
সোহেল মো. ফখরুদ-দীন
কবি মুহাম্মদ ইকবাল বা আল্লামা / স্যার মুহাম্মদ ইকবাল (৯ নভেম্বর, ১৮৭৭-২১ এপ্রিল, ১৯৩৮)। তিনি ছিলেন অবিভক্ত ভারতবর্ষের এক অসামান্য মেধাবী ও দূরদর্শী মুসলিম কবি, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও আইনজ্ঞ। তিনি ছিলেন এমন এক মনীষী, যিনি কেবল কবিতা ও দর্শনের ক্ষেত্রেই নয়, বরং সমগ্র মুসলিম জাতির আত্মসচেতনতা ও জাগরণের ইতিহাসে এক অনন্য আলোকবর্তিকা। তাঁর সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার তাঁকে বিশ্বসভ্যতার এক কালজয়ী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
কবি আল্লামা ইকবাল আধুনিক যুগের ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম। তাঁর কবিতায় গভীর ধর্মীয় চেতনা, মানবমুক্তির আহবান এবং ইসলামী দর্শনের পুনর্জাগরণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এক অনন্য সম্মিলন ঘটেছে। তাই তাঁকে শুধু কবি নয়, “মুফাক্কির-ই-পাকিস্তান” (পাকিস্তানের চিন্তানায়ক), “শায়র-ই-মাশরিক” (প্রাচ্যের কবি) এবং “হাকিমুল উম্মত” (জাতির দার্শনিক) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।
কবি ইকবালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ আসরার-ই-খুদী ১৯১৫ সালে ফার্সি ভাষায় প্রকাশিত হয়, যা মুসলিম আত্মপরিচয় ও আত্মসচেতনতার এক শক্তিশালী দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রদান করে। তাঁর পরবর্তী গ্রন্থসমূহ রুমুজ-ই-বেখুদী, পয়গাম-ই-মাশরিক, জুবুর-ই-আজাম ইসলামী ভাবধারা, জাতীয় জাগরণ ও মানবতাবাদের দার্শনিক ব্যাখ্যায় সমৃদ্ধ।
উর্দু ভাষায় তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ বাং-ই-দারা, বাল-ই-জিবরাইল এবং আরমাঘান-ই-হিজাজ তাঁকে সাহিত্যসম্রাটের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
১৯২২ সালে ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন। তবে ইকবালের প্রকৃত পরিচয় তাঁর বুদ্ধি, দর্শন ও কবিতার মধ্যেই নিহিত যেগুলো ঔপনিবেশিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে মুসলিম আত্মমর্যাদা ও ঐক্যের বার্তা বহন করে।
তাঁর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইসলামী সমাজব্যবস্থার পুনর্গঠন ও ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি। ১৯৩০ সালে এহাবাদে মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে প্রদত্ত তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণেই প্রথম মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা উচ্চারিত হয় — যা পরবর্তীতে পাকিস্তান সৃষ্টির দার্শনিক ভিত্তি রচনা করে।
আল্লামা ইকবালের প্রভাব শুধু পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ নয়; ভারত, বাংলাদেশ, ইরান ও সমগ্র মুসলিম দুনিয়ায় তাঁর সাহিত্য ও দর্শন গভীর শ্রদ্ধা ও গবেষণার বিষয়। ফার্সি ভাষায় তাঁর সৃজনশীলতার জন্য তিনি ইরানে “ইকবাল-ই-লাহোরী” নামে পরিচিত। তাঁর কবিতায় রুমী ও গাজালির চিন্তার সংমিশ্রণ যেমন আছে, তেমনি আধুনিক জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী পুনর্জাগরণের এক ঐক্যতানও আছে।
আল্লামা ইকবাল বিশ্বাস করতেন-
“নিজের মধ্যে লুকিয়ে আছে যে শক্তি, তাকে জাগাও;
আত্মজ্ঞানই মুক্তির পথ।”
এই আত্মজাগরণের দার্শনিক ব্যাখ্যাই তাঁকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুসলিম চিন্তাবিদে পরিণত করেছে। তাঁর দর্শন আজও মানবিক মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও ঈমানের আহবান হিসেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণা জোগায়। ২১ এপ্রিল ১৯৩৮ সালে আল্লামা ইকবাল লাহোরে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মাজার আজ লাহোরের বাদশাহী মসজিদের পাশে অবস্থিত যা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য এক অনুপ্রেরণার পবিত্র স্থান।২০২৫ সালে ৯ নভেম্বর তাঁর জন্ম-স্মরণে আমরা গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি এই মহামানবকে যিনি কর্ম, জ্ঞান, চিন্তা ও কবিতার মাধ্যমে ইসলামী পুনর্জাগরণের নব অধ্যায় সূচনা করেছিলেন। সত্যিই, আল্লামা ইকবাল মানবতার ইতিহাসে এক কালজয়ী মহাপুরুষ, এক আত্মজাগরণের প্রতীক।
লেখক : সভাপতি, মুসলিম হিস্ট্রি এসোসিয়েশন ; সম্পাদক ও পরিচালক, দি একাডেমি অব হিস্ট্রি (ইতিহাসের পাঠশালা), বাংলাদেশ










