায়নমুখী নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ নিতে হবে, যেন অর্জিত উন্নয়নকে রক্ষা করা যায় এবং এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাত থেকে বাঁচানো যায়।
উল্লেখ্য যে, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০-২০২২ সালে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে দারিদ্র্য হ্রাস পায়। ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য এবং ৯০ লাখ মানুষ অতি দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসে। তবে ২০১৬ সাল থেকে দারিদ্র্য কমার গতি ধীর হয়েছে। ২০১০-২০২২ সালে চরম দারিদ্র্য ১২ দশমিক ২ থেকে কমে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মাঝারি দারিদ্র্য ৩৭ দশমিক ১ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৬ সালের পর থেকে প্রবৃদ্ধির সুফল পেয়েছেন ধনীরা। ফলে আয়বৈষম্য বেড়েছে। কৃষির ওপর ভর করে গ্রামীণ এলাকাগুলো দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে। একই সময়ে শহরে দারিদ্র্য হ্রাসের হার কমেছে। ২০২২ সাল থেকে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন শহরে বাস করতে শুরু করেছে।